জমজমাট অবৈধ হাট

  রেজাউল রেজা

১৬ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:৩৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঐতিহাসিক রায়েরবাজার বধ্যভূমির পাশেই রায়ের বাজার কবরস্থান। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের অংশ এটি। এ কবরস্থানের দেয়ালঘেঁষে বছরখানেকেরও বেশি সময় ধরে অবৈধভাবে জমজমাট সাপ্তাহিক হাট বসছে। সাধারণ জনগণ এটিকে ‘ডাক’-এ নেওয়া সাপ্তাহিক হাট হিসেবে জানলেও আসলে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে এটি। ভাড়ার নামে তিন শতাধিক ছোটবড় দোকান থেকে টাকা তুলে পকেট গরম করছে স্থানীয় প্রতাপশালীরা। প্রশাসনও দেখে না কিছু।

সরেজমিন হাট ঘুরে দেখা গেছে, কবরস্থানের গাঘেঁষে নার্সারি, তার পরই হাট। কৃষি মার্কেটের উল্টো পাশ থেকে শুরু করে কবরস্থানের প্রধান ফটকের দিকে গড়ে তোলা হয়েছে আধা কিলোমিটারেরও লম্বা সোমবার বসা এ হাট। বিকাল গড়াতেই জমজমাট হয় বাণিজ্য। ততক্ষণে রাস্তার ওপর উঠে আসে হাট। রাস্তার দিকে আবার অস্থায়ীভাবে দেওয়া হয়েছে বেড়া। প্রধানে সড়কের যানবাহন চলাচলের ভোগান্তি নিয়ে নেই কোনো মাথাব্যথা। সবাই ব্যস্ত ক্রেতা ধরতে।

জানা গেছে, এ হাটের দেখভাল করেন জুলহাস, আলমগীর ও মঙ্গলসহ দাপুটে চাঁদাবাজ চক্র। তাদের নেতৃত্বেই তোলা হয় ভাড়া। প্রতি সোমবার এমনভাবেই সরকারি জায়গা ব্যবহার করে মোটা অঙ্কের টাকা কামিয়ে নিচ্ছে তারা। নাম গোপনের শর্তে হাটের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘জুলহাসের ভাই-ব্রাদাররাই টাকা তোলে এখানে। এলাকার মাথারা, কাউন্সিলর, পুলিশ সবাই ভাগ পায় এইখান থেইকা। পুলিশ আসে, কিন্তু কিছু কয় না।’ ওই ব্যবসায়ী আরও বলেন, ‘একটু খারান ভাই। সন্ধ্যায় আইব হেরা টাকা তুলতে।’ সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই দেখা মেলে চাঁদাবাজ চক্রের। তবে জানা যায়, জুলহাস আসেননি, এসেছে তার দলে একজন। প্রকাশ্যে তিনজনের একটি দল তুলছে ভাড়া। হাতে মোটা অঙ্কের টাকার বান্ডেল। ছবি তুলতে গেলে বোঝা গেল তিনজন নয়, হাটজুড়ে আছে আরও অনেকেই। সদলবলে এগিয়ে আসে ফটোসাংবাদিকের দিকে। এমনটাই ছিল সরেজমিনের অভিজ্ঞতা।

ওয়ার্ডের জনসংখ্যা প্রায় চার লাখ। ভোটার আছে ৬০ হাজার।

ঘনবসতির এ ওয়ার্ডে সোমবার হাটের মতো রয়েছে আরও অনেক দখলদারি ও অবৈধ স্থাপনা। এলাকার একটি মাত্র খেলার মাঠ ‘বৈশাখী মাঠ’। অনৈতিকভাবে সেখানেও গড়ে তোলা হয়েছে ‘সবুজ সংঘ’ নামে একটি ক্লাবঘর। স্থানীয়রা জানান, ক্লাব ঘরটি এখানে আছে বহুদিন, কেউ কিছু বলে না। তবে ক্লাবঘর থাকে তালা মারা। মাঠের প্রধান ফটকেও দেখা গেল বিচিত্র এক নির্দেশনার সাইনবোর্ড। সেখানে লেখা আছে, মাঠে খেলাধুলা ব্যতীত অন্য কোনো সভা ও সমাবেশ করতে হলে এ ‘সবুজ সংঘের’ অনুমতি নিতে হবে। নিয়মের বাইরে উন্মুক্ত মাঠে যেখানে ক্লাবঘরের বৈধতাই নেই, সেখানে এ ক্লাবঘর নাকি মাঠের নীতিনির্ধারকের ভূমিকা পালন করছে। সাইনবোর্ডের নিচে ছোট্ট হরফে লেখা, ‘আদেশক্রমে কর্তৃপক্ষ’। এমন আদেশ কোনো কর্তৃপক্ষ দিয়েছে তা অজানা সবার কাছে। তবে চলছে এমনটাই।

বেড়িবাঁধের ওপর সাদেক খান কৃষি মার্কেট ঘিরেও আছে অবৈধ স্থাপনা ও বাণিজ্য। আজিজ খান রোডের বাসিন্দা সুরুজ ইসলাম বলেন, বুদ্ধিজীবী কলেজের ভেতরেও রয়েছে দখলবাণিজ্য। কলেজের সীমানার ভেতর আছে গ্যারেজ। পাল সমিতির ট্রাস্টের জায়গা হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে এটি দখলে আছে বহু হাতে। ভাড়া তোলা হয় সেখানে থেকেও। এদিকে হসেম খান রোডেও প্রত্যেক বিকালে রাস্তা দখল করে জমে বাজার। এখানে আবার রয়েছে ভাসমান দোকানের উৎপাত। ভ্যানের ওপর কাপড় থেকে শুরু করে লেইস ফিতাসহ সবই মেলে এখানে। বিকাল হলেই অর্ধশতাধিক ভ্যান দখল করে রাখে এখানকার বড় রাস্তাটি। ফলাফল যান চলাচলে বাড়ে দুর্ভোগ। বেড়িবাঁধের পূর্ব পাশে, বাড়ইখালি ও মেট্রো হাউজিংয়ের আংশিক এলাকাতেও যাতায়াতে রয়েছে ভোগান্তি। রাস্তাঘাট অনেক খারাপ। সেখানেও অবৈধ দোকানপাটের রয়েছে দৌরাত্ম্য।

ওয়ার্ডের চিরচেনা আরেক সমস্যার নাম মাদক। মাদকের প্রকোপ সবখানেই। তবে বটতলার বেশ প্রসিদ্ধ এখানে। বটতলা থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবী রোডব্যাপী সম্পূর্ণ অংশ রয়েছে ভাসমান মাদক ব্যবসাযীদের দখলে। এদিকে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড মোহাম্মদপুর থানা, হাজারীবাগ থানা ও ধানম-ি থানার অধীনে থাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে অঞ্চলটি। এক স্থানীয় বানিন্দা বলেন, আমরা ‘ছিটমহল’ থানায় থাকি ভাই। এ তিনটি থানার সীমানা লাফিয়ে লাফিয়ে প্রসাশনের নাগালের বাইরে থাকে এখানকার মাদক ব্যবসায়ীরা। সরেজমিনে শংকর বালুর মাঠেও দেখা যায় মাদকসেবীদের আনাগোন। অন্যদিকে গির্জা গলি, ৬ তলা গলিতেও সরব আছে মাদক। এদিকে ওয়ার্ডের সিটি করপোরেশনের কাঁচা বাজারটির অবস্থাও করুণ। পানিতে সমস্যায় আছে সুলতানগঞ্জ, জাফরাবাদ, শংকর, মধুবাজার এলাকা। পানির সরবরাহ দিনের বেলা থাকে কম। জাফরাবাদ এলাকা ও বৈশাখী পাম্প অঞ্চলের পানিতে দুর্গন্ধ। রাতের বেলা ছাড়া এলাকায় থাকে না গ্যাস। ডিজাটাল যুগে এসেও ওয়ার্ড আছে সোডিয়াম বাতির যুগে। মাদক প্রকোপ চলে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে