৩৫ দিনেও মামলা নেই দায় এড়াচ্ছে দুই থানা

শ্যামপুরে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে যুবকের মৃত্যু

  ইউসুফ সোহেল

২১ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

১১ মাস আগে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন সুমনচন্দ্র (৩০)। তার স্ত্রী সাথী রাণী দে এখন ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। অনাগত সন্তানকে নানা পরিকল্পনার কথা স্ত্রীকে বলতেন সুমন। কিন্তু সন্তানকে দেখারই সুযোগ পেলেন না তিনি। রাজধানীর শ্যামপুরের পোস্তগোলা ব্রিজের অদূরে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন বাসচালক সুমন। মর্মান্তিক এ ঘটনা গত ১৫ জুন মধ্যরাতের। খুনিদের ধরা তো দূরের কথা, দুই থানার (শ্যামপুর ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ) দায় এড়ানোতে গত ৩৫ দিনেও মামলাই হয়নি। মামলা বা তদন্তের দায়িত্ব না নিলেও ময়নাতদন্ত ছাড়াই সুমনের লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে শ্যামপুর থানার পুলিশ।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল থেকে দেওয়া ছাড়পত্রে (হসপিটাল কোড নংÑ১০০০০০৩৩; ভর্তি রেজিস্ট্রেশন নংÑ১৩২৯০/৭০) সুমনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে একাধিক ছুরিকাঘাতের কথা বলা হয়েছে। ‘পুলিশ কেইস’ করার কথাও উল্লেখ রয়েছে ছাড়পত্রে। তার পর ৩৫ দিনেও হত্যকা-ের বিষয়ে থানায় মামলা হয়নি। মৃত্যুর পর দুই দিন ঢামেক মর্গে সুমনের লাশ রাখা ছিল। কিন্তু শ্যামপুর থানা পুলিশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই সুমনের

লাশ তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে। পরে শ্যামপুরের পোস্তগলা শ্মশানঘাটে মরদেহ সৎকার করা হয়।

নিহতের বাবা মানিক চন্দ্র ও বোন শান্তা রানী আমাদের সময়কে জানান, কেরাণীগঞ্জ-পোস্তগোলা রুটে বাস চালাতেন সুমন। গত ১৫ জুন রাতে গাড়ি পার্ক করে শ্যামপুর থেকে পুরান ঢাকার নারিন্দার ঋষিপাড়ার বাসায় ফিরছিলেন। পোস্তগোলা ব্রিজের কাছে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি। তারা টাকা-মোবাইল ফোন কেড়ে নিতে চাইলে বাধা দেন সুমন। একপর্যায়ে ছিনতাইকারীরা সুমনের পেটে ছুরিকাঘাত করলে নাঁড়ি-ভুড়ি বেরিয়ে আসে। এ সময় সুমনের চিৎকারে ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যায়। পরে আশপাশে কাউকে না পেয়ে সুমন নিজেই একটি সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে ঢামেক হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হন। পরদিন সেখানকার ১০১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সুমন মারা যান। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে কিনা তা এখনও জানে না সুমনের পরিবার।

একাধিক আইনজীবী ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমাদের সময়কে জানান, সন্দেহজনক কোনো ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ও ময়নাতদন্ত করার নিয়ম। নিহতের পরিবার না চাইলেও এই প্রক্রিয়ায় এগোনো পুলিশের কর্তব্য। হত্যাকা-ের ঘটনায় ময়নাতদন্ত করা বাধ্যতামূলক। কারণ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট কেবল মামলা তদন্তের জন্য নয়, এটি বিচারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশ পুলিশ প্রবিধান ও ফৌজদারি কার্যবিধির বিভিন্ন ধারা তুলে ধরে পুলিশ কর্মকর্তারা আরও জানান, নিহতের পরিবার হত্যা মামলা করতে না পারলে বা অপারগতা প্রকাশ করলে পুলিশ বাদী হয়ে তা করার কথা। মামলা দায়ের বা ময়নাতদন্ত না হলে তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে বুঝতে হবে।

হত্যাকা-ের ঘটনায় মামলা দায়ের না করা ও ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ হস্তান্তরের অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে শ্যামপুর থানার ওসি মিজানুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, ‘ঘটনাটি দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুরের। ছিনতাইকারী বা দুর্ঘটনার কবলে পড়ে হয়ত ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছে। নিহতের পরিবারের আবেদনের কারণে আইনগত সবদিক ঠিক রেখেই লাশ হস্তান্তর করেছি। ঘটনাটি কেরাণীগঞ্জ থানাধীন, ওই থানায় মামলা হওয়ার কথা।’ দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানা পুলিশ ও নিহতের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানার ঘটনায় শ্যামপুর থানা পুলিশ কী করে ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ হস্তান্তর করে জানতে চাইলে ফোনের লাইন কেটে দেন তিনি।

জানতে চাইলে দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুরে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে সুমন চন্দ্র নামে কোনো যুবক মারা গেছেন বলে আমাকে কেউ জানায়নি। তাই এই ধরনের কোনও ঘটনার বিষয়ে আমি অবগত নই।’

ঢামেক হাসপাতালে কর্মরত একাধিক আনসার ও পুলিশ সদস্য আমাদের সময়কে বলেন, সুমনের মৃত্যু-পরবর্তী ঘটনা তদারকি করেন শ্যামপুর থানার এসআই দীন ইসলাম। তিনি ঢামেক থেকে সুমনের লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাবউদ্দিন খান বলেন, ‘হত্যাকা-ের পর লাশের ময়নাতদন্ত, প্রয়োজনীয় আলামত সংরক্ষণ এবং মামলা করা বাধ্যতামূলক। নিহতের পরিবার মামলা করতে না চাইলে পুলিশ বাদী হয়ে তা করবে এটাই নিয়ম। এর ব্যত্যয় ঘটানোর কোনো সুযোগ নেই।’

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে