ওদের নতুন জীবন

থাই গুহা থেকে উদ্ধার কিশোর দল

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১২ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১২ জুলাই ২০১৮, ০৯:৪৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘যেন এক নতুন জীবন পেয়েছে ও। এ যেন পুনর্জন্ম।’ কান্নায় ভেঙে পড়া এক বাবার এ কণ্ঠ শোনা গেছে থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় এক হাসপাতালে। গতকাল বুধবার চিয়াং রাই শহরের ওই হাসপাতালে স্বচ্ছ কাচের দেয়ালের ওপাশ থেকে ছেলেকে দেখে আনন্দে কাঁদছিলেন তানাওয়াত ভিবুনরানগ্রুং। গুহায় আটকেপড়া ১২ খুদে ফুটবলারের মধ্যে তার ছেলে টিটুন ছিল সর্বকনিষ্ঠ, বয়স যার ১১ বছর।

থাম লুয়াং গুহা থেকে সফলভাবে উদ্ধার হওয়ার পর শুধু টিুটন নয়, ‘মু পা’ বা ‘বুনো শূকর’ দলের সব সদস্য ও তাদের কোচের জন্য এ এক নতুন জীবন। এ যেন ওদের নতুন জন্ম।

শুধু এই বুনো বালকরা নয়, থাই গুহায় যেন আটকে গিয়েছিল পুরো দেশ, পুরো পৃথিবী। ২৩ জুন ওই ১৩ জন গুহায় বেড়াতে গিয়ে আটকা পড়ে। প্রথমে ‘ফুটবল দল নিখোঁজ’ এই ধাঁচের শিরোনাম দেখা গেছে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোয়; কিন্তু থাই সরকার, বিশেষত দেশটির নৌবাহিনী সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে একটুও দেরি করেনি। দ্রুতই তারা ভিনদেশি ডুবুরি, ডাক্তার ও গুহা বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হন। অনুরোধ করেন ব্রিটিশ ডুবুরিদের, যেন গুহায় ওই স্কুলবালকদের অনুসন্ধানে তারা এগিয়ে আসেন। ডাকে সাড়া দিতে দেরি করেনি যুক্তরাজ্য; এগিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, চীন আর জাপান। সব মিলিয়ে হাজারের বেশি প্রশিক্ষিত ও দক্ষ উদ্ধারকর্মী যোগ দেন অভিযানে।

২ জুলাই ফুটবলারদের জীবিত সন্ধান পাওয়া যায়। গুহামুখ থেকে চার কিলোমিটার ভেতরে, মাটির আটশ মিটার নিচে। এরপর বিশ্বের চোখ সারাটা সময়জুড়ে তাকিয়ে থেকেছে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ওই গুহার দিকে। বিভিন্ন দেশ থেকে বিবিসি, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ানের মতো গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরা ছুটে যান চিয়াং রাই প্রদেশের মায়ে সাই জেলায়। গুহামুখের কাছেই বসানো হয় গণমাধ্যমকেন্দ্র। প্রতিদিন ‘সরাসরি’ হালনাগাদ করা হয় উদ্ধার অভিযানের সব তথ্য।

৮-১০ জুলাই তিন দিনের চূড়ান্ত অভিযানে গুহা থেকে সফলভাবে উদ্ধার করা হয় ১৩ বুনো তারকাকে। এখন ওদের হাসপাতালে থাকতে হবে সপ্তাহখানেক। এমনকি এ সময়ে পরিবারের সঙ্গরোধও করা হবে। গতকাল হাসপাতালে ওদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন মা-বাবারা; কিন্তু স্বচ্ছ কাচের দেয়াল ছিল মাঝখানে। থাই নৌবাহিনী ফেসবুকে এ মিলনের ভিডিও প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, অভিভাবকদের উদ্দেশে বিছানা থেকে বালকরা হাত নাড়াচ্ছে। মুখে ওদের তখনও মাস্ক পরানো। কেউ কেউ দুই আঙুল উঁচিয়ে ‘বিজয়ানন্দ’ও প্রকাশ করছে। আর কাচের ওপাশ থেকে মা-বাবারা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

টিটুনের বাবা তানাওয়াত ভিবুনরানগ্রুং বলেন, ‘আমি কাঁদতে শুরু করি। সবাই কাঁদতে থাকে। যারা আমার ছেলেকে উদ্ধার করেছেন তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তাদের কারণেই তো এক নতুন জীবন পেয়েছে ও; এ যেন পুনর্জন্ম।’

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রত্যেকেই সুস্থ আছে; কিন্তু ওরা যেন সংক্রামিত না হয়, সে জন্য বাইরের কারো সংস্পর্শেই ওদের আসতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি পরিবারের সঙ্গেও না। আবার ওদের থেকে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কাও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। এখন ওদের নরম খাবার দেওয়া হচ্ছে। যেমন- ভাত, মুরগির মাংস। সঙ্গে ভিটামিনও খাওয়ানো হচ্ছে। নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম ১০ দিন তারা বলতে গেলে কিছুই খায়নি। জল আর সামান্য শুকনো খাবার ভাগযোগ করে খেতে হয়েছিল। সন্ধান পাওয়ার পর ওদের খেতে দেওয়া হয়েছিল ‘উচ্চ শক্তির; কিন্তু সহজে হজম হয়’ এমন খাবার। সঙ্গে ভিটামিন ও মিনারেল। সঙ্গরোধ পর্ব পার হওয়ার পর বালকদের ছেড়ে দেওয়া হবে; কিন্তু এরপরও পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে ওদের মাসখানেক লাগতে পারে।

নতুন জীবনে কীভাবে এগোবে কিশোররা? ওদের স্কুলে এখন পরীক্ষার মৌসুম। স্কুল থেকে জানানো হয়েছে, ওরা বেঁচে ফিরেছে, এতেই আনন্দিত সবাই। ওদের আর পরীক্ষায় বসতে হবে না। ওদের জন্য বিশেষ পাঠদানের ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। মানসিক শক্তি জোগাতেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গুহার অন্ধকারে আতঙ্কের জীবন সামনের দিনগুলোতে প্রভাব ফেলতে পারে, এ বিষয়েই সবাই মনযোগ দিচ্ছে।

যেহেতু দুই ব্রিটিশ ডুবুরি ওদের সন্ধান দিয়েছিলেন। তাই বিশ্বকাপে গতকালের ম্যাচে থাইল্যান্ডের ফুটবলপ্রেমীরা ইংল্যান্ডকে সমর্থন করার কথা জানিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, এই কিশোররা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সমর্থক। ক্লাবটি ওদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। সুস্থ হলে হয়ত ওই ক্লাবের খেলোয়াড়দের সঙ্গে দেখা করতে যাবে এই খুদে ফুটবলাররা।

গুহার ভেতর উদ্ধার প্রক্রিয়াটা ছিল মিশ্র। হাঁটা, আরোহণ, ডুব-সাঁতার সবই আবার ঘুটঘুটে অন্ধকারে। তবে গুহামুখ থেকে আশ্রয়স্থল পর্যন্ত একটা পথনির্দেশক দড়ি বেঁধে দেওয়া হয়। কিশোরদের পরানো হয় অক্সিজেন মুখোশ। প্রত্যেকের সঙ্গে দুজন করে প্রশিক্ষিত ডুব-সাঁতারু। ডুবুরিরাই কিশোরদের অক্সিজেন ট্যাংক বহন করেন। রশি দিয়ে ডুবুরির সঙ্গে কিশোরকে আটকে দেওয়া হয়। ভয়ঙ্কর ঝুঁকি উদ্ধারপথের মাঝামাঝি। সেখানে গুহার প্রকোষ্ঠ এতই সংকীর্ণ যে, ডুবুরিকে তার পিঠে থাকা অক্সিজেন ট্যাংক খুলে তারপর চলতে হয়। গুহার ভেতর অক্সিজেনের অভাবে থাই নৌবাহিনীর সাবেক ডুবুরি সমন গুনন মারা যান। তাকে ‘গভীরভাবে স্মরণ’ করেছেন কিশোরদলের মা-বাবারা এবং পুরো বিশ্ব।

‘সাহসী ও শক্তিশালী’ এই বালকরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরুক এই প্রত্যাশাই করছে সবাই। ওদের জন্য যেমন স্কুলবন্ধুরা অপেক্ষা করছে, তেমনি ওদের সুস্থ আগামীর শুভকামনা করছে বিশ্ববাসী।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে