রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি

এখনো হিসাব মিলছে না ওদের

  জাহিদুর রহমান, সাভার

২২ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০১৮, ১৩:২৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

আলিফা আক্তার মৌ। ওর বাবা নেই, মা থেকেও নেই। রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় বাবা যখন মারা যান, ও তখন মাতৃগর্ভে। জীবনের তাগিদে নতুন সংসার পেতেছেন মা, সেখানে ঠাঁই হয়নি একরত্তি মেয়ের। নানিই এখন ওর আশ্রয়। ছবি : আমাদের সময়
অভিশপ্ত রানা প্লাজা কেড়ে নিয়েছে বাবাকে, আর মা থেকেও নেই। নানির কাছেই তাই শেষ আশ্রয় পৌনে ৫ বছরের শিশু আলিফা আক্তার মৌ আর তার ভাই নাদিমের (৭)। জন্ম নিয়েই মৌ দেখেছে বাবা-হারা নিষ্ঠুর এক পৃথিবী।

মৌ-নাদিমের বাবা মো. খোকন কাজ করতেন ধসে পড়া রানা প্লাজার তৃতীয় তলার তৈরি পোশাক কারখানায়। হেলপার হিসেবে মা আছমা বেগমও কাজ করতেন একই কারখানায়। সেদিন কী এক বিশেষ কারণে আছমা বেগম হাজিরা দিতে পারেননি। আর সেটাই ফিরিয়ে দিল তার জীবন। সেই দিনই ছিল ২৪ এপ্রিল। দেশের পোশাকশিল্পের ইতিহাসে এক শোকাবহ দিন। ২০১৩ সালের এই দিনে সাভারের রানা প্লাজা ধসে করুণ মৃত্যু হয় ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিকের। আহত হন কয়েক হাজার শ্রমিক। ভাগ্যগুণে প্রাণে বেঁচে গেলেও অঙ্গহানির শিকার হন অনেকে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম প্রিয়জন হারিয়েও অনেকে যাপন করছেন দুর্বিষহ জীবন।

মৌ আর নাদিম সেই হতভাগ্য পরিবারের সদস্য। বাবা খোকনকে হারিয়ে মা পড়েন অকুল পাথারে। মৌ তখন পেটে। সাত মাসের গর্ভের সন্তান নিয়ে পড়েন অনিশ্চয়তার সাগরে।

বছরখানেক আগে নতুন সংসার পাতেন আছমা। তখন থেকে নানি ফাতেমা বেগমই যেন তাদের বাবা আর মা। সাভার পৌরসভার রাজাশন মহল্লার একটি ভাড়া বাড়িতে বসবাস এই পরিবারের। এর মধ্যে মৌ সবে ভর্তি হয়েছে কেজিতে। আর নাদিম পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে।

‘নাতি দুইডা নিয়ে পড়ছি বিপদে। তিন মাস অন্তর সঞ্চয়পত্রের ৫ হাজার টাকা পাই। তাই দিয়ে কি আর ওগো লেহাপড়া চলে! ঘর ভাড়া দিমু কইত্থন আর পেড চালামু কী দিয়া,’ দুই নাতিকে কোলে নিয়ে আক্ষেপ ঝরে ফাতেমার।

১১ বছরের কিশোরী সেতুর একই আক্ষেপ। বাবা শেখ ফরিদকে শেষবারের মতো দেখতে পারেনি সে। তখনকার স্মৃতি বলতে মনে পড়ে বাবার আদর আর বাড়ি ফেরার সময় চকলেট নিয়ে আসার কথা।

সেতু জানায়, বাবার লাশের সন্ধানে মা আর পরিবারের অন্য সদস্যরা দিনরাত পড়ে থাকতেন অভিশপ্ত রানা প্লাজার সামনে। পচাগলা লাশের ভিড়ে খুঁজে ফিরতেন বাবাকে। এভাবে টানা ৭২ দিন কেটেছে ঘটনাস্থল থেকে লাশ শনাক্তের স্থান অধরচন্দ্র স্কুল, তার পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গ। এভাবে ডিএনও টেস্টের মাধ্যমে জুরাইন গোরস্তানে বাবার কবরটা কেবল চিহ্নিত করতে পেরেছে সেতুর পরিবার। তার কাছে বাবাহীন পৃথবীটার মানে যেন এক গভীর শূন্যতা।

ধসে পড়া রানা প্লাজার পঞ্চম তলায় কাজ করতেন নিলুফা বেগম। ভাগ্যক্রমে জীবনটা ফিরে পেলেও অভিশপ্ত রানা প্লাজা কেড়ে নিয়েছে একটি ডান পা। তার ওপর জটিল কিডনি রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসার সামর্থ্য নেই। একটি পা হারানোর ক্ষতিপূরণ হিসেবে পেয়েছেন মাত্র ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সেই টাকা কবেই শেষ! টাকা দিয়ে কি সত্যিই ক্ষতিপূরণ হয়Ñ এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন তিনি।

‘২৪ তারিখ আইলো আর আপনারা সম্বাদিকরা ভূমিকম্পের মতোন আমাগো খবর নেয়া শুরু করলেন। ৫টা বছর কীভাবে পেত্যেকটা দিন কাটছে হেই খবর কি কেউ নিছে? আর আমাগো ক্ষতিপূরণের যে কতা কন, হেইডা কি ঠিক। আইচ্ছা আমারে ২০ তলা বাড়ি বানায়া দিলে কি আমি আমার পা-খান ফিরা পামু?’ এসব ঝাঁঝালো প্রশ্নে ক্ষোভ আর কষ্টে উগরে দেন নিলুফা বেগম।

রানা প্লাজার সেই ঘটনাস্থল এখন কচুরিপানার ডোবা। যে ডোবার এঁদো জল আর কাদামাটি মিশে আছে হতাহতদের রক্ত আর কান্নার নোনা জলে। আর বাতাসে লাশ পচা দুর্গন্ধের বদলে ভেসে বেড়ায় স্বজনহারাদের বেদনার সুর। চারপাশ ঘিরে থাকে প্রিয়জন হারানোর আর্তনাদ আর হাহাকার।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে