ইমরানের হাতের কাছে মসনদ

সংবাদ পর্যালোচনা

  যুবা রহমান

২১ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৮, ০৯:৪৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাকিস্তানে জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র তিন দিন বাকি। ঠিক এই সময় দেশটির নির্বাচনী হাওয়া বলছে আসছে দিন ইমরান খানের। নির্বাচনের আগে সাধারণত যেসব নিয়ামক ভোট নিয়ন্ত্রণ করে এবার সব কটি যেন ইমরানের পক্ষে কলকাঠি নাড়ছে। তাই হয়তো, পাকিস্তানের বিশ্লেষকরা বলতে শুরু করেছেন, ‘ইমরানের সময় এলো বলে’। আবার কেউবা বলছেন, ‘অপেক্ষায় রয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী’। শুধু বিশ্লেষকরাই নয়, নির্বাচন ঘিরে যেসব জরিপ হয়েছে সেগুলোতেও উঠে এসেছে ইমরানের এগিয়ে থাকার চিত্র।

পাকিস্তানের অন্যতম সংবাদমাধ্যম ‘ডন’ কয়েকদিন আগে একটি জনমত জরিপ প্রকাশ করেছে। যদিও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেই জরিপটির সর্বজনীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে তারপরও সেখান থেকে কিছু আঁচ আমরা পাব। জরিপে যারা অংশ নিয়েছেন তাদের গড় বয়স ১৮ থেকে ৪৪। তাদের মধ্যে অর্ধেক নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ পাঞ্জাবের অধিবাসী। জরিপে ৮৩% অংশগ্রহণকারী মনে করেন এবার নির্বাচনে ইমরান খানের দল পিটিআই জয়ী হবে। ১২ শতাংশ লোক মনে করেন নওয়াজ শরীফের দল পিএমএল-এন জয়ী হবে।

এছাড়া পিপিপি’র পক্ষে মাত্র রয়েছে ১ শতাংশ লোক। স্বচ্ছতার প্রশ্নে ৪১% লোক মনে করেন, নির্বাচন স্বচ্ছ হবে আর ৩১% মনে করেন নির্বাচনে কারচুপি হবে আর ২৭.৮২ শতাংশ এ বিষয়ে কোন মতামতই দেননি। তবে এটা ঠিক নির্বাচনী পরিসংখ্যান সব সময় কাজে দেয় না। কিন্তু পাকিস্তানে যেটা কাজে দেয় সেই সেনাবাহিনীও এবার ইমরানের পক্ষে কাজ করছে জোর গুঞ্জন রয়েছে। এই তো গত সপ্তাহেও এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়ে গেল।

বিবিসির সাক্ষাৎকারবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘হার্ডটকে’ সংবদাম্যধ্যম ডনের প্রধান হামিদ হারুন বলেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করছে এবং তারা (সেনাবাহিনী) তাদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার জন্য সংবাদমাধ্যমকে চাপ দিচ্ছে। এমনকি ইমরানের নাম নিয়েও হামিদ হারুন বলেন, সেনাবাহিনী তার (ইমরান) পক্ষে কাজ করছে। এমনিতে, বিষয়টি দিবালোকের মতো সত্য যে, পাকিস্তানে সেনাবাহিনী দেশের ক্ষমতায় নাক গলিয়ে থাকে। স্বাধীনতার পর বহুবার পাকিস্তানের জনগণ তা প্রত্যক্ষ করেছে। আর সেনাবাহিনী ইমরানের পক্ষে কাজ করছে জনমনে এমন প্রসঙ্গ গেঁথে থাকার আরেকটি কারণ হলো- নওয়াজ শরীফের সঙ্গে সেনা দপ্তরের তিক্ত সম্পর্ক। অনেকেই মনে করেন, এসব কারণেই নওয়াজের আজ কারাবরণ করতে হয়েছে।

এবার আসা যাক, নির্বাচনী ময়দানে কোন দলের অবস্থান কেমন? ইমরান খানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী নওয়াজ শরিফ এখন দুর্নীতির দায়ে জেলে। তার মেয়ে মরিয়ম নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন কিন্তু তারও ৭ বছরের জেল হওয়ায় নির্বাচন থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। নির্বাচনের আগে নওয়াজ আশা করেছিলেন তার জামিন হবে কিন্তু সেই আশায় গুড়েবালি। আদালত ৩০ তারিখ পর্যন্ত মুলতবি করায় সেটি আর হচ্ছে না। অর্থাৎ নির্বাচনী ময়দানে নওয়াজ সশরীরে হাজির থাকতে পারছেন না। দলের এমন শোচনীয় পরিস্থিতিতে নির্বাচনী প্রচারের হাল ধরেছেন মরিয়মপুত্র জুনায়েদ।

গত সপ্তাহে তাকে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে নিয়ে আসা হয়েছে। আর নওয়াজকে কোণঠাসা করার জন্য ইমরান যে দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন করে আসছেন সেটা সকলেরই জানা। রাজপথ কামড়ে পড়ে থাকা আন্দোলনের দিনগুলো তার বিফলে যায়নি। বাকি থাকল বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)। এবার ভোটের বাজারে যার আওয়াজ তেমন শোনাই যায়নি। পরিস্থিতি এমন যে, প্রধান তিন দলের মধ্যে ইমরান খান অনেকটা ফাঁকা মাঠেই গোল দিতে যাচ্ছেন।

ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া ৬৫ বছর বয়সী ইমরান খান ১৯৯৬ সালে পিটিআই গঠন করেন। তখন থেকেই তার স্বপ্নÑ একদিন পাকিস্তানের মসনদে বসবেন। এরপর দিন যতো গড়িয়েছে তার রাজনীতির ভিত ততো মজবুত হয়েছে। ২০১৩ সালে নির্বাচনে পরাজয় মেনে না নিয়ে তিনি বলেছিলেন তার কাছ থেকে নির্বাচন চুরি করা হয়েছে।

টানা ১২৬ দিন ইসলামাবাদে সমর্থক নিয়ে নওয়াজের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন ইমরান। এছাড়া দীর্ঘদিন তিনি মার্কিন ড্রোনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। সব মিলিয়ে পাকিস্তানে ইমরানের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। সাধারণ জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন তিনি। দেশের তরুণ ভোটাররা মনে করেন, ইমরান খান ক্ষমতায় এলে পাকিস্তানের চেহারা বদলে যাবে। এবারের নির্বাচনী ইশতেহারেও সেই বিষয়টিই তিনি ঝা-া বানিয়েছেন। ইশতেহারের শিরোনাম দিয়েছেন ‘ রোড টু নয়া পাকিস্তান (নতুন পাকিস্তানের পথ)’।

সবকিছুর পরও নির্বাচনের কিছু ফ্যাক্টর অনিশ্চিত থেকে যায়। পাকিস্তান সেই ফ্যাক্টরের নাম পাঞ্জাব। পাঞ্জাব নওয়াজের শক্ত ঘাঁটি। নওয়াজ জেলে থাকলেও তার জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নেমেছে তা বলা যাচ্ছে না; বরং লন্ডন থেকে পলাতক জীবন বেছে না-নিয়ে পরোয়ানা নিয়ে দেশে ফেরায় জনগণ তার সাহসের তারিফ করছে। তাকে ‘খাঁটি নেতা’ মানতে শুরু করেছে। এ কারণে পাঞ্জাবের ফলাফল ইমরানের মসনদের স্বপ্ন চুরমার করে দিতে পারে। বিষয়টি যে ইমরানের আমলে নেই তা নয়। আসন্ন বিপদ সামাল দিতে পাঞ্জাবের কিছু এলাকায় স্থানীয় দলের সঙ্গে জোট বেঁধে লড়াই করছেন। সব মিলিয়ে, ব্যাটে-বলে মিলে গেলে এবার ছক্কা হাঁকাবেন ইমরান খান।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে