বিটিভির চার কর্মকর্তা হত্যার বিচার শেষ হয়নি ৪২ বছরেও

  রহমান জাহিদ

১৯ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০১৭, ০০:৫২ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) চার কর্মকর্তাকে অপহরণপূর্বক হত্যা মামলার বিচার ৪২ বছরেও সম্পন্ন করতে পারেননি আদালত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ওই বছর ৭ নভেম্বর এ হত্যাকা- সংঘটিত হয়। চার্জগঠনের আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট ২০০৪ সালে নিম্ন আদালতের কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। কিন্তু পরে তা প্রত্যাহার না হওয়ায় মামলাটির বিচারে ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত আর অগ্রসর হতে পারেননি। ফলে মাত্র একজনের সাক্ষ্যগ্রহণের পরই থমকে আছে এ বিচার।

এ সম্পর্কে ওই আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌশলী অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আবদুস সত্তার দুলাল বলেন, হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকায় ২০০৪ সাল থেকে মামলার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিটিভি ভবনসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে সেনা মোতায়েন করা হয়। ওই সময় বিটিভির কর্মচারী কল্যাণ সমিতি বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করছিল। এ নিয়ে কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারী সমিতির মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ নিরসনের জন্য গোপন বৈঠক হয়। ওই বৈঠকের পর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সম্প্রচার কেন্দ্রের অন্যতম স্থপতি, পাক্ষিক বিচিত্রার সম্পাদক, বিটিভির তৎকালীন উপমহাপরিচালক মনিরুল আলম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবি সিদ্দিক, প্রধান হিসাবরক্ষক আকমল খান ও চিত্রগ্রাহক ফিরোজ কাইয়ুম চৌধুরীকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। নিহত চারজনের লাশ গুম করার জন্য বিটিভি ভবনের পেছনের বর্তমান হাতিরঝিলে ফেলে দেওয়া হয়।

পরের বছর ১৯৭৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি কাইয়ুম, সিদ্দিক ও আকমলের তিনটি কঙ্কাল উদ্ধার করে তা শনাক্ত করা হয়। পরনের কাপড় আলামত হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। ওই ঘটনায় ১৯৭৫ সালের ১৯ নভেম্বর নিহত চারজনের স্ত্রীরা গুলশান থানায় চারটি পৃথক মামলা দায়ের করেন, যা পরে একটি মামলায় একীভূত হয়।

মামলাটি তদন্তের পর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ডিবির তৎকালীন উপপরিদর্শক জাহাঙ্গীর হোসেন ১৯৭৮ সালের ৯ জানুয়ারি আসামিদের শনাক্ত করা যায়নি মর্মে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নিহত আকমলের স্ত্রী মনোয়ারা আকমল বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তা পুনঃতদন্তের আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই মামলাটি পুনঃতদন্তের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ১৯৯৭ সালের ২৫ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে আদালত সিআইডিকে মামলাটি পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন।

পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত শেষে ১৯৯৯ সালের ১৮ আগস্ট তিন সেনাসদস্যসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল করিম খান চার্জশিট দাখিল করেন। আসামিরা হলেনÑ বিটিভির তৎকালীন সহকারী পরিচালক (এডি) আবুল কাশেম বাগোজা ও আবদুল আওয়াল সরকার, বিটিভির এক নম্বর গ্রেডের প্রযোজক লুৎফর রহমান তালুকদার, অধিবেশন নিয়ন্ত্রক সৈয়দ আইনুল কবির, ওই সময় বিটিভিতে কর্মরত কর্মকর্তা আইনুজ্জামান, সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অনারারি লেফটেন্যান্ট আলতাফ হোসেন, ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সদস্য কেএএম জাকারিয়া হায়দার ও শাহজাহান সিরাজী। এদের মধ্যে আলতাফ ও কাশেম আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছেন।

২০০২ সালের ৭ আগস্ট মামলাটি বিচারিক আদালতে যায়। ২০০৩ সালের ১৬ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জগঠন করা হয়। সে অনুযায়ী ২০০৪ সালের ১৯ মে নিহত মনিরুল আলমের শ্যালক মুহাম্মদ আলী স্বপন আদালতে সাক্ষ্য দেন। তবে আসামিদের আবেদনে ২০০৪ সালের ২৬ মে হাইকোর্ট এ মামলার কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। দফায় দফায় ওই মেয়াদ বাড়তে থাকাবস্থায় ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারি রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতাদেশ বর্ধিত করেন হাইকোর্ট।

মামলার চার্জশিটে বলা হয়, বিটিভির কর্মচারী কল্যাণ সমিতি বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করছিল। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্মচারীদের দাবি মানতে রাজি ছিলেন না। ওই অবস্থায় রামপুরা টিভি ভবনে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর অনারারি লেফটেন্যান্ট (অব) আলতাফ হোসেনের সঙ্গে কর্মচারী নেতাদের সমঝোতা হয়। তাদের দাবি আদায় করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাতে আলতাফসহ আসামিদের বৈঠক হয়। পরদিন সকালে আলতাফের নেতৃত্বে মামলার অপর আসামিরা বিটিভির ফটকে দাঁড়িয়ে থাকেন, কর্মকর্তাদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয় সাদা কাগজে সই নিয়ে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মনিরুল, আকমল ও সিদ্দিক ফটকে প্রবেশ করলে আলতাফ, আবুল কাশেম ও আবদুল আওয়াল, লুৎফর রহমান, আইনুল কবির, ডিউটি অফিসার আইনুজ্জামান ও শাহজাহান মিয়াজী তাদের আটক করেন।

বিটিভির তখনকার মহাপরিচালক জামিল চৌধুরী ও জেনারেল ম্যানেজার মুস্তাফা মনোয়ারকেও সেদিন আটক করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু অফিসে না আসায় তারা প্রাণে বেঁচে যান। আটক তিন কর্মকর্তাকে বিটিভির ১০১ নম্বর কক্ষে আটকে রাখার পর দুপুরের দিকে টিভি ভবনে আসেন ক্যামেরাম্যান ফিরোজ কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি কর্মকর্তাদের আটকে রাখার প্রতিবাদ করলে তাকেও আটক করা হয়। এর পর ৭ নভেম্বর রাত ৮টার দিকে ভবনের সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। তখন চারজনকে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় টিভি ভবনের পেছনে ঝিলপাড়ে। সেখানে আলতাফের নেতৃত্বে সাত আসামি তাদের গুলি করেন এবং বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে হাতিরঝিলের পানিতে লাশ ফেলে দেন।

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে