ফোনে সহিংসতার নির্দেশ দেন শ্রমিক নেতারা

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:২৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

গাজীপুরের টঙ্গীতে ৯টি গার্মেন্টসে ভাঙচুরে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে র‌্যাব পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। র‌্যাবের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে সহিংসতার নির্দেশ দিয়েছেন কয়েক শ্রমিক নেতা। গত শুক্রবার ভোর ৪টার দিকে টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ওই পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের খবর গতকাল শনিবার গণমাধ্যমকে জানায় র‌্যাব।

এদিকে গতকাল ষষ্ঠ দিনের মতো রাজধানী ছাড়াও ঢাকার আশুলিয়ার বিভিন্ন স্থানে সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এতে সড়কগুলোয় যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টাধাওয়া ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। আশুলিয়ায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওই এলাকার ২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।

এদিকে গতকাল এক অনুষ্ঠানে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের নামে যদি কেউ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে, নাশকতার চেষ্টা করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুপুরে রাজধানীর মিরপুরে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনের পেছনে কেউ উসকানি দিয়ে নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে কিনা, সেটি খতিয়ে দেখতে গোয়েন্দা সংস্থাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের রাস্তা ছেড়ে কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।

পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে র‌্যাব ১-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম আমাদের সময়কে বলেন, গ্রেপ্তাররা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, একটি গোষ্ঠীর উসকানিতে তারা ভাঙচুর চালিয়েছে। শ্রমিক নামধারী কিছু সন্ত্রাসী সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করে একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। নেপথ্যে থাকা অরাজকতা সৃষ্টিকারীদেরও গ্রেপ্তার করা হবে। এ ঘটনার আদ্যেপান্ত জানতে গ্রেপ্ততার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। নির্দেশদাতাদের রাজনৈতিক পরিচয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গ্রেপ্তাররা হলেন শামীম, রোমান, আলমগীর হোসেন, আবু সাঈদ ও সোহেল সরকার। তারা সবাই বিভিন্ন গার্মেন্টসে কর্মরত। র‌্যাব জানায়, টঙ্গীর প্যাট্রিয়ট, জিন্স অ্যান্ড পোলো, গ্লোড স্টার, রেডিসন-১, নর্দান, সুমিসহ ৯টি গার্মেন্টসে ব্যাপক ভাঙচুর ও সহিংসতা চালায় গ্রেপ্তাররা।

নতুন বেতন কাঠামোতে বৈষম্য দূর করাসহ বিভিন্ন দাবিতে গত ৬ জানুয়ারি থেকে আন্দোলন করে আসছেন পোশাক শ্রমিকরা। বিক্ষোভ নিরসনে গত মঙ্গলবার শ্রম ভবনে পোশাক শ্রমিক-মালিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, গত ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া পোশাক শ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামোতে কোনো বৈষম্য বা অসঙ্গতি থেকে থাকলে চলতি জানুয়ারি মাসের মধ্যেই তা সংশোধন করা হবে। ফেব্রুয়ারিতে সংশোধিত গ্রেডিংয়েই বেতন পাবেন শ্রমিকরা। বৈঠকে এ সমস্যা সমাধানে মালিকপক্ষের পাঁচজন, শ্রমিক পক্ষে পাঁচজন এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দুই সচিবকে নিয়ে কমিটি করা হয়। এ কমিটি চলতি মাসের মধ্যে বেতন কাঠামোর কোনো গ্রেডের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে তা বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন জমা দেবে।

আশুলিয়ায় আহত ৩০, ছুটি ২০ কারখানায়

মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আশুলিয়ায় গতকাল টানা ষষ্ঠ দিনের মতো বিক্ষোভ করেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। পুলিশ বাধা দিলে ধাওয়া পাল্টাধাওয়ায় আহত হন অন্তত ৩০ শ্রমিক। সকালে আশুলিয়ার জামগড়ার ছয়তলা ও কাঠগড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে আশপাশের ২০টি পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন পোশাক কারখানার সামনে টহল দেয় বডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মাঠে নামেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকালে আশুলিয়ার জামগড়া ছয়তলা এলাকার শ্রমিকরা দফায় দফায় আবদুল্লাহপুর-বাইপাস সড়ক অবরোধ করে ভাঙচুরের চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় ধাওয়া পাল্টাধাওয়ায় কমপক্ষে ২০ শ্রমিক আহত হন। এ ছাড়া আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকায় রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কয়েক হাজার শ্রমিক। এ সময় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে আহত হন অন্তত ১০ শ্রমিক। সাভারের উলাইলে এইচ আর টেক্সটাইলের শ্রমিকরাও সকালে বিক্ষোভ করেন।

সকাল ৯টা থেকে আশুলিয়ার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা দফায় দফায় সড়ক অবরোধ করেন। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ১০টি যানবাহন ভাঙচুর করেন। পরে পুলিশ ও বিজিবির হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ছাড়া নরসিংহপুরে হা-মীম গ্রুপের শ্রমিকরা দুপুরে খাওয়ার বিরতির সময় কারখানা থেকে বেরিয়ে বাইপাইল-আবদুল্লাপুর সড়ক অবরোধ করেন। পুলিশ এসে শ্রমিকদের বুঝিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। ১৫ মিনিটের ওই অবরোধে সড়কের দুপাশে কিছুটা যানজটের সৃষ্টি হয়।

শিল্প পুলিশের পরিচালক সানা শামিনুর রহমান বলেন, শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করলে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি পোশাক কারখানাগুলোর সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

মিরপুরে বিক্ষোভ, গাড়ি ভাঙচুর

মিরপুরের বিভিন্ন স্থানে গতকালও সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন গার্মেন্ট শ্রমিকরা। প্রায় ঘণ্টাখানেক সড়ক অবরোধের পাশাপাশি বেশ কিছু গাড়িতেও ভাঙচুর চালান তারা। পরে পুলিশ বুঝিয়ে তাদের সরিয়ে দেয়।

সকাল ১০টার দিকে মিরপুর-১ ও ১৪, শেওড়াপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে পোশাক শ্রমিকরা কারখানা থেকে বেরিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। প্রায় একই সময়ে মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের সামনে ও টোলারবাগেও বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। এতে এসব সড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

আন্দোলরত বেশ কয়েক শ্রমিক জানান, তাদের দাবি মেনে নেওয়ার কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। এ কারণেই তারা রাস্তায় নেমেছেন। মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দাদন ফকির জানান, শ্রমিকদের বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে