আওয়ামী লীগ বিএনপিতে গ্রুপিং আলোচনায় কাদের সিদ্দিকী

  কাজল আর্য, টাঙ্গাইল

১৪ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৮, ০১:১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আসন টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী)। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা মাঠে নেমেছেন। তারা তৃণমূল নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কুশলবিনিময় করছেন; অংশ নিচ্ছেন সভা-সেমিনারে; পোস্টার-ব্যানারে জানাচ্ছেন শুভেচ্ছা; লবিং চালাচ্ছেন কেন্দ্রের সবুজ সংকেত পেতে। এরই মধ্যে তৃণমূলে ত্যাগী নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগের মোজহারুল ইসলাম তালুকদার এবং বিএনপির লুৎফর রহমান মতিন অবস্থান তৈরি করেছেন। তবে দল দুটিতে আছে কোন্দল ও গ্রুপিং। এদিকে নানা হিসাব-নিকাশে আলোচনায় আছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কাদের সিদ্দিকী।

কালিহাতী আসনে ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন আমির আলী খান মোক্তার। ১৯৭০ সালে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আবদুল লতিফ সিদ্দিকী এবং সাংসদ নির্বাচিত হন ইনছান আলী মোক্তার। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। ১৯৭৯ সালে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক শাজাহান সিরাজ জাসদ থেকে নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে লতিফ সিদ্দিকীর সহধর্মিণী লায়লা সিদ্দিকী স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত হন। তিনি উপমহাদেশের প্রথম নির্বাচিত মহিলা সাংসদ। এর পর ১৯৮৮, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে শাজাহান সিরাজ এমপি হয়ে মন্ত্রিত্ব লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে লতিফ সিদ্দিকী এমপি নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে শাজাহান সিরাজ দুর্নীতির দায়ে জেল-হাজতে থাকায় এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়া হয় শিল্পপতি লুৎফর রহমান মতিনকে। তিনি ৮৬ হাজার ৯১২ ভোট পেয়ে লতিফ সিদ্দিকীর কাছে পরাজিত হন। নির্বাচিত হয়ে লতিফ সিদ্দিকী মন্ত্রিত্ব লাভ করেন। তিনিই কালিহাতীতে বঙ্গবন্ধু টেক্সটাইল কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে লতিফ সিদ্দিকী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হন। এর পর আবদুল লতিফ সিদ্দিকী নিউইয়র্কে হজ ও তবলিগ জামাত নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্যের কারণে মন্ত্রিত্ব হারান, দল থেকেও বহিষ্কৃত হন। শেষ পর্যন্ত সংসদ সদস্যের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ২০১৭ সালের ৩১ জানুয়ারির উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারী এমপি নির্বাচিত হন। জনশ্রুতি আছেÑ এ আসনে যিনি এমপি নির্বাচিত হন, তার দলই সরকার গঠন করে।

আওয়ামী লীগ : এবার মনোনয়নপ্রত্যাশী সাংসদ হাছান ইমাম খান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদার ঠান্ডু, এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক আবু নাসের, উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার লিয়াকত আলী। এ ছাড়া লতিফ সিদ্দিকী ও তার সহধর্মিণী লায়লা সিদ্দিকী এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক কর্মকা-ে নিয়মিত অংশগ্রহণ করছেন। তারাও আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন। লতিফ সিদ্দিকীকে দলে ফেরানো হতে পারে বলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আছে।

কোন্দলের কারণে কালিহাতী আওয়ামী লীগ দুই ভাগে বিভক্ত। একভাগের নেতৃত্বে এমপি সোহেল হাজারী। অন্যভাগের নেতৃত্বে মোজহারুল ইসলাম তালুকদার। দুজনই পরস্পরকে এড়িয়ে চলেন; পৃথকভাবে সভা-সমাবেশ করেন। কালিহাতী আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। তার অনুপস্থিতিতে দলের মূল ধারার নিয়ন্ত্রক ও অভিভাবক মোজহারুল ইসলাম তালুকদার। স্থানীয় কয়েক নেতার মতে, শীর্ষ দুই নেতার গ্রুপিংয়ে সাধারণ নেতাকর্মীদের বেকায়দায় পড়তে হয়। যদিও এমপি ছাড়া অন্যসব মনোনয়ন প্রত্যাশী একসঙ্গেই কাজ করছেন।

মনোনয়নপ্রত্যাশী আবু নাসের এক সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা। তিনি দলের সঙ্গে সমন্বয় করে এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ করছেন। জনতা ব্যাংকের পরিচালক থাকাকালে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকা-ের মাধ্যমে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন তিনি। আবু নাসের বলেন, বর্তমান এমপির সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। এমপি তার ব্যক্তিগত লোকজন নিয়ে চলাফেরা এবং নিয়মিত মিথ্যাচার করেন। এমপির কর্মকা-ে দল মারাত্মকভাবে বিব্রত।

ইঞ্জিনিয়ার লিয়াকত আলী বলেন, দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী হয়ে নিয়মিত গণসংযোগে করছি। নেতা মোজহারুল ইসলামের নেতৃত্বে আমরা ঐক্যবদ্ধ।

মোজহারুল ইসলাম তালুকদার কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, দুবার সাধারণ সম্পাদক ও একবার আহ্বায়ক ছিলেন। ১৯৯১ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত চতুর্থ মেয়াদে সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, এবার নির্বাচনে দলনেতার কাছে জোরালোভাবে মনোনয়ন চাইব। কারণ এমপি হলে জনগণের জন্য আরও বেশি কাজে লাগতে পারব, সেবা করতে পারব।

সাংসদ হাসান ইমাম খান মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় আশা ব্যক্ত করে বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালে কালিহাতীর অনেক উন্নয়ন করেছি। এমপি নির্বাচিত হয়ে কালিহাতীবাসীর কল্যাণে কাজ করছি। এখন আর জনগণ এমপির পেছনে ঘোরে না, এমপিই জনগণের পেছনে দিনরাতে ঘোরে। কালিহাতী আওয়ামী লীগে গ্রুপিংয়ের কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে।

লতিফ সিদ্দিকীর ঘনিষ্ঠজনরা জানান, কালিহাতীতে লতিফ সিদ্দিকীর অসংখ্য কর্মী, ভক্ত ও সমর্থক রয়েছে। তারা চান তিনি নির্বাচনে আসুক। তিনি এখনো বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বলিষ্ঠ আওয়ামী লীগার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দৃঢ় আস্থাশীল। তার বিষয়ে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

বিএনপি : বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী কালিহাতী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শিল্পপতি লুৎফর রহমান মতিন, কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা দলের যুগ্ম সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল হালিম, শাজাহান সিরাজের সহধর্মিণী বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির তাঁতি বিষয়ক সহ-সম্পাদক বেগম রাবেয়া সিরাজ, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা বেনজীর আহমেদ টিটো, মালয়েশিয়া বিএনপির সভাপতি প্রকৌশলী বাদলুর রহমান বাদল, এলেঙ্গা পৌরসভার মেয়র ও পৌর বিএনপির সভাপতি শাফী খান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কৃষিবিদ এমএমএ খালিদ। তারা নিজ নিজ কৌশলে এলাকায় গণসংযোগ ও দলীয় কর্মকা- চালাচ্ছেন।

কালিহাতী বিএনপিতেও চলছে অন্তর্দ্বন্দ্ব। ২০০৮ সালের নির্বাচনে শাজাহান সিরাজের অনুসারীরা দলীয় প্রার্থী লুৎফর রহমান মতিনের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিএনপির দুজন করে প্রার্থী থাকায় বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়। সম্প্রতি ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলের দুইগ্রুপে মারামারি হয়।

রাবেয়া সিরাজ বলেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে দলের কাছে জোরালোভাবে মনোনয়ন চাইব। ইঞ্জিনিয়ার আবদুল হালিম বলেন, গণসংযোগে মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।

কালিহাতী উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি শুকুর মাহমুদসহ কয়েক নেতাকর্মী বলেন, মতিন সাহেব শিক্ষানুরাগী ভদ্র একজন মানুষ। তিনি দুঃসময়ে দলের হাল ধরেছেন। তাই তাকে ছাড়া অন্য কাউকেই এ আসনে ভাবা যায় না। তিনিই সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি।

লুৎফর রহমান মতিন আমাদের সময়কে বলেন, দলে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে কিছটা ভুল বোঝাবুঝি আছে, তবে গ্রুপিং নেই। বিএনপির মতো বড় দলে একাধিক যোগ্য মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকতেই পারে। কারো বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি সবাইকে নিয়েই কাজ করতে চাই। আশা করি দল বিচার-বিশ্লেষণ করে আমাকেই মনোনয়ন দেবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমি অব্যশই বিজয়ী হবো।

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ : দলটির সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের পৈতৃক নিবাস কালিহাতীর নাগবাড়ী ইউনিয়নের ছাতিহাটী গ্রামে। কাদের সিদ্দিকীসহ কয়েকটি দলের সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রট আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে কালিহাতী আসনে বড় দুদলের মনোনয়নের হিসাব-নিকাশ এবং নির্বাচনের জয়-পরাজয় পাল্টে যেতে পারে। লতিফ সিদ্দিকী নির্বাচনে না এলে এখানে কাদের সিদ্দিকী বাড়তি কিছু সুবিধা পাবেন। তাই তাকে নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।

জাতীয় পার্টি : এ আসনে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সৈয়দ মুস্তাক হোসেন রতন দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে