নির্ভার বিএনপি, তিন ভাগে আ.লীগ

  সাইয়িদ মাহমুদ পারভেজ, কুমিল্লা

১৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:৩৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

১৫ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভা মিলে কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) সংসদীয় আসন। বিএনপির শক্তিশালী আসনগুলোর মধ্যে অন্যতম এটি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত নির্বাচনের পর যে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউপি নির্বাচনগুলো হয়েছে সেগুলোও ছিল বিতর্কিত। নির্বাচনগুলোতে বিএনপির সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মাঠে থেকে বরুড়ায় প্রশাসনকে কিছুটা সুষ্ঠু নির্বাচন করাতে বাধ্য করায়। এর ফলও পায় বিএনপি। বরুড়া উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভা মেয়র ও অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন বিএনপি থেকে। চট্টগ্রাম বিভাগের আর কোনো উপজেলায় বিএনপির পক্ষে এটা সম্ভব হয়নি। এই আসনে বিএনপির এক প্রকার নিশ্চিত প্রার্থী কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সহসভাপতি জাকারিয়া তাহের সুমন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বিভক্ত তিন ধারায়। বর্তমান এমপি জাতীয় পার্টির (জাপা) অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলন। উপজেলায় এখন জাপা-আওয়ামী লীগ সাপে-নেউলে সম্পর্ক।

১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে এমপি হন প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হাকিম। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি হন বিএনপির প্রয়াত আলী হোসেন। ১৯৮৬ সালে তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি হন প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হাকিম। ১৯৮৮ সালে চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে এমপি হন সাবেক জাপা নেতা ও বর্তমান কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. মাহবুবুর রহমান ভুইয়া। ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে এমপি হন বিএনপির আবু তাহের। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনেও বিএনপির আবু তাহের এমপি হন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে এমপি হন আওয়ামী লীগের আবদুল হকিম। ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে আবার এমপি হন বিএনপির আবু তাহের। তিনি ২০০৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মারা গেলে একই বছরের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে জাপার অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলনকে হারিয়ে এমপি হন প্রয়াত আবু তাহেরের বড় ছেলে জাকারিয়া তাহের সুমন। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে এমপি হন আওয়ামী লীগের নাসিমুল আলম চৌধুরী নজরুল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে এখানে মহাজোট থেকে মনোনয়ন পান অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলন। তিনি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী কামরুল ইসলামকে ৩৩ হাজার ৬৯৮ ভোটে পরাজিত করে এমপি হন।
আওয়ামী লীগ : বরুড়ায় আওয়ামী লীগ তিনভাগে বিভক্ত। এক গ্রুপে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগ আহ্বায়ক নাসিমুল আলম চৌধুরী নজরুল। আরেক গ্রুপে আছেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের শিল্পবিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক মিয়াজী। তৃতীয় গ্রুপে আছেন আওয়ামী লীগের প্রয়াত এমপি আবদুল হাকিমের ছেলে ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। তিন নেতাই এলাকায় সক্রিয় এবং সম্ভাব্য প্রার্থী।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অভিযোগ, অধ্যাপক মিলন মহাজোট থেকে এমপি হলেও তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেননি। বিএনপিকেই সুবিধা করে দিয়েছেন তিনি। যদিও এমপি ও তার সমর্থকরা এ অভিযোগ অস্বীকার করছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, নাসিমুল আলম চৌধুরী নজরুল ২০০৮ সালে এমপি নির্বাচিত হলেও স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে দলীয় প্রার্থীরা হেরে যান। এ জন্য নজরুলকেই দায়ী করা হচ্ছে। বর্তমানে তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক। ২০০৮ সালে দলীয় সভানেত্রীর কার্যালয়ে কুমিল্লা জেলা নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে এক সভায় প্রয়াত আবদুল হাকিম অভিযোগ করে বলেছিলেন, নজরুলের বাবা কুট্টু মিয়া ১৯৭১ সালে শান্তি বাহিনীর সংগঠক হিসেবে কাজ করেন, তিনি একজন তালিকাভুক্ত যুদ্ধাপরাধী ছিলেন। তার চাচা সামছুল আলম মিয়া (সিএসপি অফিসার) মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে থাকাসহ অন্যান্য অপরাধের দায়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নাগরিকত্ব বাতিল করেন। সেই কুট্টু মিয়ার ছেলেকে এমপি বানানো হয়েছে।
ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক মিয়াজী ছাত্রজীবনে কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্র সংসদের ১৯৮৪-৮৫ সালে জিএস ও ১৯৮৫-৮৬ সালে ভিপি ছিলেন। গত উপজেলা নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেলেও কাগজপত্রে ত্রুটির কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি। তিনি বরুড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এখন ফ্যাক্টর বলে মনে করেন স্থানীয় রাজনীতিকরা।
এদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্প্রতি নিজের প্রার্থিতা পরোক্ষভাবে জানান দিতে গত ৮ জুলাই বরুড়ায় নাসিমুল আলম চৌধুরী নজরুল জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও সাধারণ সম্পাদক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হককে নিয়ে জনসভার আয়োজন করেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কামরুল ও এনাম গ্রুপের বক্তব্যÑ মনোনয়ন দেবে দলীয় মনোনয়ন বোর্ড, বরুড়ার জনসভা নয়।
সাংগঠনিক ক্ষেত্রে এনামুল হক মিয়াজীর যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তিনি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উৎসবে নিবেদিতভাবে সহযোগিতার হাত বাড়ান।
বিএনপি : বিএনপি তথা ২০-দলীয় জোটের একমাত্র সম্ভাব্য প্রার্থী সাবেক এমপি জাকারিয়া তাহের সুমন। তার বাবা আবু তাহেরও এই আসন থেকে তিনবার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। দল এবং জোটে তার ন্যূনতম প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। এবার উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করে বরুড়ায় নিজের অবস্থানকেই শুধু সুসংহত করেননি জাকারিয়া তাহের, তিনি আগামী নির্বাচনে যে একজন শক্ত প্রার্থী প্রতিপক্ষকে সেই বার্তাও দিয়েছেন। বিএনপি নেতাকর্মীদের বক্তব্যÑ আমরা বিজয় নিয়ে কিংবা আওয়ামী লীগের গ্রুপিং নিয়ে চিন্তা করছি না। আমরা চাচ্ছি ন্যূনতম হলেও একটি সুষ্ঠু ভোট হোক। তা হলেই আমরা বিজয়ী হতে পারব।
জাতীয় পার্টি : ১৯৮৮ সালে জাপা থেকে নির্বাচিত এমপি মাহবুবুর রহমান ভুইয়া এখন জেলা বিএনপির সহসভাপতি। বর্তমানে জাপার এমপি অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলন। উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান কামাল হোসেনও জাপা নেতা। দলটিতে এখানে গ্রুপিং নেই। অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলন দলের একক সম্ভাব্য প্রার্থী। আসলে এ আসনে জাপার নিজস্ব ভোটব্যাংক নেই। তবে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলনের ব্যক্তি ইমেজের কিছু ভোট আছে। তিনি চাচ্ছেন আরেকবার মহাজোটের প্রার্থী হতে। আর মহাজোটের প্রার্থী হতে না পারলেও তিনি জাপা থেকে নির্বাচন করবেন।

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে