খোদ রাজধানীতেই দখলের অস্ত্র ‘লাল সালু’

  রেজাউল রেজা

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৯:১৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর অমর সৃষ্টি ‘লাল সালু’। শিক্ষার আলোহীন অজপাড়াগাঁয়ে ধর্মীয় স্পর্শকাতরতাকে পুঁজি করে ব্যক্তির বৈষয়িক প্রতিষ্ঠা এবং সমাজে প্রভাব বিস্তারের সুচতুর চেষ্টা বহুল সমাদৃত এ উপন্যাসের উপজীব্য। এর পর পেরিয়ে গেছে অনেক কাল। এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও লেগেছে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া; অনেকটাই উবে গেছে অন্ধকারাচ্ছন্ন কুসংস্কার। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি, এই যুগেও খোদ রাজধানীতেই ধর্মীয় স্পর্শকাতরতাকে পুঁজি করে চলছে দখলবাজি এবং এখানেও অস্ত্র সেই লাল সালুই।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৪৬ নম্বর ওয়ার্ড। এ ওয়ার্ডের মোট জনসংখ্যা লক্ষাধিক আর ভোটারের সংখ্যা ২৩ সহস্রাধিক। ওয়ার্ডটির প্রান্ত ছুঁয়ে চলে গেছে বুড়িগঙ্গা বেড়িবাঁধ। আর এ বাঁধের ওপর গড়ে উঠেছে একটি মাজারÑ ‘গঙ্গা শাহর মাজার’। সম্প্রতি ‘গায়েবী’ এ মাজারটি পাকা করা হচ্ছে। এ জন্য প্রকাশ্যে তোলা হচ্ছে চাঁদা। এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, সন্ধ্যার পর এ মাজারকে ঘিরে গাঁজার আসর বসে। রাত যত বাড়ে, আসরও তত ভারী হতে থাকে। এটি মাদকের স্পটও বটে। এখান থেকেই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে নানা মাদক।

মিল ব্যারাক এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা শামসুদ্দিন বাহার বলেন, ‘আগে ছোট্ট ছিল মাজার ঘরটি। আস্তে আস্তে বড় হইছে। এইখানে আরও মাজার আছে। এইগুলা চালানোর দলও আছে। এরাই করতেছে এইগুলা।’ সরেজমিন ঘুরে দেখা গেল, পাশেই আছে আরও দুটি মাজার। বড় মাজারটি হলো মোতালেব শাহ মাজার। মাজারগুলো ঘিরে অসংখ্য বহিরাগত ও ভাসমান লোকজনের অবস্থান থাকে এখানে। মাজার নিয়ে এলাকাবাসীর রয়েছে অনেক অভিযোগ। স্থানীয় আবেদিন সরদার বলেন, ‘বহু দূরদুরান্ত থেইকা বহু মুরিদ আসে এইখানে। এইখানেই থাকে। আর রাতদিন চলে গাঁজা সেবন। প্রায়ই বড় অনুষ্ঠান হয় এই মাজারগুলায়। গঙ্গা শাহ মাজারে এখনো গেলে দেখবেন অনুষ্ঠানের আয়োজন চলতেছে। রাত বাড়লে ধোঁয়াও বাড়ে।’

আরেক বাসিন্দা সিরাজুল আলম বলেন, মাজার যারা চালায় তারা অনেক সঙ্গবদ্ধ। তাদের দল অনেক বড়। তাই কেউ কিছু বলে না। তারাই মাজারের জন্য চাঁদা তোলে।

এসব মাজার আর ভাসমান লোকজনের আড়ালে চলছে সিদ্ধিসেবন ও বাণিজ্য। এখান থেকেই মাদক ছড়াচ্ছে পুরো এলাকায়। এলাকার বাচ্চারা পর্যন্ত জানে তা। অথচ ‘মাজার’ বলে প্রশাসনও আছে নীরব। স্বয়ং কাউন্সিলরও বিষয়টি ‘স্পর্শকাতর’ বলে এড়িয়ে যান প্রসঙ্গ। আর নীরব প্রশ্রয়ে বাঁধের ওপর দালান করছে এসব চক্র।

মিল ব্যারাক অ্যান্ড পুলিশ লাইন, ক্যাশব ব্যানার্জি রোডের আংশিক, অক্ষয় দাস লেন, শাখাঁরীনগর লেন, হরিচরণ রায় রোডের আংশিক, আলমগঞ্জ রোড, ঢালকানগর লেনের আংশিক, সতীশ সরকার রোড ও কালিচরণ শাহা রোড নিয়ে গঠিত ডিএসসিসির ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বদিকে গে-ারিয়া রেলওয়ে স্টেশন, পশ্চিমে সূত্রাপুর থানা, উত্তরে এস কে দাস রোড এবং দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা বেড়িবাঁধ। এ বেড়িবাঁধের ওপরই গঙ্গা শাহর মাজার।

৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের একমাত্র খালটিও চলে যাচ্ছে দখলদারদের ভোগে। ডিএসসিসির অন্যতম খাল ‘ধোলাইখালের’ খালের বড় অংশ বর্তমানে বক্স কালভার্টের নিচে। আর কেশব ব্যানার্জি রোডের পাশে রয়েছে এর উন্মুক্ত অংশ। এ উন্মুক্ত অংশের দুই ধারেই ময়লা ফেলে খাল ভরাট করছে এক শ্রেণির কুচক্রী ক্ষমতাধররা। ইতোমধ্যে খালের প্রস্থ অর্ধেক হয়ে গেছে প্রায়। খালে ময়লা ফেলা বর্তমানে বন্ধ আছে বলে কাউন্সিলর জানালেও এখনো ফেলা হচ্ছে ময়লা। খালে ফেলা আবর্জনার বড় অংশ আসছে বাজার থেকে।

খালের এক পাশ ভরাট করে বসানো হয়েছে বাজার। সরেজমিন বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারের প্রায় সব দোকানদারই নারী। কথা বলে জানা গেল ভাড়াও তোলা হয় তাদের কাছ থেকে। তবে কে বা কারা তোলে, সে বিষয়ে মুখ খোলেনি কেউই। কেশব ব্যানার্জি রোডের বাসিন্দা ইসমাইল সরদার বলেন, যত ভরাট হয়, তত দোকান বাড়ে। তাই থেমে নেই ভরাট। এভাবেই চলছে।

এদিকে রাস্তার ওপর এসটিএসের সামনেও অবৈধভাবে চলে বিশাল বাজার। এখান থেকেও তোলা হয় টাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাশের এক দোকানদার জানান, আজকে মেয়র আসছে এলাকায়। বাজার পাবেন না ভাই।

পরিচর্যার অভাবে এমনিতেই বক্স কালভার্টের নিচে খালের প্রবাহ বর্তমানে বন্ধ প্রায়। তার ওপর খালের উন্মুক্ত এ অংশটি ক্রমেই সরু হয়ে আসছে খাল ডাকাতদের দাপটে।

ওয়ার্ডের রাস্তাঘাটের অবস্থাও খারাপ। বাঘাবাড়ি, সতীশ সরকার লেন, ঢালকানগরসহ অনেক এলাকার রাস্তায় খানাখন্দে ভরা। যাতায়াতে আছে ভোগান্তি। মিল ব্যারাক এলাকার অনেকগুলো রাস্তা পুরোটা দখল করে আছে ট্রাক ও কনটেইনার ডিপো।

এদিকে ভাসমান ইয়াবা ব্যবসার অন্যতম স্পট ফজলুল হক মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ গলির এখানে সেখানে। এ গলিতে নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া যুবতী-তরুণীরা পা মাড়ান না বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ার ভয়ে। এদিকে জহির রায়হান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নিচতলায় এলাকাবাসীর জন্য একটি পাঠাগার থাকলেও অজ্ঞাত কারণে এটি বন্ধ। কবে থেকে বন্ধ, সেটিও ভুলে গেছেন এলাকাবাসী। লাইব্রেরি বন্ধের কারণ জানতে চাইলে ওয়ার্ড কাউন্সিলর যৌক্তিক উত্তর দিতে পারেননি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
close