চট্টগ্রামে তিন মামলায় আসামি ২০

প্রশ্নফাঁসকারীরা অনেক সক্রিয় ও শক্তিশালী

  চট্টগ্রাম ব্যুরো

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে একাধিক গ্রুপ জড়িত। আবার এদের আছে অনেক উপগ্রুপ। তারা সবসময় নামে-বেনামে ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খুলে তাদের জাল বিস্তার করে। প্রতিটি গ্রুপে আছে কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার সদস্য। তাদের সবারই লক্ষ্য হচ্ছে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা। কারণ একটাইÑ প্রশ্নপত্র বিক্রি। গত মঙ্গলবার এসএসসি পরীক্ষা শুরুর আগে মোবাইল ফোন ও ট্যাবে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রসহ গ্রেপ্তার ছাত্ররা এসব তথ্য দিয়েছে। দলগুলোর পেছনে যে অদৃশ্য লোক প্রশ্নপত্র ফাঁস করে চলেছে, তাদের টিকিটিও ধরতে পারেনি প্রশাসন।

তবে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, গত মঙ্গলবার যেসব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র পাওয়া গেছে তাদের থেকে সাদা কাগজে লিখিত জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক শিক্ষার্থী কীভাবে প্রশ্নপত্র পেয়েছে তা উল্লেখ করেছে। তাদের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। খুব শিগগির মূল হোতাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, আটক শিক্ষার্থীরা তাদের স্বীকারোক্তিতে লিখেছেÑ ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে গত মঙ্গলবার পরীক্ষা শুরুর এক ঘণ্টা আগে পদার্থ বিজ্ঞানের প্রশ্নপত্র পায়। যেসব গ্রুপ থেকে প্রশ্নপত্র পেয়েছে সেগুলো হলÑ এসএসসি এইচএসসি ইউনিভারসিটি অল এক্সাম আউট কোয়েশ্চেন অ্যান্ড রেজাল্ট চেঞ্জ ইনফরমেশন বিডি, অল কোয়েশ্চেন আউট বিডি, সিটিজি সেল বাজার, সিএনএনডি ও আইডিয়াল স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের একাধিক গ্রুপ।

ছাত্ররা লিখিতভাবে আরও জানায়, এসব গ্রুপ থেকে ৫০০Ñ১০০০ টাকার বিনিময়ে তারা প্রশ্নপত্র কেনে। এর মধ্যে এক শিক্ষার্থী এসএসসি এইচএসসি ইউনিভারসিটি অল এক্সাম আউট কোয়েশ্চেন অ্যান্ড রেজাল্ট চেঞ্জ ইনফরমেশন বিডি নামের ম্যাসেঞ্জার গ্রুপের কাছে প্রশ্ন চায়। পরে ওই পেজের অ্যাডমিন তাকে জানায়, আমরা সব বোর্ডের প্রশ্ন দিয়ে থাকি। একশ ভাগ কমন আসবে। আপনি যদি মেইন প্রশ্ন পেতে চান তাহলে ০১৭৩০২৩১৯৯৬ নম্বরে এক হাজার টাকা বিকাশ করতে হবে। পরে ওই শিক্ষার্থী ৬০০ টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র কেনে। এভাবে একাধিক ফেসবুক আইডি থেকে প্রশ্নপত্র পায় শিক্ষার্থীরা। প্রশ্নপত্র পাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা নিজ বন্ধুদের হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুকে পাঠিয়ে দেয়। পরে তারা প্রশ্নপত্র সমাধান করে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করতে চেয়েছিল; কিন্তু এর আগেই তাদের আটক করা হয়।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল হোতাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মুরাদ আলী আমাদের সময়কে বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যেসব ডিভাইসে এ তথ্য পেয়েছি আর তাদের লিখিত স্বীকারোক্তিসহ চট্টগ্রাম নগর পুলিশকে হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা ফেসবুক গ্রুপ ও মূল হোতাকে শনাক্ত করার কাজ করছে।

মঙ্গলবার রাতে নগরীর কোতোয়ালি, খুলশী ও ফটিকছড়ি উপজেলার ভুজপুর থানায় পরীক্ষার কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে তিনটি মামলা করে। এতে আসামি করা হয় ২০ জনকে। পরীক্ষার কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ মামলাগুলো দায়ের করে।

শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে অভিভাবকরা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। লিলি ইসলাম নামের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আলী আহমদ জানান, যারা প্রশ্ন ফাঁস করছে প্রশাসন তাদের কিছুই করতে পারছে না। যারা ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেছে তাদের বিচার করছে। প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে পরীক্ষার্থীরা অপরাধ করেছে; কিন্তু তার চেয়ে বেশি অপরাধী তারা, যারা এই প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে। আমরা প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার চাই। এভাবে আটক শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের শিক্ষাজীবন নষ্ট না করার অনুরোধ করেন তিনি।

৩৩ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রফেসর শওকত আলম বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন আইনগত ব্যবস্থা নেবে আর আমরা তাদেরকে কেন্দ্র সচিবের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বহিষ্কার করেছি।

বাওয়া স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারা বেগম বলেন, আলোচিত প্রশ্নফাঁসের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের উচ্চাকাক্সক্ষাই অনেক ক্ষেত্রে দায়ী। শিক্ষার্থী যা শিখবে তাই লিখবে। তাতে যা হবে তাই সত্য। এর বাইরে সত্য খুঁজতে গেলে বিপদ ঘটবে। বাবা-মায়ের চাপিয়ে দেওয়া মনোভাবের কারণে অথবা রাতরাতি আকাশচুম্বী ফল পেতে উৎসাহিত করলেও এমন হয়।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সিকান্দার খান আমাদের সময়কে বলেন, প্রশ্নফাঁসের কারণে আসল মেধাবীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। যতদ্রুত সম্ভব এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

১১ এসএসসি পরীক্ষার্থীর জামিন

এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে গ্রেপ্তার ১১ পরীক্ষার্থীকে জামিন দিয়েছে আদালত। গতকাল বুধবার চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ ও শিশু আদালতের বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস তাদের জামিন মঞ্জুর করেন। কোতোয়ালি থানার মামলায় সাত ছাত্র ও দুই ছাত্রীসহ নয়জনকে এবং খুলশী থানার মামলায় দুই ছাত্রীকে জামিন দেওয়া হয়। এ ছাড়া কোতোয়ালি থানার মামলার আসামি আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষিকার জামিন আবেদনের শুনানি আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে