‘খাট’ আসত ২১ ধাপে

  শাহজাহান আকন্দ শুভ ও গোলাম সাত্তার রনি

১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:০৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

মরণনেশা ইয়াবার মতো ভয়াবহ মাদক ‘খাট’ বা ‘খাত’ মাদক বাংলাদেশে আসে নাজিমউদ্দিন নাজিম ওরফে লাভলুর হাত ধরে। ইথিওপিয়া ও কেনিয়া থেকে গ্রিন টির নামে ডাক বিভাগের ইএমএস সার্ভিসের মাধ্যমে তিনি ভুয়া ঠিকানায় ২১ ধাপ পেরিয়ে আনতেন নিউ সাইকোট্রফিক সাবস্টেন্সেস (এনপিএস) নামে পরিচিত এ মাদক।

রাজধানীর কাকরাইল ১২৪/৭/এ শান্তিনগর প্লাজার দোতলায় ‘নওশিন এন্টারপ্রাইজ’ প্রতিষ্ঠানের নামে গ্রিন টির আড়ালে চালাতেন তিনি ‘খাট’-এর জমজমাট ব্যবসা। নাজিমের এ চক্রে রয়েছে দেশি-বিদেশি বড় একটি সিন্ডিকেট। জড়িত রয়েছে বাংলাদেশের স্বনামধন্য পাঁচ ওষুধ প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানও। আর এসব করে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক নাজিম। খাট মাদক নিয়ে বিষদ তদন্তের পর সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন দাখিল করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

অধিদপ্তরটির অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) নজরুল ইসলাম শিকদার আমাদের সময়কে বলেন, ‘ব্যবসায়ী নাজিমউদ্দিন নাজিমের হাত ধরেই যে খাট মাদক বাংলাদেশে এসেছে তা নিশ্চিত হওয়া গেছে। ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবার জিয়াদ মোহাম্মাদ ইউসুফের নামে এর চালান এ দেশে সর্বপ্রথম আনেন নাজিম। তার সঙ্গে বড় একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত। ইতোমধ্যে তার মাধ্যমে ভুয়া ঠিকানায় আনা বেশ কয়েকটি খাটের চালান জব্দ করা হয়েছে। সেই সূত্র ধরে কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে এসেছে সাপ!

খাটের গডফাদার নাজিম ও তার সিন্ডিকেটের বিষয়ে সবিস্তারে আমরা প্রতিবেদন দাখিল করেছি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এর সিন্ডিকেট সমূলে ধ্বংসের লক্ষ্যে নাজিম চক্রের কয়েকজন এবং তার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নজরদারিতেও রাখা হয়েছে।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি খাট মাদকের সন্ধান, দফায় দফায় চালান আটক, এর অপব্যবহারের ধরন ও পদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয়টি নতুন করে ভাবিয়ে তোলে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের। গত বছরের ৩১ আগস্ট বাংলাদেশের গডফাদার নাজিমকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। তবে এখনো তার চক্রের অন্য সদস্যরা তৎপর। সচল রেখেছে খাট-বাণিজ্যের সাম্রাজ্য। ফলে নতুন ধরনের এ মাদক দেশের ভেতর ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

নাজিমকে জিজ্ঞাসাবাদ ও অন্যান্য সূত্র থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জেনেছেন, চাচার দোকান দেখভাল করতে ২৫ বছর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে পাড়ি জমান নাজিম। দ্রুত ধনী হতে দোকান দেখাশোনার পাশাপাশি শুরু করেন মদ বিক্রি। শহরে মদের বার থেকে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন মাদক ব্যবসায়। শুরু করেন নতুন ধরনের মাদক ‘খাট’ পাচার। এনপিএস মাদক ‘খাট’ আফ্রিকা থেকে গ্রিন টি নামে বাংলাদেশ আনতেন নাজিম। মাদকটি তিনি ২১টি ধাপে ঢাকার প্রায় ১৯টি ভুয়া ঠিকানায় আনেন। বাংলাদেশে এনে অরগানিক গ্রিন টির প্যাকেটে করে বিক্রি করতেন। দেশে এক কেজি এনপিএসের দাম ১৫ হাজার টাকা। আবার আমদানি করা এনপিএসের চালান বিমানবন্দর কাস্টমস, কোয়ারাইন্টাইন শাখার ছাড়পত্র এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) প্রদত্ত সনদের বদৌলতে গ্রিন টি সাব্যস্ত করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও পাচার করতেন নাজিম।

জানা যায়, আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ার নাগরিক বাহার ও আবদির মাধ্যমে নাজিম এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। বাংলাদেশ থেকে আবার রপ্তানি শুরু করেন অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকাতেও। তার আয়ের টাকা যেত বাহার ও আবদির কাছে। পরে প্রতি ৫০০ কেজি খাট বিক্রির জন্য তারা দেড় হাজার ডলার দিত নাজিমকে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনসহ একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নাজিমউদ্দিনের বাবার নাম হাজি আনোয়ার আলী। চার ভাই, দুই বোনের মধ্যে নাজিম সবার বড়। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের তেতৈতলায়। নাজিমের বাবা-চাচাদের দুবাইয়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা আছে। বাবার মৃত্যুর পর নাজিমই ব্যবসার হাল ধরেন। ১৩ বছর আগে বিয়ে হয় নাজিমের। নাজিমের এক মেয়ে ও এক ছেলে ঢাকায় থাকে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, খাট মাদকের ব্যবসা করে বিশাল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন নাজিম। তার তিশা পরিবহনে (ঢাকা-কুমিল্লা) রয়েছে দুটি বিলাসবহুল কোচ, সমুদ্রগামী জাহাজও রয়েছে। দুবাইয়ে রয়েছে এসটি নামে একটি অ্যাড ফার্ম। এ ছাড়া শারজাহে এসটি প্রিন্টিং নামে একটি প্রিন্টিং প্রেস রয়েছে। এসএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করলেও বিদেশ থাকার কারণে ইংরেজি ও আরবি ভাষায় দক্ষ এই মাদক ব্যবসায়ী।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, দেড় হাজার কেজি ওজনের জব্দ করা একটি খাট চালানের তদন্তে নেমে দেখা গেছে ওই চালানটি এসেছিল আদ্দিস আবাবার জিয়াদ মোহাম্মাদ ইউসুফ নামক এক ব্যক্তি মারফত। ৯৬টি কার্টনে প্যাকেট করা এই খাটের গায়েও ‘গ্রিন টি’ লেবেল আঁটা ছিল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ২০টি স্থানে এসবের প্রাপ্তির ঠিকানা দেওয়া ছিল। প্রাপকদের নামগুলো ছিল-মোহাম্মাদ বাবু, মতি মিয়া, একরামুল হক, উজ্জ্বল মিয়া, আলমগীর হোসেন, সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মাদ মুন্না, রাশেদ হোসেন, আব্দুল লতিফ, ওবায়দুর রহমান, শাহ আলম, মোহাম্মাদ বাদল, জয়, আতিক উল্লাহ, আমিন, রুহুল আমিন, মুশফিক্ম, মিজানুর এবং এসএম সাইফুল ইসলাম। এ তালিকা ছাড়াও গুলশান এলাকার সানি আঞ্জেল প্যালেস নামে একটি সংগঠনের নাম ওই চালানের প্রেরকের তালিকায় উল্লেখ ছিল।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে