sara

রপ্তানি হচ্ছে সাতক্ষীরার আম

  মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল, সাতক্ষীরা

০৪ জুন ২০১৬, ০০:০০ | আপডেট : ০৪ জুন ২০১৬, ০০:০৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাতক্ষীরায় উৎপাদিত হিমসাগর ও আম্রপালি জাতের আম বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। ইতালি, জার্মান ও ইংল্যান্ডের বাজারে বিক্রি হচ্ছে এখানকার আম। যদিও এ বছর জেলায় আমের ফলন খুব ভালো হয়নি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রমতে, এক বছর আমের ফলন ভালো হলে পরের বছর ফলন কম হয়। যেহেতু গত বছর জেলায় আমের ফলন ভালো হয়েছিল, সে কারণে এ বছর আমের ফলন খুব বেশি ভালো হয়নি। সাতক্ষীরায় মাটি ও জলবায়ুজনিত কারণে আমে আগে মুকুল আসে এবং আগে পেকে যায়। এ ছাড়া এখানকার আম অনেক সুস্বাদু।

তিনি আরও জানান, সাতক্ষীরার আম এ বছর ইতালি, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের বাজারে যাচ্ছে। আম রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ইসলাম এন্টারপ্রাইজ ও ন্যানো কোম্পানি আম রপ্তানি করছে।

জানা গেছে, জেলার তালিকাভুক্ত যেসব আমচাষি নিয়মমাফিক পরিচর্ষা করে আম উৎপাদন করেছেন, শুধু তাদের কাছ থেকেই রপ্তানির জন্য আম ক্রয় করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২৫ টন আম বিদেশে রপ্তানি হয়েছে। রপ্তানির পরিমাণ আরও বাড়বে।

তালিকাভুক্ত আমচাষি আকবর আলী জানান, চুক্তিবদ্ধ হয়ে রপ্তানির শর্ত মেনে উৎপাদিত এসব আম মণপ্রতি ৩ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করছি কোম্পানির কাছে। কৃষি কর্মকর্তারাও সার্বক্ষণিক তাদের আমগাছের পরিচর্যা মনিটরিং করেন ও পরামর্শ দেন। দাম বেশি পেয়ে খুশি এ ব্যবসায়ী। এ বছর তার বাগানে দুই টন আম রপ্তানি হয়েছে।

কৃষি বিভাগের সূত্রমতে, গত বছরে আম যুক্তরাজ্যে রপ্তানি হয়েছিল। এবার যুক্তরাজ্য ছাড়াও ইতালি, ফ্রান্স ও জার্মানিতে রপ্তানি হচ্ছে।

হর্টেক্স ফাউন্ডেশন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও এফএও-এর যৌথ কারিগরি সহায়তা এবং ইসলাম এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনায় প্রথম পর্যায়ে ২৫ টন ল্যাংড়া ও হিমসাগর আম ইতিমধ্যে রপ্তানি হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে আম্রপালিও রপ্তানি করা শুরু হবে।

সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও আম রপ্তানিবিষয়ক কমিটির সমন্বয়ক কৃষিবিদ আমজাদ হোসেন বলেন, কৃষি বিভাগ চাষিদের আগে প্রশিক্ষণ দেয়। আমের মান অক্ষুণœ রাখতে যেসব পরামর্শ দেওয়া হয়, তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন কৃষকরা। পোকা-মাকড় দমনে কীটনাশকের পরিবর্তে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করেন কৃষকরা। ক্ষতিকারক কোনো কিছুই প্রয়োগ করা হয় না আমে। এ বছর জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার উদ্যোগে জেলার ২০ জন চাষিকে আমচাষে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ইউরোপের দেশগুলোতে হিমসাগর আর ল্যাংড়া আমের চাহিদা ভালো। তবে প্রক্রিয়াকরণের বিষয়টি বেশ জটিল। গতবার প্রক্রিয়াকরণের কাজটি ঢাকায় হয়েছিল। এবার সরকারি নির্দেশে উপজেলা থেকে প্রক্রিয়াকরণ করতে হিমশিম খাচ্ছেন রপ্তানিকারকরা।

আমচাষি গোলাম মোস্তফা বলেন, কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে চাষ করায় এবার আমে পোকা হয়নি। এবার আম বিদেশে পাঠাচ্ছি। প্রথম পর্যায়ে হিমসাগর গেলেও কিছুদিন পর থেকে যেতে শুরু করবে ল্যাংড়া ও আম্রপলি।

আম ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম জানান, ১৬ লাখ টাকার আমবাগান কিনেছেন। এসব বাগানে হিমসাগর, গোপালভোগ, ল্যাংড়া, ফজলি, গোবিন্দভোগ, কিষাণভোগ, গোলাপখাস, শরিফখাস, রানী পছন্দ, লতা, আলফ্রেন্স বোম্বাই, রুপালি, চন্দ্রমল্লিকা, কালাপাহাড়, আম্রপালি ও কাঁচামিঠা আমের উৎপাদনই বেশি।

আমচাষি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, মুকুল থেকে গুটি পর্যন্ত তিন স্তরে স্প্রে করার পর থেকে আমে আর কোনো রাসায়নিক অথবা কীটনাশক প্রয়োগ করেননি। ফলে আম হয়ে উঠেছে পরিবেশবান্ধব। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, বেসরকারি সংস্থা সলিডারিডাড ও উত্তরণের যৌথ সহায়তায় চাষিরা আম উৎপাদন করেছেন। জৈব সার, আর্সেনিকমুক্ত পানি এবং মাছি পোকা দমনে কীটনাশক ব্যবহার না করে সেক্স ফেরোমেন ফাঁদ ব্যবহার করেছেন তারা।

সুলতানপুর বড় বাজার আম ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত হোসেন বলেন, প্রথম দিকে ঝড়ে আমের বেশ ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টি না হওয়ায় আম অনেক ছোট হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ খামারবাড়ির উপ-পরিচালক কাজী আবদুল মান্নান জানান, যে সাতটি নাম নিয়ে সাতক্ষীরার নামকরণ, আম তার অন্যতম। পারিবারিকভাবে ছাড়াও বাণিজ্যিকভাবে জেলাব্যাপী আমের চাষ হয়েছে এবারও। সাতক্ষীরা সদর, তালা, কালিগঞ্জ, দেবহাটা ও কলারোয়ায় আমের চাষ বেশি। এবার ৩ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে সাড়ে ১০ টন হিসেবে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৩৯ হাজার ১০০ টন আম।

তিনি আরও জানান, আরও ৫০ থেকে ৬০ টনের মতো আম বিদেশে রপ্তানি করা হবে। ইতোমধ্যে ১৫ টন হিমসাগর ও ৫ টন আম্রপালি বিদেশে পাঠানো হয়েছে। বাকি আম পর্যায়ক্রমে পাঠানো হচ্ছে। তিনি বলেন, নিরাপদ আম সংগ্রহে চাষিদের কাছে নির্দিষ্ট তাপে আমের পচনরোধে হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, হ্যান্ডগ্লোবসসহ নানা সরঞ্জামও তুলে দেওয়া হয়েছে। বিদেশে রপ্তানিযোগ্য আম সংগ্রহে কীভাবে নিরাপদ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়, সে বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে আমচাষিদের। আম সংগ্রহ করে প্যাকেজিংয়ের আগ পর্যন্ত মনিটরিং অব্যাহত রাখা হয়েছে। নিরাপদ আম উৎপাদনের জন্য সাতক্ষীরার দেড় শতাধিক চাষিকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আম বিশেষজ্ঞ ড. সালেহ আহমেদ ও মো. রফিকুল ইসলাম চাষিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

হর্টিকালচার বিশেষজ্ঞ ড. নাজমুন নাহার বলেন, ক্ষতি যাতে কম হয় সে বিষয়ে চাষিদের সতর্ক করা হয়েছে। রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ন্যানো সাতক্ষীরার চাষিদের কাছ থেকে আম ক্রয়ে চুক্তিবদ্ধ হয়ে বাগানে মনিটরিং চালিয়ে যাচ্ছে। হিমসাগর, ল্যাংড়া ও আম্রপালি জাতের আম পর্যায়ক্রমে সাতক্ষীরা থেকে নিয়ে যাওয়া হবে ইউরোপে রপ্তানির উদ্দেশে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কোয়ারেন্টাইন বিভাগের উপ-পরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, বিদেশে রপ্তানিযোগ্য আমের গুণগত মান নিশ্চিত করে এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তারা ছাড়পত্র দিলেই আম বিদেশ পাঠানো হয়ে থাকে। এর মধ্যে ২০ টনের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি আমের ছাড়পত্র জুন মাসের মধ্যে দেওয়া হবে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

জেলা মার্কেটিং কর্মকর্তা এসএম আব্দুল্লাহ জানান, প্রতিদিন গড়ে সাতক্ষীরার বাজার থেকে ২৫ থেকে ৩০ মেট্রিক টন আম রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে। এর বাইরে পারিবারিকভাবেই যাচ্ছে ৮ থেকে ১০ টন করে আম। তবে যত দিন যাচ্ছে, তত এর পরিমাণও কমে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

 

 

 

"

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে