বাবাই যখন ঘাতক

  বরিশাল প্রতিনিধি

০৮ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:৩৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাথার ওপর ছায়া হয়ে যে বাবার কন্যাশিশুকে নিরাপদে বেড়ে উঠতে দেওয়ার কথা, সেই বাবাই কিনা প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে হত্যা করল নিজের শিশুকন্যা তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী সাবিহা আক্তার অথৈকে (৯)। এমন পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটেছে বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ইউনিয়নের সাপানিয়া গ্রামে।

নিহত অথৈর বাবা বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) পানি শাখার পাম্প অপারেটর কাজী গোলাম মোস্তফা। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজ মেয়েকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। মহানগরীর কাউনিয়া থানার একটি দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। কাউনিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আনোয়ার হোসেন জানান, শিশুকন্যা অথৈ হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনে মোস্তফাকে জিজ্ঞাসাবাদসহএখনো তদন্ত চলছে। এর আগে নিহতের মা শিউলী আক্তার রুমা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে থানায় হত্যা মামলা করেন।

 কাউনিয়া থানা সূত্র জানায়, শুরু থেকেই পুলিশ কাজী গোলাম মোস্তফাকে সন্দেহ করছিল। যে কারণে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসা হয়। এর পর ধীরে ধীরে হত্যার রহস্য বেরিয়ে আসতে শুরু করে। প্রথম দিকে গোলাম মোস্তফা পুরো বিষয়টি এড়িয়ে যান। পরে নিজ মেয়েকে হত্যার দায় স্বীকার করেন।

কাজী গোলাম মোস্তফার বরাতে পুলিশ সূত্র জানায়, চরবাড়িয়ার সাপানিয়া এলাকার রানা শরীফ নামে এক ব্যক্তির কাছে ৭ লাখ টাকায় তিনি কিছু জমি বিক্রি করেন। এ জন্য তার কাছ থেকে এক লাখ টাকা অগ্রিম নেন। চুক্তি অনুযায়ী মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) তাকে দলিল করে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দিতে পারেননি। এদিকে অগ্রিম নেওয়া টাকাও খরচ করে ফেলেন। দলিল ও টাকা দিতে না পারার চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ জন্য তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে থেকেই সাপানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান ফোন করেন মোস্তাফার কাছে। তিনি উপবৃত্তির জন্য অথৈর ছবি পাঠাতে বলেন। এর পরই দেনা পরিশোধ না করার বিকল্প চিন্তা মাথায় আসে মোস্তফার। নিজের মেয়েকে হত্যা করে পাওনাদার রানা শরীফকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা করেন।

মঙ্গলবার সকালে মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে ঘর থেকে বের হন মোস্তফা। কিন্তু তাকে স্কুলে না নিয়ে নগরীর সদর রোডের সাউথইস্ট ব্যাংকের পাশে বিসিসির পানির পাম্প হাউসের পাশে থাকা রুমে নিয়ে যান। সেখানেই নিজ হাতে মেয়েকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে সিএনজি ভাড়া করে অথৈর লাশ একটি বোরকা পরিয়ে নিজ এলাকায় এনে লেবু বাগানের মধ্যে ফেলে যান। সেই সিএনজি নিয়েই গোলাম মোস্তফা আবার বাড়ি যায়, যা প্রত্যক্ষ করেন স্থানীয় কয়েক ব্যক্তি। পরে ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে গোলাম মোস্তফা তার স্ত্রীকে ফোন করে মেয়েকে খোঁজাখুঁজি করতে বলেন।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে সাপানিয়া এলাকার ছাদওয়ালা বাড়িসংলগ্ন লেবু বাগান থেকে অথৈর লাশ উদ্ধার করেন তার মা শিউলী আক্তার রুমা। পরে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় বরিশাল মেডিক্যালে।

ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, বেলা সাড়ে ১১টায় শিশুটিকে শেরেবাংলা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন স্বজনরা। কিন্তু তার অনেক আগেই শিশুটির মৃত্যু হয়। তার গলায় লাল দাগ রয়েছে। তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া তাকে শারীরিক নির্যাতন কিংবা যৌন নিপীড়ন করা হয়েছে কিনা বিষয়টি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না এলে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।

পুলিশ সূত্র আরও জানায়, পুলিশের কাছে মোস্তফার লিখিত দেওয়া অনেক তথ্যে গরমিল ছিল। এ জন্য পুলিশ প্রত্যক্ষদর্শীদের মোস্তফার মুখোমুখিও করে। মিথ্যা তথ্য ও অসংলগ্ন কথায় নিজ মেয়ে অথৈ হত্যাকারী হিসেবে বাবা মোস্তফাকে সন্দেহ করা হয়। শেষ পর্যন্ত মোস্তফা পুলিশের কাছে অন্যকে ফাঁসাতে মেয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেন।

এ ঘটনায় বর্তমানে কাজী গোলাম মোস্তফা ও রাবু নামে এক নারী পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে