sara

খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা

  হারুন-অর-রশিদ

০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:৫৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৯ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। এ সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার ৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে বিতরণ করা ঋণের চেয়ে খেলাপি ঋণ বেশি বেড়েছে। আর নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) খেলাপি ঋণ ২৫ হাজার কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা।

যেখানে গত ২০১৭ সালে পুরো বছর খেলাপি ঋণ বাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। এদিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য গত মাসে প্রভাব খাটিয়ে ছাড় গ্রহণের রেকর্ড করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। কতজন গ্রাহক কী পরিমাণ খেলাপি ঋণ নবায়ন করে নিয়েছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান এখনো জানা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, চলতি বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ বা ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। গত জুনে ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৫২১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের শুরুতে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসেই তা ২৫ হাজার ৬৭ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লাগামহীনভাবে বেড়ে চলছে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং তফসিলি ব্যাংকগুলো নানাবিধ পদক্ষেপের কথা বললেও কার্যত কমছে না খেলাপি ঋণ। পাহাড় সমান খেলাপি ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছে ব্যাংকগুলো। খেলাপি ঋণের এ পরিমাণ স্বাধীনতার পর এ যাবতকালে সর্বোচ্চ। অবলোপনসহ ঋণের পরিমাণ যোগ করলে প্রকৃত খেলাপি দাঁড়াবে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকে দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাবে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। সুদহার কমানোর জন্য বরাবরই আমানতের সুদহার কমানো হচ্ছে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হারের সঙ্গে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হারের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তহবিলের ব্যয় মেটাতে আমানতকারীর সুদ কম দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে বেশি সুদ আদায় করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকগুলো আদায় বাড়ালেই খেলাপি ঋণ কমে যাবে। আদায় বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন নীতি পরামর্শ ও কৌশল নির্ধারণ করে দিচ্ছে। কিন্তু আদায়ের কাজটি করতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে। ব্যাংক যদি নিজের ভালোর জন্য আদায় না বাড়ায় তা হলে খেলাপি ঋণ বাড়বে এটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, মোট খেলাপি ঋণের অর্ধেকই রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ বাণিজ্যিক ব্যাংকের। সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বিডিবিএল ও বেসিক ব্যাংকের বিতরণ করা ১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকার মধ্যে ৪৮ হাজার ৮০ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে, যা মোট ঋণের ৩১ শতাংশের বেশি। গত জুনে এ খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ৪২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে এ ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫ হাজার ২২৮ কোটি টাকা।

বিশেষায়িত দুই ব্যাংকের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ২৪১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এই সময় তাদের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা।

সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোরও। জুন শেষে ৪০টি বেসরকারি ব্যাংকের মোট ঋণের স্থিতি ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৪৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। গত জুনে এ খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ৩৮ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে তাদের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। গত ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ২৯ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা।

এ ছাড়া বিদেশি মালিকানাধীন ৯ ব্যাংকের বিতরণ করা ৩৩ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়েছে ২ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। গত জুনে এ খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ২৭১ কোটি টাকা এবং গত ডিসেম্বর শেষে ছিল ২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা।

ব্যাংকের এমডিদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক সভাপতি ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনিস এ খান বলেন, আগে যেসব গ্রাহকদের পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন সুবিধা দিয়ে ঋণ নিয়মিত করা হয় তা আবার খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। চেষ্টা করেও তা আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে ব্যাংকগুলো খেলাপি দেখাতে বাধ্য হচ্ছে। খেলাপি ঋণের বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে আরও সতর্ক এবং মনিটরিং বাড়াতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঋণখেলাপিদের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। এ জন্য এ বছর ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের প্রত্যাশা করেছিলেন ব্যাংকাররা। কিন্তু নির্বাচনের আগ মুহূর্তে সরকারি দলীয় প্রভাবশালীরা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই খেলাপি ঋণ নবায়ন করে নেন। নিয়মানুসারে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করা হলে ব্যাংকগুলোর আদায় বেড়ে খেলাপি ঋণ কমে যেত। কিন্তু চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে পুনঃতফসিল করায় খেলাপি ঋণ কমলেও আদায় বাড়েনি। গতকাল সরকারি এক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জানান, ঋণ আদায়ের জন্য তৎপর ছিলাম। কিন্তু বিভিন্ন কারণে আদায় হয়েছে অতি সামান্য। বিশেষ ছাড়ে পুনঃতফসিল করে নিয়েছেন গ্রাহকরা। আবার অনেকে আদালতে মাধ্যমে রিট করে পার পেয়ে গেছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, সাময়িক হিসেবে খেলাপি ঋণ নবায়নের জন্য ২২০টি আবেদন আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। নিয়মানুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যাংকই ডাউনপেমেন্ট নিয়ে খেলাপি ঋণ নবায়ন করতে পারে। কিন্তু গ্রাহক ডাউনপেমেন্ট কম দিতে বা না দিতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন পড়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ছাড়ের আবেদনে অনুমোদন দিয়েছে দেদার।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে