শহরকেন্দ্রিক সতর্কতা প্রচারে ‘মনোযোগ’ কম ছিল দুর্গমে

রাঙামাটিতে পাহাড়ধসে ১১ প্রাণহানি

  জিয়াউর রহমান জুয়েল, রাঙামাটি

১৪ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গত বছর স্বরণকালের ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২০ জনের প্রাণহানির ঘটনায় জেলা প্রশাসন রাঙামাটি শহরকেন্দ্রিক নজরদারি আর সতর্কতামূলক প্রচারে ব্যস্ত ছিল। এতে ‘মনোযোগ’ কম ছিল উপজেলাগুলোর প্রতি। মঙ্গলবার নানিয়ারচরে পাহাড়ধসে ১১ জনের প্রাণহানির অন্যতম কারণ হিসেবে এটাকেই মনে করা হচ্ছে।

প্রশাসনের নজর ছিল শুধু গত বছরের প্রাণহানি ঘটা রাঙামাটি শহরের বসতিগুলোর দিকে। এবার তাই দুদিন আগ থেকে সতর্কতামূলক মাইকিং করে প্রচার চালায়। অথচ জেলার আরও নয়টি উপজেলায় ছোট-বড় পাহাড়ধসের ঘটনা গত বছর যেমনি ঘটেছিল, তেমনি বাদ যায়নি এবারও। তবে রাঙামাটি সদর, কাউখালী, কাপ্তাই ও জুরাছড়িতে এসব প্রাণহানি ঘটলেও নানিয়ারচর ছিল না সে তালিকায়। ফলে শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে থাকা নানিয়ারচরে ছিল না প্রশাসনের কোনো কর্মতৎপরতা। সেখানে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরিয়ে দিতে তাদের কোনো উদ্যোগও ছিল না।

এদিকে মঙ্গলবার নানিয়ারচরে পাহাড়ধসে নিহত ১১ জনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বুধবার সম্পন্ন করেন তাদের স্বজনরা। নানিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন তালুকদার জানান, লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে সোম ও মঙ্গলবার লংগদুর মাইনী নদীতে পাহাড়ি ঢলে নিখোঁজ হওয়া আয়নাল হোসেন (২৮) ও মুন্নি আক্তারের (১৩) সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। শনিবার

থেকে টানা চার দিনের বৃষ্টিপাতের কারণে মঙ্গলবার ১১ জনের নিহতের ঘটনায় আতঙ্ক আর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে রাঙামাটিতে। এরইমধ্যে দুর্যোগে সহায়তা ও সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের হিসাবে রাঙামাটিতে তিন হাজার ৩৭৮ পরিবারের প্রায় ১৫ হাজার লোক এখনো পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে বসবাস করছেন। এরমধ্যে রাঙামাটি পৌর এলাকার নয়টি ওয়ার্ডের ৩৪টি এলাকায় ৬০৯টি পরিবারকে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারী হিসেব চিহ্নিত করা হয়েছে। এখনো ৩১টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রয়েছে। এ ছাড়া রাঙামাটি সদর উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে ৭৫০ পরিবারের তিন হাজার ৪২৪ জন পাহাড়ের ঢালে ঝুঁকিতে আছে।

এমন পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসন পৌর এলাকায় ২১টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে। কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে লোকজন এলেও অপর্যাপ্ত ত্রাণের কারণে তারা আবার নিজের ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। রাঙামাটি শহরের টেলিভিশন উপকেন্দ্র আশ্রয়কেন্দ্রে ১১০ জন আশ্রয় নেন; কিন্তু গতকাল (বুধবার) বিকালে গিয়ে দেখা যায়, লোকজন আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে যাচ্ছেন। মাত্র তিনটি পরিবার আছে এখন। কথা হয় রূপনগর এলাকার গৃহবধূ জোসনা আক্তার (৩০), নাছিমা বেগম (৩২), ফিরোজা বেগম (৩৫) ও মরিয়ম বেগমের সঙ্গে। তারা বলেন, ‘পরিবার নিয়ে চার দিন ধরে আশ্রয়কেন্দ্রে আছি। শুধু ইফতারি দিয়েছেÑ শুকনো চিড়া, মিঠাই ও একটি কলা। ঘর থেকে খাবার রান্না করে আনতে হয়, তাই নিজের ঘরেই ফিরে যাচ্ছি। মরলে সেখানেই মরব।’

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকায় লোকজন নিজেদের ঘরে ফিরে যাচ্ছে; কিন্তু পরিস্থিতি খারাপ হলে তারা আবারও আশ্রয়কেন্দ্রে ফিরবে।

সরেজমিনে জানা যায়, গত বছর ভারী বর্ষণের কারণে নানিয়ারচরে পাহাড়গুলোর মাটি আলগা হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু তখন সেখানে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। এরই মধ্যে নানিয়ারচরে নতুন করে অনেকেই পাহাড়ের মাটি কেটে বসতি স্থাপন করেছেন। বিশেষ করে উপজেলার ধর্মচরণপাড়া, বড়পোলপাড়া, হাতিমারা ও চৌধুরীছড়া মোনতলাপাড়া এলাকাতেই এ বসতি গড়ে উঠেছে সবচেয়ে বেশি। ফলে প্রশাসনের নজরদারি আর সতর্কতামূলক প্রচারের অভাবেই এবার নানিয়ারচরে পাহাড়ধসে ১১ জনের প্রাণহানি ঘটল ।

বেঁচে আছেন দুই ভাই : নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের ধর্মচরণপাড়ায় পাহাড়ের কোলঘেঁষে কৃষক রিগেন চাকমার টিনের চালায় মাটির তৈরি বিশাল গুদামঘর। বৃদ্ধ মা ফুল দেবী চাকমা, ছোট ভাই ইমান দেওয়ান, ছোট বোন ইতি চাকমা, স্ত্রী স্মৃতি চাকমা ও ছেলে আযুব দেওয়ানকে নিয়ে ছিল সুখের সংসার। গত সোমবার রাতে প্রবল বর্ষণে পাহাড়ধসে কয়েক মিনিটের মধ্যে সুখের সংসার তছনছ হয়ে যায়। এখন পরিবারের মধ্যে বেঁচে রয়েছেন শুধু দুই ভাই।

আবেগাপ্লুত রিগেন দেওয়ান বলেন, সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে অদ্ভুত ধরনের একটা আওয়াজ হয়। এরপর আমরা কে কোথায় রয়েছি জানি না। তবে আমি দৌড়ে পালানোর সময় ‘দাদা আমাকে বাঁচাও’ বলে ছোট ভাই ইমানের চিৎকার শুনতে পাই। কাছে গিয়ে দেখি তার গলা পর্ষন্ত মাটিতে চাপা পড়ে আছে। কিন্তু তাকে উদ্ধার করতে পারলেও মা, বোন, বউ, ছেলে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। এখন ছোট ভাইকে নিয়ে কী করব জানি না।

ইমান দেওয়ান বলেন, ‘মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে গেছে সবকিছু। আমাকে ভাই টেনে তুললেও সকালে গ্রামবাসীর সহায়তায় মা, বোন, ভাবি ও ভাতিজার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এখন সারাক্ষণ শুধু ওই ঘটনাই মনে পড়ছে।’

নানিয়ারচর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কোয়ালিটি চাকমা বলেন, ‘এর আগে নানিয়ারচরে এমন পাহাড়ধস হয়নি। তাই এ এলাকায় সতর্কতামূলক প্রচারেও তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া দুর্গম এলাকায় এসব দুর্ঘটনা ঘটায় তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধারকাজ করাও সম্ভব হয়নি।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন তালুকদার বলেন, আমাদের ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল; কিন্তু দুর্গম হওয়ায় মঙ্গলবার নিহত ব্যক্তিরা হয়তো সতর্কবার্তা পাননি। আমরা মাইকিং করে সতর্ক করার চেষ্টা করছি।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ বলেন, এখনো যারা ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন, তাদের নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।

রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী আবু মুছা জানান, রাঙামাটি থেকে চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান সড়কের বেশ কিছু স্থানে সড়কে ফাটল ও পাহাড়ধসের কারণে যোগাযোগ বিঘœ ঘটে। তবে বুধবার যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে