১১০ কোটি টাকা জলে

  শেখ মাসুদ ইকবাল, কিশোরগঞ্জ

১৭ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৮, ০৯:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতীকী ছবি
শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সহস্র বছরের ঐতিহ্যবাহী খরস্রোতা নরসুন্দা নদী এখন বদ্ধ নালা। ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে পুরনো চেহারা ফিরে পাওয়ার পরিবর্তে ব্রহ্মপুত্রের এই শাখা নদীর অস্তিত্বই আজ হুমকির মুখে।

অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ, দখলদারদের লোলুপ দৃষ্টি, আর প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের কারণে নদীটির এই পরিণতি বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পে দুর্নীতির জন্য পরিবেশবাদীরা দায়ী করেছেন প্রকল্প পরিচালককে। একজন পরিবেশবাদী বলেছেন, সংস্কার প্রকল্পের মাধ্যমে মূলত নরসুন্দা নদীর শ্লীলতাহানি করা হয়েছে। আরেক পরিবেশবাদী বলেছেন, উচ্চ আদালত ও দুর্নীতি দমন কমিশনে যাবেন।

আর তদন্ত কমিটির প্রধান এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. রইছউদ্দিন প্রশ্ন তুলেছেন, কাজ বাকি থাকতে প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণা হয় কী করে। এলজিইডির কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেছেন, প্রকল্পটি ছিল উচ্চাভিলাষী, এটি তৈরিতেই সমস্যা ছিল।

নরসুন্দার উৎপত্তিস্থল হোসেনপুর উপজেলার কাউনায় স্থায়ী বাঁধ দিয়ে প্রায় চার দশক আগে আটকে দেওয়া হয় পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের পানিপ্রবাহ। তখন থেকেই মৃত নরসুন্দার দুপাড় দখল হতে থাকে। এক সময় প্রায় ভরাট হয়ে গিয়ে জেলার মানচিত্র থেকেই হারাতে বসেছিল নরসুন্দা। তখন দাবি ওঠে সংস্কারের। পরিবেশবাদীদের অব্যাহত দাবির মুখে সরকারও এগিয়ে আসে।

৩২ কিলোমিটার নদী খনন, ৭টি নতুন ব্রিজ নির্মাণ, ৪টি পুরনো ব্রিজ সংস্কার, দুটি নতুন পার্ক নির্মাণ, সরকারি গুরুদয়াল কলেজসংলগ্ন ওয়াচ টাওয়ারসহ লেক, শহরের ভেতর নদীর দুপাড়ে ৬ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ, ওয়াকওয়েতে বিদ্যুতায়ন, সোলার প্যানেল স্থাপন, শহরের ভেতর দিয়ে কিছু সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ ও দুপাড়ে বনায়নের ব্যবস্থা রেখে ৬৪ কোটি টাকার নরসুন্দা নদী সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প একনেকে পাস হয়।

পরে এ প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ১১০ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। তৎকালীন এলজিআরডিমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম প্রকল্পের কাজ উদ্বোধন করেন। ২০১৫ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয় ২০১৬ সালের জুন মাসে। যদিও প্রকল্পের অনেক কাজ শেষ হয়নি।

এদিকে নদীর সিএস ও নকশা অনুযায়ী দুপাড়ের অবৈধ দখল ও স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন জানতে পারে, সাধারণ মানুষ ছাড়াও অনেক প্রভাবশালীর বাড়ি ও দোকানপাট অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে নরসুন্দার দুপাড়ে। এসব স্থাপনা উচ্ছেদের তোড়জোড় শুরু হলে নড়েচড়ে বসেন দখলদাররা। তারা প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে ম্যানেজ করতে সক্ষম হন। ফলে ছাড় দেওয়া হয় অসংখ্য দখলদারকে। আর কিছু দখলদার উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে শঙ্কামুক্ত হন। অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে দখলদারদের তালিকায় আছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।

অভিযোগ রয়েছে, নদী খনন কাজের বিপরীতে বরাদ্দকৃত ১৬ কোটি টাকার অর্ধেকেরও বেশি লোপাট হয়েছে। একইভাবে লোপাট হয়েছে বনায়ন, বিনোদন পার্ক ও ব্রিজের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজের অর্থ। আরও অভিযোগ আছে, নদীর পূর্বাংশে শহরের ভেতরাংশে গাইটাল চিতার পর থেকে অজ্ঞাত কারণে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়নি। এদিকে নদীর ভেতরের জমির মালিকানা দাবি করে ২০টির মতো রিট হয়েছে উচ্চ আদালতে। গত ৬ বছরেও এগুলোর সুরাহা হয়নি। সম্প্রতি কালেক্টরেটের সিনিয়র ম্যাজিস্ট্রেট আবু তাহেরের নেতৃত্বে পুনর্দখলকৃত জমি থেকে অর্ধশত দোকানপাট গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

নরসুন্দা নদী বাঁচাও আন্দোলনের অন্যতম নেতা, পরিবেশ রক্ষা মঞ্চ পরমের আহ্বায়ক ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শরীফ আহমেদ সাদী বলেন, আমাদের মূল দাবি ছিল নদীর উৎপত্তিস্থলে সুইসগেট নির্মাণ করে নাব্য ফিরিয়ে আনা, যাতে ময়লা-আবর্জনা ধনু নদীতে গিয়ে পড়তে পারে। নদী সংস্কারের মাধ্যমে একটি পরিচ্ছন্ন শহর চেয়েছিলাম আমরা। কিন্তু যা হয়েছে তা কিশোরগঞ্জবাসী চাননি। ত্রিভুজ শক্তির দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে নরসুন্দার সৌন্দর্যবর্ধনের পরিবর্তে শ্লীলতাহানিই হয়েছে। পিডি (প্রকল্প পরিচালক) আবদুস সালাম ম-ল কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিকে দুটি গাড়ি উপহার দিয়ে স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে যেনতেন প্রকারে কাজ করে গেছেন।

নাগরিক অধিকার সুরক্ষা মঞ্চের আহ্বায়ক শেখ সেলিম কবীর বলেন, নরসুন্দা এখন আর আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ। আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছি। আন্দোলন চলবে তত দিন, যত দিন নরসুন্দা তার হারানো গৌরব ফিরে না পাবে এবং লুটেরা ও চোরদের বিচার না হবে। তিনি অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে শিগগির উচ্চ আদালত ও দুর্নীতি দমন কমিশনের শরণাপন্ন হবেন বলে জানান।

কিশোরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা মো. পারভেজ মিয়া আমাদের সময়কে জানান, নরসুন্দা প্রকল্পে কী কী আছে, আজ পর্যন্ত তিনি জানেন না।

নরসুন্দা সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প নিয়ে কিশোরগঞ্জ এলজিইডির বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী আফতাব আলী খান জানান, প্রোফাইল ঘেঁটে প্রকল্পে যা দেখলাম, তাতে মনে হলো প্রকল্প তৈরিতেই সমস্যা ছিল। উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হিসেবে আরও যতœবান হওয়ার দরকার ছিল। নদী সংস্কার করে পচা পানির একটি নোংরা লেক দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

এ ব্যাপারে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও নরসুন্দা প্রকল্পে দুর্নীতি তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান মো. রইছউদ্দিন বলেন, আমাকে মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গিয়ে যা দেখলাম, তাতে মনে হলো এখনো অনেক স্থানে নদী খনন, ওয়াকওয়ে নির্মাণ, ফুটব্রিজ নির্মাণ, বনায়ন, পার্ক-২ চালু, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদসহ অনেক কাজ বাকি। সুতরাং প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা হয় কী করে? আমি অনিয়মগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এখন তারাই বিষয়টি দেখবেন।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে