সিডরের ১০ বছর

পরিবারের ১১ সদস্য নিহত হলেও বেঁচে ছিল ৪১ দিনের শিশু ডলি

  হায়াতুজ্জামান মিরাজ, আমতলী

১৫ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঘূর্ণিঝড় সিডরের তা-বে নিহত হন পরিবারের ১১ সদস্য। ভয়ঙ্কর সেই রাতে আট ঘণ্টারও বেশি সময় প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে যায় এক মাস ১১ দিন বয়সের শিশু ডলি। শিশুটি এখন বরগুনার তালতলী উপজেলার কবিরাজপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। লেখাপড়ার অদম্য বাসনা থাকলেও দরিদ্রতাই প্রধান অন্তরায়। সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার ঠুকরে কেঁদে উঠছেন ডলির বাবা খলিলুর রহমান। তিনি জানান, ভয়াবহ সেই রাতে পরিবারের ১১ জনকে হারানোর কথা। খলিল হাওলাদার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ওই রাতটি আমার সব কিছু শেষ করে দিয়েছে। ওই রাতে খলিল তার বাবা খালেক হাওলাদার, মা নুরজাহান বেগম, স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও এক মাস ১১ দিনের কন্যাশিশু ডলিকে আকড়ে ধরেন যাতে পানির ঢেউয়ে তারা ভেসে না যায়। ঢেউয়ের ধাক্কায় প্রথমে বাবা খালেক হাওলাদার পরে মা নুরজাহান বেগম তার হাত থেকে ছুটে যান। এ সময় স্ত্রী আনোয়ারা ও শিশুকন্যা ডলিকে নিয়ে খলিল একটি রশি ধরে কিছুক্ষণ অবস্থান করেন। কিছুক্ষণ পর স্ত্রী আনোয়ারা বেগম স্বামী খলিলকে ডেকে বলেন, তোমার কন্যা তুমি নাও আমি আর পারছি না। এই বলে কন্যাকে স্বামীর হাতে তুলে দিয়ে স্ত্রী আনোয়ারা রশি থেকে ছুটে যান। একা খলিল শিশুকন্যা ডলিকে নিয়ে সাগরে ভাসতে থাকেন। কখনো শিশুকন্যাকে দুহাতে ওপরে তুলে রাখেন, আবার কখনো মুখ দিয়ে সোয়েটার কামড়ে ধরে রাখেন। তিনবার মৃত্যু ভেবে শিশুকন্যাকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন, আবার বেঁচে রয়েছে ভেবে আগলে ধরেন। এভাবে আট ঘণ্টা সাগরে ভাসতে থাকে শিশুকন্যা ডলিকে নিয়ে খলিল। রাত সাড়ে চারটার দিকে একটি গাছের সঙ্গে খলিল ও শিশুকন্যা ডলি আটকা পড়েন। ওই সময় স্থানীয় মানুষ খলিল ও কন্যা ডলিকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসে। সিডরের ওই রাতে খলিল তার বাবা খালেক হাওলাদার, মা নুরজাহান বেগম, স্ত্রী আনোয়ারা বেগম, বোন রেহেনা বেগম, ভাইয়ের ছেলে সোহাগ, ভাগ্নি শারমিন, খুকুমণি, সীমা, শিউলি, ভাইয়ের মেয়ে দুলিয়া ও বোনের নাতি সোনামণিকে চিরদিনের জন্য হারান। এদের মধ্যে ১০ জনের লাশ পেলেও স্ত্রী আনোয়ারার লাশ এখনো পাননি তিনি। পরিবারের ১১ জনকে হারানোর বেদনা নিয়ে খলিল তার শিশুকন্যা ডলিকে আকড়ে ধরে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছেন। সিডরের পর বাবা খালেক হাওলদারের রেখে যাওয়া ৩০ শতাংশ জমি বিক্রি করে খলিল কোনো মতে পরিবারপরিজন নিয়ে দিনাতিপাত করছেন।

খলিল হাওলাদার আক্ষেপ করে বলেন, আমার পরিবারের ১১ জন সিডরে নিহত হয়েছেন। ওই সময় সরকারের পক্ষ থেকে দাফনের জন্য টাকা বরাদ্দ থাকলেও আমার কপালে জোটেনি। সিডরে সবকিছু হারিয়েছি আর সিডরের পর বাবার রেখে যাওয়া ৩০ শতাংশ জমি হারিয়েছি। ওই সময় থেকেই সাগরে মাছ ধরা বন্ধ করে দিনমজুরের কাজ করে সংসার পরিচালনা করছি। স্বপ্ন দেখছি শিশুকন্যা ডলিকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করে বেঁচে থাকার। কিন্তু অভাবের সংসার, কতটুকু পারি জানি না।

জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় সিডরের সতর্কবাণী উপেক্ষা করে সেই রাতে তালতলীর আশারচরে অবস্থান করছিল প্রায় ১০ হাজার জেলে পরিবার। ১৮ সদস্য নিয়ে খলিল হাওলাদারের পরিবার সেখানে বাস করছিল। তাদের প্রধান কাজ সাগরে মাছ ধরা। রাত ৯টার দিকে সিডর উপকূলে আঘাত হানে। এ আঘাতের দৃশ্য দেখার জন্য বড় ভাই জলিল ও ভগ্নিপতি সোহরাব বাসার বাইরে বের হন। এরই মধ্যে বাতাসের গতি বৃদ্ধি পেয়ে সাগরের ঢেউ কূলে আঘাত হানে। ঢেউয়ের আঘাতে বাসা ল-ভ- হয়ে যায়। ওই সময় বাসায় থাকা সবাই বিছিন্ন হয়ে পড়ে।

জানা গেছে, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর । ওই রাতে ঘণ্টায় ২১৫ কিলোমিটার গতির প্রলয়ঙ্করি ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানে উপকূলীয় এলাকায়। আঘাতে উপকূলের সবকিছু ল-ভ- হয়ে যায়। সিডরে আমতলী ও তালতলী উপজেলায় ২৯৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। নিখোঁজ রয়েছে ৪৯ জন। অসংখ্য গবাদিপশু মারা যায় সেই রাতে। বাড়িঘর, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট, ভেরিবাঁধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সুন্দরবনের গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়। সিডরের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে গতকাল। কিন্তু আজও উপকূলবাসীর মাঝে ফিরে আসেনি সচেতনতা। ওই সময় অসচেতনতার কারণে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী নিদ্রা, সখিনা, আশারচর, জয়ালভাঙ্গা ও ফকিরহাট এলাকায়। যারা সাইক্লোন সেল্টারে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের প্রাণহানি ঘটেনি। বেশি প্রাণহানি ঘটেছে সাগরে অবস্থানরত জেলেদের। জেলেদের অসচেতনতার জন্য এত প্রাণহানি। গত ১০ বছরে উল্লেখযোগ্য কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়নি এ এলাকায়। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কাজ এখনো অসমাপ্ত।

সিডরের পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। আমতলী ও তালতলীতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ৩৫টি সাইক্লোন সেল্টার নির্মাণ করা হয়েছে। যা অপ্রতুল। বড় ধরনের দুর্যোগ দেখা দিলে মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়বে। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এখনো পুরোপুরি নির্মাণ হয়নি। সোনাকাটা ইউপি সদস্য আবদুস ছালাম হাওলাদার বলেন, সাগরে জেলেরা সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে। সিডরের এতবড় আঘাতেও তাদের মাঝে সচেতনতা ফিরে আসেনি। তিনি আরও বলেন, বর্তমান মৌসুমে আশারচরে কয়েক হাজার মানুষ বসবাস করে। কিন্তু এখানে কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নেই। কোনো দুর্যোগ দেখা দিলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে এখানে। আশারচরে জেলেদের নিরাপত্তার জন্য আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা প্রয়োজন।

বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মশিউর রহমান বলেন, বাকি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এ বছর নির্মাণ করা হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে