‘লাল স্বর্গ’ সাতলা

  আল মামুন, বরিশাল

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:০৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছোট নদী, হাওর ও বিলবেষ্টিত ছোট গ্রাম সাতলা। বরিশাল সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের উজিরপুর উপজেলার এ জায়গাটি ‘শাপলাবিল’ নামেই বেশি পরিচিত। গাঢ় সবুজের বুকে এ যেন এক ‘লাল স্বর্গ’। বিলের দিকে যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। এর মাঝেই চোখে পড়ে লাল শাপলার আভা।

কিছুটা সামনে এগোলেই নিজ অস্তিত্বের জানান দেয় ফুটন্ত শাপলাগুলো। গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া বাস চলাচলের রাস্তাটিও এলাকাটিকে করেছে গতিময়। আর বিলের মাঝে ফুটন্ত লাল শাপলা গ্রামটিকে করেছে পরিপাটি। গ্রামের সাদাসিধে লোকজনের অতিথিপরায়ণতাও আপনাকে মানসিকভাবে করে তুলবে প্রাণবন্ত। এ ইউনিয়নের উত্তর সাতলা গ্রাম ও পার্শ্ববর্তী আগৈলঝাড়া

উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের বাগদা ও খাজুরিয়া গ্রামের কয়েকশ হেক্টর জমি নিয়ে বিলটি। সবচেয়ে বেশি শাপলার উপস্থিতি সাতলার নয়াকান্দি ও মুড়িবাড়ীতেই। সাতলা শুধু লাল শাপলার উৎস নয়, এটি লাল শাপলার গ্রামও। প্রশ্ন থাকতে পারে এখানে কি শুধু লাল শাপলাই জন্মে? উত্তরটাÑ না। এর পাশাপাশি সাদা ও বেগুনি রঙের শাপলারও দেখা মিলবে। তবে লাল শাপলার তুলনায় অপ্রতুল। মূলত সাদা শাপলা জনপ্রিয় তরকারি হওয়ায় দিন দিন সংকীর্ণ হচ্ছে এর সংখ্যা।

বিলে ঠিক কত আগে থেকে এভাবে শাপলা জন্মাতে শুরু করেছে, তার কোনো সঠিক তথ্য নেই স্থানীয়দের কাছে। এক সময় বর্ষাকালে সাতলা সম্পূর্ণ ডুবে যেতো। স্বাধীনতার পর তৎকালীন মন্ত্রী শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত প্রথম বাঁধ দেওয়ার কাজ শুরু করেন। তার পর বিল থেকে বিশাল এলাকা জাগে। বর্তমানে মনোরম এলাকায় পরিণত হয়েছে সাতলা গ্রাম। এ বিলে প্রাকৃতিকভাবেই ফোটে শাপলা।

উজিরপুর উপজেলা উদ্ভিদ সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কর্মকর্তা আবদুর রহিম চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, ‘জাতীয় ফুল শাপলা সাধারণত আবদ্ধ অগভীর জলাশয়, খাল-বিলে জন্মে থাকে। জলজ এই উদ্ভিদটি প্রায় ৩০০ খ্রিস্টপূর্বের। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় সাধারণত পাঁচ প্রকার শাপলা ফুল দেখা যায়। সাদা, লাল, বেগুনি, হলুদ ও নীল রঙের। এর মধ্যে সাদাটাই কেবল বাংলাদেশের জাতীয় ফুল।’ তিনি আরও বলেন, ‘গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে হাওড়, বিল, ঝিল, পুকুর, ডোবায় অহরহ দেখা যেত জলে ভাসা এ ফুল। তবে এখন অযত্ন-অবহেলা আর কৃষিজমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করায় জাতীয় ফুল শাপলা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম।’

সাতলা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক আজাদ আমাদের সময়কে বলেন, ‘জাতীয় ফুল শাপলার এলাকা সাতলাকে জাতীয়ভাবে ‘পর্যটনকেন্দ্র’ ঘোষণা এখন সময়ের দাবি।’ সাতলাকে পর্যটনকেন্দ্র করতে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুমা আক্তার বলেন, ‘বিলটি এক অপরূপ এলাকা। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও বিশাল বিশাল এলাকাজুড়ে শাপলা জন্মেছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিনোদনপ্রেমীরা আসছেন প্রতিদিন।’

কীভাবে ঘুরবেন : লাল শাপলার বিলে ঘোরার জন্য অবশ্যই নৌকার প্রয়োজন হবে। এ জন্য সাতলার নয়াকান্দির মতি মিয়ার শরণাপন্ন হতে পারেন। সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ঘোরার জন্য আপনাকে নৌকার ব্যবস্থা করে দেবেন তিনি। নৌকা ও পর্যটকের সংখ্যা ভেদে এর জন্য খরচ হতে পারে ৫০০-৮০০ টাকা। আর ঘুরতে বেরোনোর সময় অবশ্যই সঙ্গে ক্যামেরা নিতে ভুলবেন না। কারণ এই মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দ্বিতীয়বার স্মরণ করতে চাইলে ক্যামেরায় তোলা ছবিই আপনাকে আন্দোলিত করবে। ঘুরতে ঘুরতে শাপলার পাতার ওপর দেখা মিলতে পারে ছোট-বড় সাপের। ভয়ের কারণ নেই, এগুলো আপনার কোনো ক্ষতি করবে না। তবে সাবধানে দূরত্ব বজায় রাখাই শ্রেয়।

কখন ঘুরবেন : সাধারণত আগস্টের শেষের দিকে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর পর্যন্ত এ বিলে লাল শাপলা ফোটে। আর আসল সৌন্দর্য উপভোগের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো ভোর ৫টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত। শাপলার প্রকৃত সৌন্দর্য ও ফুটন্ত অবস্থায় পেতে অবশ্যই এ সময়টাতে আপনাকে ঘুরতে হবে। কেননা সূর্যের উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে শাপলা তার নিজের সৌন্দর্য গুটিয়ে নেয়। তাই সম্পূর্ণ ফুটন্ত শাপলা দেখতে হলে আশপাশে রাতযাপন করে অবশ্যই খুব ভোরে বিলে যেতে হবে।

কোথায় থাকবেন : থাকার জন্য খুব ভালো ব্যবস্থা নেই সাতলায়। তবে আরামদায়ক রাতযাপনের জন্য স্থানীয় লোকজনের সাহায্যে তাদের আশ্রয়ে থাকা যেতে পারে। এতে খুব সকালে শাপলার বিলে ভ্রমণ আপনার জন্য সহজ হবে। এমনকি খাওয়া-দাওয়াও সারতে হবে ওখানে। আপনি অবশ্যই তাদের অতিথিপরায়ণতায় মুগ্ধ হবেন। এ ছাড়া পাশর্^বর্তী হারতা বাজারে রাতে থাকার জন্য স্বল্পখরচের দুটি হোটেল আছে। সেটি অবশ্য শহুরে লোকজনের জন্য খুব একটা আরামদায়ক হবে না। আবার উজিরপুর বা বরিশাল থেকেও যাওয়া যায়।

কীভাবে যাবেন : ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চযোগে পয়সারহাট বা বৈঠাকাটাগামী যুবরাজ বা তরীকা-২ লঞ্চে হারতা নেমে খুব সহজে সাতলায় আসতে পারেন। ডেকের ভাড়া ২৫০-৩০০ এবং সিঙ্গেল কেবিন ১০০০-১২০০ টাকা। এ ছাড়াও ঢাকা-বরিশাল লঞ্চে বরিশাল শহরে এসে সাতলা যেতে পারেন। নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে ৩০ মিনিট পর পর সরাসরি সাতলার উদ্দেশে বাস ছাড়ে, যেখানে জনপ্রতি ভাড়া ৯০ টাকা। এ ছাড়া বরিশাল থেকে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার কিংবা মাহিন্দ্রা ভাড়া করেও যাওয়া যায়, এতে ৫০০ টাকা থেকে চার হাজার টাকার মতো বাহনভেদে যাওয়া-আসায় খরচ পড়বে।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে