ডিএসইর কৌশলগত অংশীদার

শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষুণেœর প্রস্তাব চীনা কনসোর্টিয়ামের

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১৪ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চীনা জোট ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কৌশলগত অংশীদার হওয়ার প্রস্তাবনায় যেসব শর্ত দিয়েছে, তাতে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষুণœ হবে। একই সঙ্গে যেসব শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, তাতে তারা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ নেবে। অথচ তারা মাত্র ২৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক। এ ছাড়া কোনো কোনো প্রস্তাবনা ডিমিউচুয়ালাইজেশন অ্যাক্ট ও স্কিম এবং কোম্পানির আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

জানা গেছে, ২০ ফেব্রুয়ারি চীনা জোটের দরপ্রস্তাব গ্রহণ করে তাদের ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ। এই জোটকে কৌশলগত অংশীদার করার অনুমোদন চেয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি বিএসইসির কাছে প্রস্তাব পাঠায় ডিএসই। ওই প্রস্তাব পর্যালোচনা করতে চার সদস্যবিশিষ্ট উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করে বিএসইসি। কমিটি চীনা জোটের কিছু শর্তের ব্যাখ্যা চেয়ে ২৭ ফেব্রুয়ারি চিঠি দেয়। এর পর ডিএসইর পক্ষ থেকে লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। পরদিন ডিএসইর একটি প্রতিনিধি দল সরাসরি বিএসইসির কমিটির সামনে উপস্থিত হয়ে ফের ব্যাখ্যা দেয়।

ডিএসই সূত্র জানিয়েছে, ডিএসই এবং চীনের সেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কনসোর্টিয়াম পরীক্ষা করে দেখেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কমিটির ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাওয়ার পর জোটটি ১৩টি শর্ত থেকে সরে আসে। জানা গেছে, প্রথমে তাদের প্রস্তাব ছিল যুক্তরাজ্যের আইন অনুসারে চুক্তি কার্যকর হবে। কিন্তু কমিশনের ব্যাখ্যা চাওয়ার পর সেখান থেকে সরে এসেছে জোটটি। তবে এ নিয়ে ভবিষ্যতে উভয়পক্ষের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে লন্ডনের আন্তর্জাতিক আরবিটেশন অনুসারে নিষ্পত্তি করতে হবে।

এ ছাড়াও চীনা কনসোর্টিয়াম বেশ কয়েকটি শর্ত দিয়েছে, যা ডিএসইর বার্ষিক সাধারণসভার আগেই চীনা কনসোর্টিয়ামের কাছে অনুমোদন নিতে হবে। এতে ডিএসইর বিদ্যমান ৭৫ শতাংশ বিনিয়োগকারীর স্বার্থ ক্ষুণœ হবে। পাশাপাশি তারা মাত্র ২৫ শতাংশ শেয়ার নিয়ে পুরো স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালনা এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করবে। এসব প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে যে কোনো শেয়ার ইস্যুর ক্ষেত্রে তাদের অনুমোদনের পর বার্ষিক সাধারণসভায় পাঠাতে হবে। এ ছাড়া পরিচালকদের সংখ্যা এবং নতুন কৌশলগত বিনিয়োগকারী অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি যে কোনো ধরনের ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি (সফটওয়ার, পেটেন্ট, অন্যান্য টেকনোলজি)। ডিএসইর আইপিও সংক্রান্ত যে কোনো ইস্যু (শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ, অবলেখক নিয়োগ, প্রসপেক্টাস অনুমোদন এবং ইস্যুমূল্য নির্ধারণ), যা ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইনের পরিপন্থী। ১৫ শতাংশের বেশি যে কোনো স্থায়ী সম্পদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেও একই নিয়ম অনুসরণের প্রস্তাবনা করা হয়েছে। এ ছাড়াও একক বা যৌথভাবে ১০ কোটি টাকার বেশি ঋণ গ্রহণ, যে কোনো ধরনের উল্লেখযোগ্য চুক্তি যার মূল্য এককভাবে বা যৌথভাবে ১০ কোটি টাকার বেশি, ১০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অনুমোদন নিতে হবে। পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে কৌশলগত বিনিয়োগকারী চাইলে যে কাউকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেবে, যা দেশের প্রচলিত কোম্পানি আইন ও ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইন ও স্কিমের পরিপন্থী।

বিএসইসি সূত্র জানায়, এসব শর্তের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে, শর্ত প্রত্যাহার করতে বলা হয়নি। ফলে বোঝা যায়, ডিএসই কর্তৃপক্ষ তাদের স্বার্থরক্ষায় যথেষ্ট দরকষাকষি করেনি। এমনকি পুরো বিষয়টি না বুঝেই ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ চীনা কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে। এমনকি চীনা প্রস্তাবনার কোনো কোনো শর্ত ডিএসইর পক্ষ থেকে ঠিক করে দেওয়া হয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে।

জানা গেছে, যেসব শর্তের ব্যাপারে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে, ডিএসই ব্যাখ্যা না দিয়ে ১৩টি শর্ত প্রত্যাহার করেছে। এর পরও কয়েকটি শর্ত রয়েছে, যেখানে ডিএসইর শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষুণœ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জানা গেছে, চীনা জোট ডিএসইর ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের দাম ২২ টাকা করে দিতে দরপ্রস্তাব করেছে। এ বিষয়ে বিএসইসির কমিটি প্রশ্ন তুলেছে, চীনা কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাবিত ক্রয়মূল্য স্থিরমূল্য নয়, বরং নির্ভলশীল ও শর্তযুক্ত। এর ব্যাখ্যায় ডিএসই জানিয়েছে, চীনা জোট ডিএসইর বর্তমান সম্পদ ও শেয়ার সংখ্যার হিসাবে দরপ্রস্তাব করেছে। শেয়ার কেনাবেচা সম্পন্ন হওয়ার আগে সম্পদ হস্তান্তর বা বিক্রি বা লভ্যাংশ হিসেবে নতুন শেয়ার ইস্যু করার মাধ্যমে সম্পদমূল্য কমানো ঠেকাতেই শর্তটি দিয়েছে চীনা জোট।

অংশীদার হলে চীনা জোট ১০ বছরের জন্য ডিএসইকে বিনামূল্যে ৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা প্রায় ৩০০ কোটি টাকা মূল্যের কারিগরি ও পরামর্শক সেবা দেওয়ার কথা। এ ক্ষেত্রে এই সহায়তার আর্থিক মূল্যের যৌক্তিকতা জানতে চেয়েছিল বিএসইসি। একই সঙ্গে এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া হয়েছে কিনা। ডিএসইর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিনামূল্যে কারিগরি ও পরামর্শক সেবা সহায়তা প্রদানের বিষয়টি কোনোভাবেই শেয়ারের দরের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। কেউ কোনো পণ্য বা সেবা ফ্রি বা উপহার হিসেবে দিতে চাইলে তার মূল্যের যৌক্তিকতা জানতে চাওয়া যৌক্তিক নয়। তবে প্রতিটি সহায়তার আর্থিক মূল্য রয়েছে।

এ ছাড়া সেটেলমেন্ট গ্যারান্টি ফান্ডে ডিএসইর অর্থ প্রদান বন্ধ করার শর্ত দিয়েছিল জোটটি। এ ছাড়াও শর্ত দেওয়া হয়েছে ডিএসইর ন্যূনতম দশমিক ২৫ শতাংশ শেয়ার যার কাছে থাকবে (কৌশলগত বিনিয়োগকারী ছাড়া), তার সঙ্গে কোনো চুক্তি করতে পারবে না। ফলে সেখানে একটি শেয়ারহোল্ডার গ্রুপকে বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়েছে, যা ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইনের লঙ্ঘন।

এ বিষয়ে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচাল কেএএম মাজেদুর রহমানের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে