নিজ দেশে পরবাসী ছকিনা বেওয়া

  শিমুল দেব, উলিপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা

২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:৪৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঘর নেই, বাড়ি নেই, নেই কোনো স্থায়ী ঠিকানা। জন্ম তার এ দেশেই, তবুও ভোটার নন। জন্ম নিবন্ধন নেই, জাতীয় পরিচয়পত্রও নেই ৭৫ বছরের ছকিনা বেওয়ার। ‘নাগরিকত্ব’হীন এই বৃদ্ধা সরকারের দেওয়া সব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। পড়ন্ত বয়সে ভিক্ষা করেই তার জীবন চলে। আপনজন বলতেও কেউ নেই। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের পাতিলাপুর গ্রামে অন্যের বাড়িতে তার রাত কাটে।

জানা গেছে, স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় স্বাধীনতার প্রায় ৪৭ বছরেও জাতীয় পরিচয়পত্র পাননি ছকিনা বেওয়া। ফলে তার ভাগ্যে জোটে না সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা। আজন্ম ভিক্ষা করে নিজ দেশে পরবাসীর মতো জীবন কাটে তার। এলাকার মানুষ তাইজলের মা হিসেবেই তাকে চেনেন। বয়সের

ভারে চোখের দৃষ্টি অস্পষ্ট; কানেও শোনেন কম। তবু পেটের দায়ে অন্যের বাড়ি বাড়ি ঘুরে খাবার জোগাড় করতে হয়। তাই যেখানে রাত সেখানেই পরবাস করেন। মৃত্যুর পর কবরের ঠিকানাও অনিশ্চিত। ছকিনার আক্ষেপÑ ‘মোর ভোট নেয় না, মোক ইলিপ (রিলিফ) দেয় না, মোর কী হইবে? মুই কতজনক ভিক্ষা দিছোং, এখন মুই ভিক্ষা করং বাহে। মোর দিকি কেউ চোখ তুলি দ্যাখে না বাপ।’

ছকিনা বেওয়া কিছুদিন ধরে পাতিলাপুর গ্রামের হতদরিদ্র ছাইফুলের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তার বাবার বাড়ি গোড়াই পিয়ার গ্রামে। বাবা দুখু মিয়া তার বিয়ে দেন দলদলিয়া ঘাটিয়ালপাড়া গ্রামের কৃষক দবির উদ্দিনের সঙ্গে। সংসারে আসে মানসিক ভারসাম্যহীন পুত্রসন্তান তাইজুল। সে-ও মারা যায় একসময়। একে একে সব হারান এই বৃদ্ধা। পেটের দায়ে ভিক্ষায় নামেন। দিনভর বাড়ি বাড়ি ঘুরে যেখানে রাত হয় সেখানেই আশ্রয় নেন। এভাবেই কাটে স্বজনহারা ছকিনার পরবাস জীবন। এখন আর শরীর চলে না, হাঁটতেও পারেন না। এর ওর কাছ থেকে চেয়েচুয়ে পেট চালান। কারো দয়া হলে খাবার দিয়ে যান। কিন্তু থেতরাই ইউপি অফিসে গিয়ে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের হাত-পা ধরেও রিলিফ পাননি। কেননা তিনি ভোটার ও নাগরিক নন।

পাতিলপুর গ্রামের আব্দুল জলিল ব্যাপারী (৭০), মুকুল মাস্টার (৭২), শাহ আলম মাস্টার (৬৫), নুরুন্নবী বাবু (৫০) জানান, তারা ছোটবেলা থেকেই ছকিনা বেওয়াকে ভিক্ষা করতে দেখছেন। রাতও কাটান এর-ওর বাড়িতে। তিনি খুব অসহায়। তবে এই বৃদ্ধার যে কোনো পরিচয়পত্র নেই, তা তারা জানেন না।

এ বিষয়ে থেতরাই ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মো. আব্দুল ওহাব খোকা আমাদের সময়কে বলেন, ‘ছকিনা বেওয়ার জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। আর এটি করতে লাগে জন্ম নিবন্ধন। সে ব্যবস্থার চেষ্টা করছি।’ ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী বলেন, ‘ছকিনা বেওয়ার ব্যাপারে আমি আগে জানতাম না। এই বৃদ্ধা আমার ইউনিয়নের বাসিন্দা কিনা, সে বিষয়ও অবগত ছিলাম না।’ এখন সব কিছু জানার পর এ বিষয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, তিনি (ছকিনা বেওয়া) যদি ওই এলাকার বাসিন্দা হন, তা হলে তাকে নাগরিকত্ব দিয়ে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হবে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে