sara

পুলিশের অভিযানে পুরুষশূন্য গ্রাম, তালা ঝুলছে মসজিদে

উল্লাপাড়ায় জামায়াত নেতাকে ছিনিয়ে নেওয়ার জের

  আমিনুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জ

১২ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৮, ০৯:১০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতীকী ছবি
পুলিশের হাত থেকে হাতকড়াসহ উল্লাপাড়া উপজেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আল আজাদকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনার মামলায় পুলিশের আসামি গ্রেপ্তারের নামে ঢালাও মারধর ও ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুরের কারণে উপজেলার কয়ড়া চরপাড়া গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। গ্রামের কোনো বাড়িতেই নারী ও শিশু ছাড়া পুরুষ নেই।

পুরুষশূন্য হওয়ার কারণে এলাকার জামে মসজিদে ১১ দিন ধরে আজান দেওয়া ও জামাতে নামাজ আদায় বন্ধ আছে। ইমাম আত্মগোপনে থাকায় গত শুক্রবার গ্রামের জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়নি জুমার জামাত। আত্মগোপনে থাকা দলনিরপেক্ষ গ্রামবাসী সেলফোনে প্রকৃত দোষীদের গ্রেপ্তার করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং গ্রামের সাধারণ মানুষের ভীতি দূর করতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের আকুতি জানিয়েছেন। ঘটনাটি নাড়া দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের। তারা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তবে পুলিশ বলছে, ঢালাও গ্রেপ্তার নয়, পুলিশ রুটিন ওয়ার্কই করছে। আর কোনো বাড়িঘরে পুলিশ হামলা কিংবা ভাঙচুর করেনি। ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে কোনো কুচক্রী মহল এমনটি ঘটিয়ে পুলিশের ওপর দায় চাপাতে পারে। অবশ্য গত সোমবার (৮ অক্টোবর) কয়ড়া চরপাড়া গ্রামে গিয়ে কয়েকটি বাড়িতে ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর অবস্থায় দেখা যায়। বাড়িঘরে নারী ও শিশু ছাড়া কোনো পুরুষকে পাওয়া যায়নি।

গত ১ অক্টোবর জামায়াত নেতাকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামি করা হয় স্থানীয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের। মামলার পর থেকে উল্লাপাড়া থানা পুলিশ কয়ড়া চরপাড়া গ্রামে অভিযান শুরু করে। পার্শ্ববর্তী ভদ্রকোল গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা মো. আবদুস সালামের ছেলে মো. রকিবুল ইসলাম রকিব অভিযোগ করেন, শুরু থেকেই পুলিশ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা ও সাধারণ মানুষকে ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার শুরু করে।

এ ছাড়া অন্তত ১০টি বাড়িঘরের আসবাবপত্র, মোটরসাইকেল, টিভি, ফ্রিজ ও রান্নার চুলা ভাঙচুর করে। পুলিশের নির্যাতন থেকে কোলের শিশুরাও রক্ষা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন রাকিব।

আত্মগোপনে থাকা কয়েকজন গ্রামবাসীর সঙ্গে সেলফোনে আলাপকালে তারা জানান, গত ১ অক্টোবর আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুল ইসলাম খোকার বাবা জয়নাল আবেদীন তালুকদারের কুলখানিতে আমন্ত্রিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য তানভীর ইমামসহ উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং স্থানীয় জনসাধারণ। ওই আমন্ত্রণে অন্যদের সঙ্গে আকস্মিকভাবে উপস্থিত হন একাধিক মামলার আসামি জামায়াত নেতা আলাউদ্দিন আল আজাদ।

টের পেয়ে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে হাতকড়া পরায়। এমন পরিস্থিতিতে উপস্থিত আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীরা তাকে পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পালাতে সাহায্য করেন, যা কারোরই কাম্য ছিল না।

জামায়াতের উল্লাপাড়া উপজেলা আমির অধ্যাপক মাওলানা শাহজাহান আলী সেলফোনে জানান, আলাউদ্দিন আল আজাদ ও সাইফুল ইসলাম খোকা মামাতো-ফুফাতো ভাই। খোকার বাবার মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠান থেকে আলাউদ্দিনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি তার আত্মীয় এবং স্থানীয়রা মেনে নিতে পারেননি বিধায় এমন ঘটনা ঘটে। তা ছাড়া আলাউদ্দিন একাধিক মামলার আসামি হলেও জামিনে আছেন। পুলিশের হটকারী সিদ্ধান্তের কারণেই কয়ড়া চরপাড়া গ্রামে কিছু নারী ও শিশু ছাড়া কোনো পুরুষ নেই। ১১ দিন ধরে ইমাম এলাকাছাড়া হওয়ায় মসজিদে আজান ও নামাজ বন্ধ।

মাওলানা শাহজাহান আরও জানান, পরবর্তীকালে হাতকড়াটি থানার ওসির (তদন্ত) কাছে জমা দেওয়া হলেও পুলিশ অভিযান বন্ধ করেনি। বর্তমানে সবাই আত্মগোপনে। এই সুযোগে পুলিশ তাণ্ডব চালাচ্ছে গ্রামে।

কয়ড়া ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হেলাল উদ্দিন জানান, ঘটনা যেটাই হোক, পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়া ঠিক হয়নি। সাইফুল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ তথা সরকারি দলের একজন নেতা হয়ে আত্মীয়ের জন্য এমন কাজ করে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। যে কারণে পুরো গ্রামের মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।

গ্রামের মসজিদে আজান ও নামাজ বন্ধ থাকার বিষয়ে চেয়ারম্যান হেলাল বলেন, মানুষ না থাকলে আজান ও নামাজ কীভাবে হবে। যারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়, আমাদের তাদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছি। যারা দূরে আত্মগোপনে আছেন, তাদের গ্রামে ফেরানোর জন্য পরিবারগুলোকে অনুরোধ করছি। এলাকায় যারা বয়োবৃদ্ধ আছেন, তাদেরকে মসজিদে আজান দেওয়া এবং নামাজ আদায়ের অনুরোধ করছি।

চেয়ারম্যান জানান, পরিস্থিতির কারণে গত শুক্রবারও (৫ অক্টোবর) মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করা সম্ভব হয়নি। আশা করছি, আগামী দু-একদিনের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে। উল্লাপাড়া উপজেলা বিএনপি নেতা ও সাবেক পৌর মেয়র বেল্লাল হোসেন জানান, ওই এলাকায় বিএনপির তেমন নেতাকর্মী নেই। তার পরও বিএনপির ওপর দোষ চাপিয়ে মামলা দেওয়া হয়েছে।

উল্লাপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা স্থানীয় সাংসদ তানভীর ইমামের বরাত দিয়ে বলেন, ওই এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আমরা কাজ শুরু করেছি। তবে একটু সময় লাগছে। গত শুক্রবার মসজিদে জুমার নামাজ আদায় না হওয়ার কথা তিনিও জানান।

উল্লাপাড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান কৌশিক আহমেদ জানান, পুলিশ কোনো হামলা বা ভাঙচুর করেনি; এলাকায় আসামি ধরতে রুটিন ওয়ার্ক করছে মাত্র। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি এলাকায় একটি প্রতিপক্ষ থাকে, ওই এলাকাও তার ব্যতিক্রম নয় বিধায় এমন ঘটনাকে কেন্দ্র করে অন্য কোনো প্রতিপক্ষ লুটতরাজ করছে এবং সেটার দায়ভার পুলিশের ওপর চাপাচ্ছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে