sara

পলানের বইগুলো

  আমজাদ হোসেন শিমুল, রাজশাহী

০৯ মে ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পলান সরকার। ৯৭ বছর বয়সী এই ‘আলোর ফেরিওয়ালা’ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে হেঁটেই বাড়ি বাড়ি বই বিলি করেন। এলাকার মানুষকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতেই শেষ বয়সেও বই পড়ানোর এই অভিনব আন্দোলনের হাল ছাড়েননি। বয়সের ভারে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ায় ‘ভ্রাম্যমাণ এই মানব লাইব্রেরিটি’ এখনো বই বিলি করছেন ঠিকই। কিন্তু সেই বই ফিরিয়ে নিতে ভুলে যাচ্ছেন। ফলে দিন দিন ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে তার পাঠাগার, হারাচ্ছেন দীর্ঘদিন তার সংগ্রহে থাকা সেই অমূল্য বইগুলো।

কিন্তু তার পরও বসে নেই পলান সরকার। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা বাউসা থেকেই ছড়িয়ে যাচ্ছেন জ্ঞানের আলো। আলোকিত হয়ে উঠেছে আশপাশের অন্তত ২০টি গ্রাম। বয়স হয়েছে পলান সরকারের। শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। স্মৃতির ফ্রেমে পড়ছে ধুলো। তবু ক্লান্তি নেই সারাজীবন মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া এই মানুষটির। ছয় ছেলে ও তিন মেয়ের জনক পলান সরকার। তার স্ত্রী রাহেলা বিবি বছর ছয়েক হলো অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন।

বাউসা বাজারের অদূরে বর্তমান গেদুর মোড়। সেখানেই পলান সরকারের বাড়ি। বাড়ির পাশে পাঠাগার। শুক্রবার দুপুরে গিয়ে বাড়িতে পাওয়া গেল পলান সরকারকে। বসে ছিলেন তার সেই পাঠাগারেই। পাঠাগারের দিকে এগোতেই বেরিয়ে এলেন সেই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। হাত ধরে নিয়ে গেলেন পাঠাগারে।

সেই পাঠাগারে বসে কথা হচ্ছিল পলান সরকারের সঙ্গে। হেঁটে হেঁটে বইয়ের তাকে চোখ বুলাচ্ছিলেন তিনি। বলছিলেন, আর পারছি না। বয়স তো আর কম হলো না। তার পরও নিজের জীবন বেঁচে থাকা পর্যন্ত মানুষকে বই পড়াতেই থাকব। কথার ফাঁকে বিরাম নিচ্ছিলেন। বোঝাই যাচ্ছিল তার শারীরিক অবস্থা খুব ভালো নয়।

কিছুক্ষণ পর পাঠাগারে এলেন পলান সরকারের ছেলে হায়দার আলী। উপজেলার খগড়বাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তিনি। তিনিই দেখাশোনা করেন পাঠাগার। প্রত্যেক দিন স্কুল থেকে এসে বাবার সেই পাঠাগারে বিকাল ৩টায় গিয়ে বসেন।

হায়দার আলী জানালেন, এক সঙ্গে ৩০ জন পাঠক বসে পড়তে পারেন এই পাঠাগারে। রয়েছে সাত হাজারের বেশি বিভিন্ন ধরনের বই। তার বাবা এখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। ফলে তার কার্যক্রম কমে এসেছে কিছুটা হলেও। কানে কম শুনছেন। অনেক কিছুই তার মনে থাকছে না। পাঠাগারে এসে বই পড়লে রেজিস্টার খাতায় পাঠকের নাম লিপিবদ্ধ করতে হয়। কেউ বাড়ি নিয়ে গেলে সেই রেকর্ডও থাকে। কিন্তু তার বাবা বাড়ি বাড়ি গিয়ে যে বই দিয়ে আসেন তার কোনো রেকর্ড নেই। মনে না থাকায় অনেকেই তা ফিরিয়ে দিচ্ছেন না। ফলে কমে যাচ্ছে সংগ্রহে থাকা বাবার এই অমূল্য বইগুলো। হাত খরচের টাকা বাঁচিয়ে পলান সরকার তার নিজের টাকায় কেনা বই কী পরিমাণ হারিয়েছেন তার হিসাব মেলানো ভার, যোগ করলেন তিনি।

১৯৬৫ সালে ৫২ শতাংশ জমি দান করে বাউসা হারুন অর রসিদ শাহ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন পলান সরকার। ১৯৯০ সাল থেকে ওই বিদ্যালয়ে মেধাতালিকায় প্রথম ১০টি স্থান অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের বই উপহার দিতেন তিনি।

এরপর অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও বইয়ের আবদার করলে সিদ্ধান্ত নেন তাদেরও বই দেবেন। শর্ত দেন পড়ার পর তা ফেরত দেয়ার। এরপর গ্রামের মানুষ ও তার কাছে বই চাইতে শুরু করেন। ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে বই পড়া আন্দোলন।

প্রথমে আশপাশের ১০ গ্রামের মানুষই কেবল জানতেন পলান সরকারের কীর্তি। কিন্তু ২০০৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিটিভির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ তাকে তুলে আনে আলোকিত মানুষ হিসেবে। এরপর তিনি ২০১১ সালে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক লাভ করেন।

২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম ডে’ উপলক্ষে সারা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার দৈনিকে তার ওপর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তার জীবনের ছায়া অবলম্বনে নির্মিত হয় নাটক, বিজ্ঞাপন চিত্র। শিক্ষা বিস্তারের অনন্য আন্দোলন গড়ে তোলায় ইউনিলিভার বাংলাদেশ পলান সরকারকে ‘সাদা মনের মানুষ’ খেতাবে ভূষিত করে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে