বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী হারুন ধুঁকছেন বিনা চিকিৎসায়

  সানাউল হক সানী

১৩ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চলছে শোকের মাস আগস্ট। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিপথগামী কিছু সেনা সদস্যের হাতে নির্মমভাবে খুন হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সারা দেশ ছিল অবরুদ্ধ। বাক-স্বাধীনতাও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। সেনাসদস্যদের বাধার মুখে খুব কমসংখ্যক মানুষই এ হত্যার প্রতিবাদ জানাতে পেরেছিল। এর পরও যারা সরব হয়েছিলেন প্রতিবাদে, তারা হয়েছিলেন নির্মম নির্যাতনের শিকার। এমনই এক নির্যাতিত নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার সিংধা ইউনিয়নের মো. হারুন-অর-রশিদ।

১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত সিংধা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে যোগ দিয়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধ শেষে এলাকায় ফিরে দল ও দেশ গঠনে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন হারুন-অর-রশিদ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য নির্মমভাবে হত্যাকা-ের শিকার হন। এর প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন হারুন। মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত করে তোলেন নেত্রকোনা। এর জেরে সেনাসদস্যরা তাকে তুলে নিয়ে অকথ্য নির্যাতন চালায়। ১৮ দিন জেলে বন্দি রেখে নির্যাতন চালানোর পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। ফলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। জেল থেকে ফিরে তিনি ফের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে পড়েন; ভঙ্গুর দলের সাংগঠনিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত টানা এক যুগ তিনি থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩ থেকে ৯৬ সাল পর্যন্ত নেত্রকোনা জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে হারুন শিকার হয়েছিলেন নির্মম নিপীড়নের; হয়ে পড়েছিলেন অসুস্থ। এখনো তিনি হাসপাতালের বেডেই কাটাচ্ছেন মানবেতর জীবন। ব্যক্তিজীবনে সৎ এ মানুষটির সহায়-সম্বল বলতে তেমন কিছুই নেই। চিকিৎসার ব্যয়ভার পর্যন্ত বহন করার সামর্থ্য নেই তার। নিতে পারছেন না উন্নত চিকিৎসা। গত পাঁচ-ছয় বছর ধরেই বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত থাকলেও বর্তমানে অবস্থা খুবই শোচনীয়। বিভিন্ন সময়ে থানা ও জেলা পর্যায়ের আওয়ামী লীগের নেতারা হারুনের চিকিৎসার বিষয়ে বিভিন্ন আশ্বাস দিলেও কেউই কথা রাখেননি। বঙ্গবন্ধু অন্তপ্রাণ এই ব্যক্তির নিকটাত্মীয়রাও অনেকটা মুষড়ে পড়েছেন। উত্তরসূরিরা এই পরিস্থিতে বিমুখ হয়েছেন রাজনীতি থেকেও। এর পরও হারুনের স্বজনরা বলছেন, বিষয়টি দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার নজরে গেলে অনেক আগেই চিকিৎসার ব্যবস্থা হতো। এখনো তাদের প্রত্যাশা, সংবাদটি নেত্রীর কান অবধি পৌঁছবে এবং তিনি হারুনের পাশে দাঁড়াবেন। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছেন। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনও।

ময়মনসিংহ মেডিক্যালে বিভিন্ন সময় চিকিৎসা নিয়েছেন হারুন। তার ছেলে ইকবাল হোসেন আবেদ (রুবেল) আক্ষেপ করে আমাদের সময়কে বলেন, বাবা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতে গিয়ে সহায়-সম্বল সব খুইয়েছেন। ২৫০ কাঠার ওপরে জমি বিক্রি করে দিয়ে তিনি আজ নিঃস্ব। কারো কাছ থেকে একটি টাকাও নেননি। উদারহস্তে দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাবা অসুস্থ হওয়ার পর তার চিকিৎসায় সাহায্যার্থে বড় বড় নেতাদের দুয়ারে ধরনা দিয়েছি। কেউই এগিয়ে আসেননি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি জানলে অবশ্যই এগিয়ে আসতেন। কিন্তু নানাভাবে চেষ্টা করেও তার কাছে যেতে পারিনি। তিনি বলেন, স্থানীয় এমপি আরিফ খান জয় একটি দরখাস্তে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা লিখেছিলেন। এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই অর্থ এখনো আমরা পাইনি।

হারুন-অর-রশিদের নাতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ত্বকি হোসাইন আমাদের সময়কে বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা, আগস্টের ঘৃণিত হত্যাকা-ের প্রতিবাদকারী বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। আমরা অনেক জায়গায় হাত পেতেছি। সবাই কেবল কথাই দিয়েছে, কিন্তু কেউই কথা রাখেনি।

মোহনগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক এমদাদুল হকও কথা প্রসঙ্গে জানিয়েছেন হারুনের সাহসিতার কথা। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন। এ জন্য জেল খাটতেও হয়েছে।

বারহাট্টা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওয়াহেদ আমাদের সময়কে বলেন, হারুন-অর-রশিদ আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ নেতা ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকা-ের পরে বিদ্রোহ করে জেল ও নির্যাতন সইতে হয়েছে। বর্তমানে অসুস্থ। আমরা নানাভাবে চেষ্টা করছি উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য।

নেত্রকোনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী খান খসরু আমাদের সময়কে বলেন, ওনাকে ময়মনসিংহ হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম। পরে রিলিজ নিয়ে বাসায় ফেরার পথে দেখা হয়ে গেছে। তিনি বলেন, চিকিৎসার খরচের জন্য আমার কাছে আসেনি। বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হারুন-অর-রশিদ। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্য আরিফ খান জয়ের এয়ারটেল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করলে বন্ধ পাওয়া যায়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে