সুন্দরী সোহেলের অসুন্দর ছায়া মাড়াতে পারেনি পুলিশ

বনানীতে যুবলীগ নেতা রাশেদ হত্যা

  ইউসুফ সোহেল

২৩ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৩ জুলাই ২০১৮, ০৯:১৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর মহাখালীতে যুবলীগ নেতা কাজী রাশেদ হত্যাকাণ্ডের পর সাত দিন পেরিয়ে গেলেও প্রধান অভিযুক্ত বনানী থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ইউসুফ সরদার সোহেল ওরফে সুন্দরী সোহেলসহ অভিযুক্ত কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

নিহতের স্বজন ও একাধিক সূত্র এ হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত বনানী থানা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জাকির হোসেন সরদার ওরফে ‘ভাতিজা জাকির’ (সোহেলের চাচা) এবং ফিরোজকে (ডিস ব্যবসায়ী) আটকের কথা বললেও এর সত্যতা নিশ্চিত করেনি পুলিশ। জানা গেছে, ফিরোজ উত্তরার পাঁচ নম্বর সেক্টর ও জাকির নারায়ণগঞ্জ থেকে আটক হন। এ ঘটনায় সোহেলের সহযোগী সাততলা বস্তির ত্রাস প্রিন্স শাহ আলমকে আটক করা হলেও পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

রাশেদ খুনে অভিযুক্তরা যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে এ জন্য যুবলীগ নেতা সুন্দরী সোহেল, তার দেহরক্ষী সন্ত্রাসী হাসু, মিডিয়া নিয়ন্ত্রক দিপন ওরফে দিপু এবং মহাখালী দক্ষিণপাড়ার ডিশ ব্যবসায়ী ফিরোজের ওপর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

এদিকে রাশেদ খুনের তদন্তে নেমে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) ও থানাপুলিশ। তারা অনেকটাই নিশ্চিত, ২০ বছরের বেশি সময় ধরে কাজী রাশেদ যার দেহরক্ষী হিসেবে ছায়ার মতো সঙ্গ দিয়েছেন, সেই সুন্দরী সোহেলই সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে তাকে খুন করেছেন। সিসি ক্যামেরায় দেখা গেছে, ফিরোজ, হাসু, দিপু এবং ফর্সা লম্বা গড়নের অচেনা এক যুবক রাশেদের লাশ টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সুন্দরী সোহেল, ভিডিওতে দেখা এই চারজন ছাড়াও সোহেলের ক্যাশিয়ার রবির নামও উঠে এসেছে হত্যাকা-ে জড়িত হিসেবে। তিনিই সোহেলের সব অপকর্মের টাকা গচ্ছিত রাখতেন; দেখভাল করতেন অস্ত্রের ভাণ্ডারও।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গুলশান, বনানী ও মহাখালী এলাকার চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণের টাকা ভাগাভাগি নিয়েই রাশেদ খুন হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে। তাদের ধারণা, গত ১৪ জুলাই গভীর রাতে মহাখালীর স্কুল রোডের জিপি-গ/৩৩/১ নম্বর ভবনে (কঙ্কাল বাড়ি) অবস্থিত কথিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘রেইনবো নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে’র কার্যালয়ে রাশেদকে হত্যা করা হয়। তাকে গুলি করা এবং এর পর লাশ সরানোর কাজ করে সুন্দরী সোহেল, ফিরোজ, হাসু, দীপু, জাকির, রবিসহ আরও কয়েকজন।

ঘটনার সময় অফিসের মেঝে রাশেদের রক্তে ভেসে যায়। আলামত নষ্ট করতে পানি দিয়ে সেই রক্ত ধুয়ে মুছে ফেলে খুনিরা। পরে চারজন মিলে ভবন থেকে লাশ নামিয়ে দেয়ালের ওপাশের গলিতে ফেলে দেয়। আঙুলের ছাপ যেন ধরা না পড়ে তাই হাতে পলিথিন পেঁচিয়ে লাশ সরায় তারা, যা প্রতিষ্ঠানটির সিসি ক্যামেরার ফুটেজে ধরা পড়ে। ঘটনার পরদিন ভোরে সোহেলের কার্যালয়ের সীমানা দেয়ালসংলগ্ন গলি থেকে রাশেদের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়।

সূত্র আরও জানায়, সুন্দরী সোহেল রেইনবো নামের কথিত নিউজ পোর্টালটির প্রকাশক। সোহেলের দখলে থাকা ওই কঙ্কাল বাড়িটি ছিল তার টর্চার সেল। এখানে বসেই সোহেল নিয়ন্ত্রণ করতেন গুলশান, বনানী ও মহাখালী এলাকায় ডিশ ব্যবসা, টেন্ডার, চাঁদাবাজিসহ নানা অবৈধ কর্মকাণ্ড। তথাকথিত নিউজ পোর্টালের আড়ালে ভবনটিতে তিনি গড়ে তুলেছিলেন অবৈধ অস্ত্র-ইয়াবার মজুদখানা।

গত বৃহস্পতিবার ওই কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে অবৈধ দুটি বিদেশি পিস্তল, একটি বিদেশি রিভলবার, একটি শাটারগান ও ১২১টি গুলি জব্দ করে বনানী থানাপুলিশ। রেইনবো কার্যালয় ছাড়াও ভবনটির ছাদে গড়ে তোলা কবুতরের খামারের বিভিন্ন খোপে সোহেল মজুদ করতেন অবৈধ অস্ত্র ও ইয়াবার চালান। ছাদের প্রবেশদ্বারে সব সময় তালা ঝোলানো থাকলেও ছাদে অবস্থিত একটি কক্ষে বসবাস করত তার দুই ভাড়াটে কিলার। এদের মধ্যে নাসিম নামে একজন কয়েক বছর আগে ডিবি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। পালিয়ে বাঁচলেও তার গুলিবিদ্ধ বাঁ পা কেটে ফেলতে হয়। পরবর্তী সময়ে সোহেল ওই ভাড়াটে কিলারকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে বিকল্প পা লাগিয়ে নিয়ে আসেন।

মামলার বাদী নিহত রাশেদের স্ত্রী মৌসুমী আক্তার খুনিদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, খুনিদের দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করতে না পারলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারে। ঘটনার এতদিন পরও ভাতিজা জাকির ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বনানী থানার এসআই ফরিদুল আলম জানান, নিহতের স্বজনরা হত্যাকা-ে যাদের সন্দেহ করছেন তারাই রাশেদ খুনে জড়িত এবং সবাই রাশেদের পরিচিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকেই এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা যায়নি। তাদের গ্রেপ্তারে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

 

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে