ট্রাম্প আরও বেপরোয়া

বিশ্লেষণ

  যুবা রহমান

১০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:২০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি। তবে দলটি উচ্চকক্ষের দখল ধরে রেখেছে। ৬ ডিসেম্বর যখন নির্বাচনের ফলে স্পষ্ট হয়েছিল যে, প্রতিনিধি পরিষদ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন ‘ট্রিভেন্ডাস রেজাল্ট’।

আর পরদিন এক টুইটে তিনি দাবি করেছেন তাদের ‘বড় জয়’ হয়েছে। আর একই দিন অর্থাৎ ফল ঘোষণার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে ডোমোক্র্যাট দলকে সোজা হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘তদন্তের মাধ্যমে আমাদের গোপন তথ্য ফাঁস করলে আমরা তোমাদের আরও বড় তথ্য ফাঁস করে দেব।’ আর মধ্যবর্তী নির্বাচনের দুই দিন পর আমরা দেখলাম, ট্রাম্প প্রশাসন নতুন এক আইন জারি করেছে, যার ফলে কোনো অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করলেও এখন আর আশ্রয় পাবে না।

মেক্সিকো থেকে হাজার হাজার অভিবাসী দল যুক্তরাষ্ট্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের ঠেকাতেই ট্রাম্পের এই ব্যবস্থা। অভিবাসীসংক্রান্ত নতুন আইনে স্বাক্ষর করার আগের দিন ট্রাম্প তার অ্যাটর্নি জেনারেলকে বরাখাস্ত করেছেন। বরখাস্ত হওয়া অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশনস তার পদত্যগপত্রের বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি।

তিনি বলেছেন, ‘প্রিয় প্রেসিডেন্ট মহোদয়, আপনার অনুরোধে আমি আমার পদত্যাগপত্র জমা দিচ্ছি।’ অর্থাৎ ট্রাম্পের যে স্বভাবের সঙ্গে বিশ^ দুই বছর পরিচিতি ঘটেছে তার পরিবর্তনের কোনো আলামত লক্ষ করা যায়নি; বরং ধারণা করা হচ্ছে, নিম্নকক্ষে ডেমোক্র্যাটদের বাধা টপকাতে তিনি আরও বেপরোয়া হবেন।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিম্নকক্ষ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো-প্রেসিডেন্টের কাজে বিরোধী দলের বাধা দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করা। প্রেসিডেন্টের কাজের তদন্ত করবে প্রতিনিধি পরিষদ। ফলে প্রেসিডেন্ট চাইলেই আর নির্বিঘ্নভাবে নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে রয়েছে ‘নির্বাহী ক্ষমতা’, যার মাধ্যমে তিনি নিম্নকক্ষের বাধা অতিক্রম করতে পারেন।

আর ডোনাল্ড ট্রাম্প যে তা হামেশাই প্রয়োগ করবেন, তা সহজেই অনুমেয়। কেননা গত দুই বছর তিনি বিশ্বকে সেটাই দেখিয়েছেন। আর উচ্চকক্ষ অর্থাৎ সিনেটে তো তার সমর্থন রয়েছেই। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বেশকিছু বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঐক্যে যে ফাটল দেখা দিয়েছে, সেটাও এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হলো। অভিবাসী ইস্যুতে ট্রাম্প কঠোর হলেও ডেমোক্র্যাটরা সব সময় নমনীয় থেকেছে।

পাশাপাশি ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে যে মার্কিনিদের ভরসা নেই, সেটাও এই ফলে আঁচ পাওয়া গেল। বিবিসির এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে যে, শহর এলাকায় রিপাবলিকানদের ভোট বেড়েছে কিন্তু তুলনামুলক দরিদ্র এলাকাগুলোয় তাদের সমর্থন কমেছে। তার মানে যুক্তরাষ্ট্রে যে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান প্রকট হচ্ছে।

ট্রাম্প দুই বছর আগে ক্ষমতায় এসে বিশ^কে ‘চমক’ দেখিয়েছিলেন। এর পর থেকে তার বিরুদ্ধে একের পর এক যে ধরনের অভিযোগ উঠেছে, তা মার্কিন ইতিহাসে বিরল। পর্নো তারকার সঙ্গে সম্পর্ক থেকে শুরু করে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন তিনি। যে কোনো বিতর্ক তিনি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে মোকাবিলা করেছেন। সংবাদমাধ্যমগুলো বলে আসছিল, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা হেরে গেলে বিপাকে পড়বেন ট্রাম্প। কিন্তু এই হারকে তিনি পাত্তা দেননি। সেটা তো নির্বাচনের দিনই বলে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি পাত্তা না দিলে কী হবে! দুই বছর পর তো আবার তাকে জনগণের ভোটের কাছেই যেতে হবে।

অর্থাৎ ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য এটি যে ‘সেমিফাইনাল’, সেটা মনে হয় তিনি ভুলে থাকতে পারবেন না। আর গত দুই বছরে যে তার সমর্থন কমেছে সেটা অস্বীকার করার জো নেই। কারণ অনেক এলাকায় দেখা গেছে, ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তারা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন; কিন্তু মধ্যবর্তী নির্বাচনে তারা ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। এ ছাড়া কিছু এলাকায় যারা দীর্ঘদিন থেকে রিপাবলিকানদের ভোট দিয়ে আসছেন, যেমন ভার্জিনিয়ার কয়েকটি স্থানে, ওয়াশিংটনের বাইরে দশম ও সপ্তম জেলা; এই নির্বাচনে তারা ডেমোক্র্যাট দলের পক্ষের অবস্থান নিয়েছেন।

সব কিছুর পর এটাই ঠিক যে, দুই বছর পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প যত সহজে নিজের মতামত প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন, এখন সেটি আর থাকছে না। তবে মার্কিন ইতিহাস বলে অন্য কথা। গত ১০০ বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোর ফলের দিকে তাকালে বিষয়টি অনুমান করা যায়। ১৯১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ২৮ বার মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এর মধ্যে শুধু তিনবার যে দল ওই সময় ক্ষমতায় ছিল নিম্নকক্ষে তাদের আসন বেড়েছে। বাকি সব সময় ক্ষমতাসীন দলের আসন কমতে দেখা গেছে। আর ১৭ বারই কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ ক্ষমতাসীন দলের হাতছাড়া হয়েছে। কাজেই ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এটি নতুন অভিজ্ঞতা নয়। তাই মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারের কারণে ‘ট্রাম্প বিপাকে’ পড়বেন তা ‘থিউরিটিক্যাল’ হলেও বাস্তবতা তা বলছে না।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে