‘সরকার মরার তালিকা করে বাঁচার তালিকা করে না’

রাঙামাটিতে ভয়াবহ পাহাড়ধসের আট মাস

  জিয়াউর রহমান জুয়েল, রাঙামাটি

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাহাড়ধসে কর্মক্ষম দুই ছেলে রুপম দত্ত (২০) ও সুমন দত্তকে (২৫) হারিয়েছেন বাদল দত্ত (৫৪) ও বুলুরানী দত্ত (৪৫) দম্পতি। দমকলবাহিনী অর্ধমৃত অবস্থায় উদ্ধার করে তাদের। পা, মাথা আর মেরুদ-ে মারাত্মক আঘাত পান তারা। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন অনেক দিন। এখনো দুজনের প্রতিদিন ৩৬০ টাকার ওষুধ লাগে। হাঁটতে হয় ক্র্যাচে ভর দিয়ে। কিন্তু বয়স আর শরীরে ক্ষতের কারণে উপার্জন না থাকায় এখন জীবন-জীবিকা নিয়ে পড়েছেন মহাফাঁপড়ে। গতকাল সোমবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিন ঘটনাস্থলে গেলে এসব তথ্য জানান ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন।

অনেকেই নাম লিখে নিয়ে গেলেও পুনর্বাসনের দেখা নেই বলে ক্ষোভ ঝেড়ে বাদল দত্ত বলেন, ‘সরকার শুধু মরার তালিকা করে, বাঁচার তালিকা করে না। সমর্থ দুই ছেলে মরেছে, বুড়ো বয়সে কে খাওয়াবে আমাদের?’ অর্থাভাবে নতুন ঘর ওঠেনি দুই সন্তানহারা এই দম্পতির। শূন্য পড়ে আছে ধসে যাওয়া ভিটেবাড়ি। থাকছেন ভাড়া বাসায়। বাদলের অন্তিম ইচ্ছা, এককালীন অনুদান পেলে ব্যাংকে জমা রেখে যাবেন, যাতে তার মৃত্যুর পরে স্ত্রী ওই টাকার লভ্যাংশ দিয়ে খেয়েপরে বাঁচতে পারেন।

শুধু বাদল নন, রাঙামাটিতে পাহাড়ধসে নিহত ১২০ জনের স্বজনদের এখনো পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ধসে যাওয়া ঘর নির্মাণ করতে না পারায় নিহতদের পরিবারগুলো কেউই আর আগের বাড়িতে অবস্থান করছেন না। আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবেশী, স্বজন কিংবা ভাড়া বাসায়।

পাহাড়ধসের ৮ মাস পূর্ণ হচ্ছে আজ : গত বছর ১৩ জুন ভারী বর্ষণে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে চার উপজেলাসহ রাঙামাটি সদরে। এতে পাঁচ সেনাসদস্যসহ ১২০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ‘পাহাড়ের দুঃখগাথা’ হয়েই উঠেছে। রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, স্মরণকালের ভয়াবহ ওই পাহাড়ধসে দুই শতাধিক ব্যক্তিকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্গতের তালিকায় ৭৫০ পরিবারের ৩ হাজার ৪০০ লোক স্থান পায়। এ ছাড়া ১ হাজার ২৩১ ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিনষ্ট ও ৯ হাজার ৫৩৭টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব ক্ষতিগ্রস্তের মধ্যে সর্বশেষ ৭৭৬ টন চাল, নগদ ১ কোটি ৬৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, ৭০০ বান্ডিল ঢেউটিন এবং গৃহনির্মাণ ব্যয় মঞ্জুরি বাবদ ১৫ লাখ টাকাসহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। আর ৩ হাজার মানুষের জন্য খোলা হয়েছে ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র। তাদের প্রত্যেক পরিবারকে নগদ ৬ হাজার টাকা, ২ বান্ডিল ঢেউটিন, ৩০ কেজি চাল এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক পরিবারকে নগদ ১ হাজার টাকা ও ২০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়।

বেঁচে যাওয়া শিশুর তথ্য নেই : টানা বর্ষণে পাহাড়ধসে মাটি চাপা পড়ে ঘরের ওপর। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মৃত্যু উপত্যকায় রূপ নেয় পর্যটন শহর রাঙামাটি। কিন্তু নিহতদের পরিবারের সংখ্যা কিংবা সদস্যসংখ্যা যেমন কেউ রাখেনি, তেমনি বয়স্ক, বিধবা, এতিম ও পঙ্গুদের তালিকাও করেনি কেউ। এমনকি পাহাড়ধসে স্বজন হারানো শিশুদের খবরও রাখেনি কেউ। তারা সংখ্যায় কত, তা-ও জানে না সরকারি কর্তৃপক্ষ।

জেলা প্রশাসন, ত্রাণ ও দুর্যোগ শাখা, রেড ক্রিসেন্ট, পৌরসভা, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষও এসব তথ্য সংরক্ষণ করেনি। রাঙামাটির অতিরিক্তি জেলা প্রশাসক ড. প্রকাশ কান্তি চৌধুরী জানান, এভাবে আলাদা করে তালিকা করা হয়নি। এর বাইরে বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাও করেনি এমন তালিকা। ফলে সাময়িক ত্রাণ তৎপরতায় উৎসাহ দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে সব মহলই যেন বিষয়টি ভুলতে বসেছে।

শহরের রূপনগর এলাকায় নিহত দম্পতির সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া দুই কন্যাশিশু সুমাইয়া (২) ও মীমের (৭) ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয় রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। গণমাধ্যমের বদৌলতে শুধু এই দুই শিশুর নামই জানেন দেশবাসী। বাকিদের নাম শুধু স্বজনরাই জানেন।

কেমন আছে স্বজনহারানো শিশুরা : শহরের রূপনগর এলাকায় একঘরে মামা দরবেশ আলীসহ (৩৫) সালাহ উদ্দিন (৩২) ও রাহিমা বেগম (২৫) দম্পতি মারা যান। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় তাদের দুই কন্যাসন্তান দুই বছরের সুমাইয়া আর সাত বছরের মীম। এ দুই শিশুর ভরণপোষণের জন্য মাসিক দশ হাজার টাকা বরাদ্দের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন রাঙামাটি জেলা প্রশাসক। কাঠমিস্ত্রি চাচা মো. কাউছার বাসাভাড়া নিয়ে তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন।

কিনামনি পাড়ার কণ্ঠীসোনা চাকমার সঙ্গে মেয়ে সান্তনা চাকমা (৯) মারা যায়। আহত হয়ে প্রাণে বেঁচে যায় বড় মেয়ে লতিকা চাকমা (১৩)। স্বামী কল্পরঞ্জন চাকমার সঙ্গে তার ঠাঁই হয়েছে ভাড়া বাসায়। প্রতিবেশী শীলা চাকমা (৩০) জানান, বাড়ি নির্মাণের টাকা না থাকায় খালি পড়ে আছে ভিটেবাড়ি। উডন্তি আদামের মায়াধন চাকমার দুই সন্তানের মধ্যে ছেলে প্রিয়তোষ চাকমা (১২) মারা যায়। আর বেঁচে যাওয়া মেয়ে শান্তাকি চাকমাকে (৬) নিয়ে অন্যত্র বাস করছেন তিনি।

মন্তলা এলাকায় অন্তঃস্বত্ত্বা মধুমিতা চাকমার সঙ্গে মেয়ে জুরি চাকমা (১০) মারা গেলেও বেঁচে যাওয়া মেয়ে সুমেদা চাকমা (১৪) রয়েছে বাবার সঙ্গে। নিজের ঘরে ফিরতে না পারা আর আয়রোজগার না থাকায় এসব পরিবারে জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। দুই সন্তান তেমা মারমা (১২) ও ক্যাথোয়াইচিং মারমাসহ (৭) নিহত হন কাউখালীর বেতবুনিয়া রাউজান ঘোনা গ্রামের অংচিং মারমা (৫২) ও আশেমা মারমা (৩৪) দম্পতি। বেঁচে যাওয়া দুই কন্যাশিশু আনুমা মারমা (১৫) ও উয়াইনচিমা মারমা (১১) এখন প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। সুগারমিলের দিদারুল আলমের স্ত্রী লায়লা বেগম (৩০) মাটিচাপায় নিহত হলে তার ছেলে মহিউদ্দিন (১১) শিশুসদনে ও সাত বছরের রিফাতের আশ্রয় জোটে খালার বাড়িতে। এসব শিশুর পড়ালেখা ও ভবিষ্যৎ অনেকটাই অনিশ্চিত বলে দাবি করেছেন স্বজনরা। মানসিক ও শাররিক স্বাস্থ্য বিকাশে নেওয়া হয়নি বিশেষ কোনো ব্যবস্থাও।

ঝরেছে ৫২ শিশুর প্রাণ : পাহাড়ধসে রাঙামাটি সদরে নিহত ৭৩ জনের মধ্যে ২৫ জনই শিশু। নিহত হয়েছেন ২১ নারীও। আর চার উপজেলাসহ রাঙামাটিতে ২৩ পরিবারের ৫২ শিশুর প্রাণ ঝরেছে অকালেই। শুধু তা-ই নয়, কোনো শিশুই বেঁচে নেই আটটি পরিবারে। মা কিংবা বাবার সঙ্গেই অকাল মৃত্যু হয়েছে তাদের। ফলে অসময়ে চলে যাওয়া এসব শিশুর নানা স্মৃতি তাড়া করে ফিরছে পরিবারের বেঁচে যাওয়া স্বজনদের।

ভেদভেদী এলাকায় রূপালী চাকমার সঙ্গে দুই মেয়ে জুঁই মনি চাকমা (১৪) ও জুমজুমি চাকমা (৪), রূপালীর বোন সোনালী চাকমার সঙ্গে একমাত্র ছেলে অমিয় চাকমা (১০) মারা যায়। কিনামনি পাড়ার কলেজ শিক্ষার্থী বোন বিপুলি চাকমাসহ সুজিতা চাকমার সঙ্গে মারা যায় ছেলে সৌম্য চাকমা (৫)।

সনাতন পাড়ার লিটন মল্লিক ও চুমকী মল্লিকের সঙ্গে প্রাণ হারায় তাদের একমাত্র সন্তান আইয়ুশ মল্লিক (২)। নতুনপাড়ার নবী হোসেন-হাজেরা বেগম দম্পতির সঙ্গে মেয়ে রুনা আক্তার (১৫) ও ছেলে সোহাগ (১৪) এবং রুমা আক্তারের সঙ্গে নিহত হয় তার মেয়ে নুরী আক্তার (৩)। ভেদভেদী এলাকার জিয়াউর রহমান ও সবুরি বেগম দম্পতির সঙ্গে নিহত হয় মেয়ে বৃষ্টি (১০)। কাবুক্ক্যাপাড়া বালুখালীর সীমা চাকমার সঙ্গে দুই সন্তান সুজন চাকমা (৭) ও বন্যা চাকমা (৩) নিহত হয়।

এ ছাড়া নিহত অন্য শিশুরা হলো নাইমা আক্তার (৬), ফেন্সী চাকমা (৪), সুকেন চাকমা (১২), সূচনা চাকমা (১৪), তৃষা মণি চাকমা (১৬), জয়েস চাকমা (৯), সুস্মিতা চাকমা (৫), আজিজা আক্তার (৫), মো. মুজিবুর রহমান (১২), মো. শাহজাহান (৯) ও ১৪ মাস বয়সী জিসান। কাউখালীতে নিহত ২১ জনের মধ্যে চার পরিবারের পাঁচ শিশু রয়েছে। তারা হলো উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের জুনুমাছড়া এলাকার অমর শান্তি চাকমার মেয়ে বৈশাখী চাকমা (৭), বাকছড়ি এলাকার ফুলমোহন চাকমা ও মণিমালা চাকমার মেয়ে বৃষ মণি চাকমা (১১), হাজাছড়ি গ্রামের কমলধন চাকমার ছেলে সোহেল চাকমা (৭), বেতবুনিয়া ইউনিয়নের রাউজান ঘোনা গ্রামের অংচিং মারমা ও আশেমা মারমা দম্পতির দুই সন্তান তেমা মারমা (১২) ও ছেলে ক্যাথোয়াইচিং মারমা (৭)।

কাপ্তাইয়ে নিহত ১৮ জনের মধ্যে শিশু রয়েছে সাতজন। তারা হলো নোমান (৫), রমজান আলী (৫), নিতুই মার্মা (৬), রোহান (৭), আই প্রু মারমা (১৫), চিংমিউ মারমা (১৫) ও প্রানু চিং মারমা (৬)। জুড়াছড়িতে নিহত ছয়জনের মধ্যে চারজনই শিশু। তারা হলো বিশ্বমণি চাকমা (১০), হ্যাপী তঞ্চঙ্গ্যা (৭), চিয়ং চাকমা (১৭) ও চিবে চোগা চাকমা (১৬)।

পুনর্বাসন মেলেনি : নতুন পাড়া এলাকার চাদোকানী মৃদুল কান্তি বড়–য়া (৫০) ও আব্দুল হাইয়ের স্ত্রী রমিজা বেগম (৩৫) বলেন, আট মাস ধরে ভাড়া বাসায় আছি। সরকারি কোনো সহযোগিতা পাইনি। একই ঘরে পরিবারের সাত সদস্য হারানো নবী হোসেনের ছেলে সুমন (২৩) ও জামাতা সোহেল (২৫) মারাত্মক আহত হন।

গতকাল সোমবার দুপুরে ভেদভেদীর ভাড়া বাসায় মীম সুমাইয়ার চাচা মো. কাউছারের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসনের দেওয়া টাকার একটা বড় অংশই ঘরভাড়ায় চলে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসক একটুকরা জমিতে ঘর নির্মাণের অনুমতি দিলে বেঁচে যেতাম। তার বিধবা মা সুফিয়া খাতুন (৫২) জানালেন, কোনো ধরনের ভাতাও পান না।

পুনর্বাসন কতদূর : দ্বিতীয় দফায় গত ৩০ জানুয়ারি রাঙামাটিতে পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠিত সংসদীয় উপকমিটি। ক্ষতিগ্রস্তদের সাময়িক পুনর্বাসনের আওতায় আনতে সরকারকে সুপারিশ করবে এ কমিটি। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনকে সাময়িক পুনর্বাসনের জন্য একটি সংসদীয় উপকমিটি গঠন করে সরকার।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মো. মানজারুল মান্নান বলেন, এই মুহূর্তে পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। কারণ শহরে ওই পরিমাণে জায়গা নেই, যেখানে তাদের পুনর্বাসন করা যাবে। তা ছাড়া স্বল্প আয়ের এসব মানুষের শহরকেন্দ্রিক আয়রোজগার থাকায় তারা দূরে পুনর্বাসনে রাজি হচ্ছে না।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে