৩০০ কোটি টাকার গাড়ি নষ্ট হচ্ছে অবহেলায়

  গোলাম সাত্তার রনি

২২ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২২ জুলাই ২০১৮, ১২:৫২ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘আমি স্বেচ্ছায় গাড়িটি রাস্তায় রেখে গেলাম। কিন্তু গাড়িটির আমদানিকারক আমি নই। দেশের আইনের প্রতি আমি সর্বদা শ্রদ্ধাশীল; আমদানিকারককে আইনের আওতায় নেওয়ার জন্য শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কাছে বিনীত অনুরোধ রইল।’ সাদা কাগজে চিরকুটটি লিখে গত ৫ জুলাই রাজধানীর গুলশান ১-এর একটি রাস্তায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের নম্বরপ্লেটহীন টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার ভি-৮ গাড়িটি ফেলে যান এর ব্যবহারকারী।

এর আগের দিন সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসনকেন্দ্রে (সিআরপি) অভিযান চালিয়ে শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাখা ৩০ কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল ১১টি গাড়ি জব্দ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। গত বছরের এপ্রিলে হাতিরঝিল এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৪ কোটি টাকা মূল্যের পোরশে কায়ানে ৯৫৫ মডেলের একটি গাড়ি জব্দ হয়। শুল্ক ফাঁকির ‘প্রায়শ্চিত্ত’ হিসেবে এর মালিক একটি চিঠি লিখে গাড়িটি রাস্তায় ফেলে যান। চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘গাড়িটি রেখে গেলাম, আপনারা আমাকে খোঁজার চেষ্টা করবেন না।’

শুধু এই ১৩টি গাড়িই নয়, ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শুল্ক ফাঁকিসহ নানা জালিয়াতির অভিযোগে ৮২টি গাড়ি জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এর মধ্যে মিসরের রাষ্ট্রদূত মাহমুদ ইজ্জতের রেঞ্জ রোভার, ধনকুবের প্রিন্স মুসা বিন শমসেরের রেঞ্জ রোভার জিপ, আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদের বিএমডব্লিউ, ইউএনডিপি প্রতিনিধি স্টিফেন প্রিজনারের মিতসুবিশি, সন্তোস প্রতাপের বিএমডব্লিউ, আশিকুল হাসিব তারিকের মিতসুবিশি, বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধি মিজ মির্ভা তুলিয়ার টয়োটা রেভ-৪ ও মৃদুলা সিংহের টয়োটা প্রিমিও, আইএলওর কর্মকর্তা মি ফ্রান্সিস দিলীপের টয়োটা সিডান ও জুনিয়র প্রফেশনাল মিজ নিস জ্যানসেনের পাজেরো জিপ, উত্তর কোরিয়ার কূটনীতিক মি. হ্যান সন ইকের ঘোস্ট মডেলের রোলস রয়েসসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গাড়িও রয়েছে। শুল্ককরসহ এসব গাড়ির আনুমানিক মূল্য ৩১১ কোটি ৫ লাখ ৭৯ হাজার ৯৭৪ টাকা।

জব্দ করা এসব গাড়ি এখন রয়েছে বিভিন্ন কাস্টম হাউসে। সবচেয়ে বেশি গাড়ি রয়েছে ঢাকা কাস্টম হাউসে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের অবহেলায় এখন খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা কোটি কোটি টাকা দামের বিলাসবহুল এসব গাড়ি নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে রোদ-বৃষ্টি ঝড়ে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামলা জটিলতার কারণে গাড়িগুলো বুঝে পাচ্ছেন না মালিকরা। যথাযথভাবে সংরক্ষণের অভাবে গাড়িগুলো প্রায় বিকল হয়ে পড়েছে। এ জন্য অধিকাংশ কাস্টম হাউস ও কাস্টমস ভ্যাট কমিশনারেটে জব্দ করা গাড়ি রাখার মতো গুদাম বা পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকাকেই দুষছে।

কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের বিকল গাড়ি রাষ্ট্রীয় অনুক‚লে বাজেয়াপ্ত হলেও রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জব্দ করা গাড়িগুলো প্রকৃত মূল্যের ৬০ শতাংশ না হলে নিলামে তোলা যায় না। ফলে নিলামে তুললেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র প্রকৃত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সূত্র আরও জানায়, শুল্ক গোয়েন্দাসহ বিভিন্ন সংস্থা গাড়ি জব্দের পর তারা সেগুলো কাস্টম হাউসে রেখে যায়। বছরের পর বছর ধরে এক একটি গাড়ির বিচার কার্যক্রম শেষ হয় না। ফলে গাড়িগুলো রোদ-বৃষ্টি ও অযত্নে নষ্ট হলেও তাদের করার কিছুই নেই। এ পরিস্থিতি উত্তরণে জব্দ গাড়িগুলো আদালতের মাধ্যমে সরকারি কাজে (বিভিন্ন দপ্তরে সরবরাহের মাধ্যমে) ব্যবহার করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. শহীদুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, আমদানি পর্যায়ে তথ্য ফাঁকি-অনিয়ম ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য গাড়ি জব্দ করেছেন শুল্ক গোয়েন্দারা। কাস্টমস আইনে বলা আছে যে কোনো পণ্য বা গাড়ি জব্দের পর নিকটস্থ কাস্টমস গুদামে দেরি না করে জমা দিতে হবে। সে অনুসারে জব্দ গাড়িগুলো আইন অনুসারে নিকটস্থ কাস্টমস গুদামে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু কাস্টমসে পাঠানোর পর রোদ-বৃষ্টিতে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।

সরকারিভাবে কোনো গ্যারেজ না থাকার কারণেই এমনটি হচ্ছে। জব্দ গাড়িগুলো সচল রাখার জন্য আমরা আদালতে আবেদন করব, যেন সরকারি কাজে এগুলো ব্যবহার করা যায়। নতুন একটি উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন বলেও ড. শহীদুল ইসলাম জানান।

সরেজমিন ঢাকা কাস্টম হাউস ঘুরে দেখা গেছে, কোনো শেড বা অবকাঠামো না থাকায় বিভিন্ন সময়ে জব্দকৃত বিলাসবহুল গাড়িগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে কর্তৃপক্ষ সেগুলো রাখতে বাধ্য হয়েছে ভবনের পেছনে মসজিদের পাশে খোলা আকাশের নিচে। সেখানে অযত্ন-অবহেলায় অর্ধশতাধিক গাড়ি পড়ে নষ্ট হচ্ছে। কোনটির বাতি নেই, কোনটির কাচ ভাঙা। কয়েকটি তো মরিচা পড়ে প্রায় ধ্বংস। কোটি কোটি টাকার গাড়িগুলো যেন এখন পথচারীদের শৌচাগারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু দেখার যেন কেউ নেই।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে