অনুমোদন পায়নি বাঘ সুরক্ষার মহাপরিকল্পনা

  মো. মাহফুজুর রহমান

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের অহংকার সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুরক্ষায় ‘বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান’ নামে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনাটি মন্ত্রণালয়ের লালফিতায় আটকা পড়ে আছে। গত বছরের মাঝামাঝি ১০ বছর মেয়াদি এ পরিকল্পনা অনুমোদনের জন্য বন বিভাগ কর্তৃক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এমন অবস্থায় গতকাল থেকে শুরু হয়েছে ক্যামেরা ফাঁদ পেতে বাঘ গণনার কাজ। চলতি ২০১৮ সাল থেকে এই মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখনো মন্ত্রণালয় তা অনুমোদনই করেনি বলে স্বীকার করেছেন বন বিভাগের কর্তারা। সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিপর্যায়ের বিভিন্ন জরিপ বলছেÑ ৪৩ বছরে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।

খুলনা জেলা প্রশাসক মো. আমিন-উল আহসান গতকাল আমাদের সময়কে জানান, বাঘ ও হরিণ শিকারিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির জন্য বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাঘ সুরক্ষায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে কর্মপরিকল্পনা তৈরির পাশাপাশি তা সঠিকভাবে বাস্তবায়নও খুবই জরুরি বলে মনে করেন এ কর্মকর্তা।

খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) বশির আল মামুন গতকাল আমাদের সময়কে এ বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আশা করছি শিগগির প্রকল্পটি অনুমোদন পাবে। বাঘের হুমকি ও চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি বাঘ রক্ষার নানা পদক্ষেপ এ কর্মপরিকল্পনায় রয়েছে বলে জানান তিনি।

বাঘ বাচুক বাঘের মতো। বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জীবনচক্র এমনই হওয়া উচিত বলে মনে করেন প্রাণী ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। তবে তাদের এই তত্ত্ব এখন আর কাজে আসছে না। বন বিভাগের জরিপে ২০০৪ সালে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৪০। একই সংস্থার জরিপে ২০১৫ সালে বাঘের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৬। বেসরকারি বিভিন্ন জরিপেও প্রায় একই রকম তথ্য উঠে এসেছে। তবে বিভিন্ন জরিপে যেভাবেই বলা হোক না কেন, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। অথচ বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির দিক দিয়ে বিশ্বের অন্য দেশের চিত্র ইতিবাচক। বিশ্ব বন্যপ্রাণী তহবিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সালে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২০০, আর ২০১৭ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৯৯৬। বাঘের সংখ্যা বেড়েছে রাশিয়া, ভারত ও নেপালেও।

সুন্দরবন একাডেমির পরিচালক পরিবেশকর্মী ফারুক আহমেদ গতকাল আমাদের সময়কে জানান, সুন্দরবনের বাঘ মোটেও ভালো নেই। কারণ বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারের উদ্দেশ্যে প্রতিনিয়ত চোরা শিকারিরা বিষ টোপ দিয়ে এবং গুলি করে বাঘ হত্যা করছে। খাদ্যাভাবসহ বিভিন্ন কারণে লোকালয়ে আসা বাঘ গ্রামবাসী পিটিয়ে হত্যা করে। বনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল করায় বাঘ নদী পার হয়ে বনের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঠিকমতো যেতে পারছে না। মিঠা পানির প্রবাহ কমে নদীতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঘের জীবনচক্রে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বনে বাঘের আবাসস্থল যেমন কমছে, তেমনি বাঘের শিকার প্রাণীর সংখ্যাও হ্রাস পাচ্ছে। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দূষণের কারণে হুমকিতে বাঘ। বাঘ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে এটি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, মন্তব্য করেন তিনি। এ অবস্থায় মহাপরিকল্পনা দ্রুত কার্যকর করার পরামর্শ দেন তিনি।

এদিকে খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আরও জানান, বাঘ রক্ষায় ২০১৮ সাল থেকে ১০ বছরের জন্য প্রণীত এই কর্মপরিকল্পনায় বাঘের হুমকি ও বাঘ রক্ষার চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি থাকবে করণীয় দিকগুলো। বাঘের প্রজনন বৃদ্ধি, বাঘের প্রধান খাবার চিত্রা হরিণ রক্ষা, বাঘের সংখ্যা যাতে কোনোভাবে না কমে, সেই বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

জানা গেছে, এই কর্মপরিকল্পনা সফল করতে ইতোমধ্যে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ, সাতক্ষীরা ও খুলনা রেঞ্জ এবং শরণখোলা রেঞ্জে কর্মশালা করা হয়েছে। এ ছাড়া বন বিভাগের কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বাঘ বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় প্রশাসন, র্যাব, পুলিশ, সাংবাদিক, আইনজীবী, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর লোককে নিয়ে খুলনায় আঞ্চলিক পর্যায়ের কর্মশালা সম্পন্ন করে ঢাকায় আরও দুটি কর্মশালা করা হয়। এর পর মহাপরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

তবে বাঘ রক্ষায় এর আগে ২০০৯-২০১৭ সালের জন্য যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, এর বেশ কিছু বিষয় বন বিভাগ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এবার সেই বিষয়গুলো বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আগের কর্মপরিকল্পনার মধ্যে সঠিকভাবে মনিটরিং এবং বন বিভাগের কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ ছিল। কিন্তু তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায়নি। পরিবর্তিত কর্মপরিকল্পনায় এই বিষয়গুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাঘ রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে কীভাবে আরও সম্পৃক্ত করা যায় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, জানান ডিএফও।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে