কিছুই ফেলনা নয়

দগ্ধদের ক্ষতস্থান সেরে উঠবে ‘প্রসবের ফুলে’

  হাসান আল জাভেদ

২২ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০১৮, ১০:৫৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানবশিশুকে পেটের মধ্যে জড়িয়ে রাখে ‘অ্যামনিয়ন আলোগ্রাফট’। এটিকে বলা হয় ‘ফুল’। এই ফুল সন্তান প্রসবের পর ফেলা দেওয়া হয়। অথচ এই ফুলের আবরণই অ্যাসিড কিংবা আগুনে পোড়া ব্যক্তির ক্ষতস্থানে প্রতিস্থাপন করলে তারা সুস্থ জীবন পেতে পারেন। প্রতিস্থাপনের এই কাজ করে যাচ্ছে ইউনিটগুলো।

জানা গেছে, অ্যামনিয়ন আলোগ্রাফট বা ফুল সংগ্রহ থেকে শুরু করে আটটি ধাপে প্রক্রিয়াকরণের এই কঠিন কাজটি করছে পরমাণু শক্তি কমিশনের ‘ইনস্টিটিউট অব টিস্যু ব্যাংকিং অ্যান্ড বায়োটেমিরিয়াল রিসার্চ ইউনিট’। রাজধানীর উপকণ্ঠ সাভারের গণকবাড়িতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি এ মুহূর্তে আজিমপুর ম্যাটারনিটি হাসপাতালসহ আরও একটি নবজাতক চিকিৎসালয় থেকে এই সফট টিস্যু সংগ্রহ করছে।

২০০৩ সালে ‘টিস্যু ব্যাংকিং ও বায়োটেমিরিয়াল রিসার্চ ইউনিট (টিবিবিআরইউ)’ চালু করা হয়। ২০১৭ সালে নবরূপে স্বতন্ত্র এই ইউনিটটিকে ইনস্টিটিউট হিসেবে উন্নীত করার পর অ্যামনিয়ন আলোগ্রাফট সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের কাজ প্রসারিত হয়। তবে টিস্যু প্রতিস্থাপনের কাজ করা হচ্ছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শেরেবাংলানগর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও লালমাটিয়ার বেসরকারি সিটি হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে।

টিবিবিআরইউ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. এসএম আসাদুজ্জামান আমাদের সময়কে বলেন, অ্যামনিয়ন আলোগ্রাফট নামের পাতলা টিস্যুটি অত্যন্ত সফট থাকলেও সাধারণভাবে বলতে গেলে এর কার্যকারিতা লোহার আবরণের মতো। যে কারণে মায়েরা গর্ভধারণের পর তার অনাগত সন্তান দীর্ঘ সময়ে সুরক্ষিত থাকে। সন্তান জন্মদানের পর আমরা এই টিস্যু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংগ্রহের পর কয়েকটি ধাপে কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রণের পর বার্ন ইউনিটগুলোয় সরবরাহ করছি।

তিনি বলেন, সংকটাপন্ন একজন দগ্ধ ব্যক্তির পোড়া অংশে এই টিস্যু প্রতিস্থাপন করলে তা উচ্ছিষ্টের বদলে সর্বোৎকৃষ্ট চিকিৎসা হিসেবে গণ্য হয়। তাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একান্ত প্রচেষ্টায় আমরা এই কাজটি সম্প্রসারিত করছি।

অ্যামনিয়ন আলোগ্রাফট প্রক্রিয়াকরণ ছাড়াও দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের হাড় সংগ্রহ করে বিশাল হাড় ব্যাংক গড়ে তোলা হয়েছে এখানে। এর মধ্যে দুর্ঘটনার কবলে পোড়া ব্যক্তির শরীর থেকে কেটে ফেলা বড় বড় হাড় সংগ্রহ করে অন্যের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে জাতীয় অর্থোপেডিকস ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানসহ (পঙ্গু হাসপাতাল) অন্যান্য হাসপাতালে।

টিবিবিআরইউর বিজ্ঞানীরা জানান, এখানে দুধরনের মানবটিস্যু সংরক্ষণ করা হয়। অটোগ্রাফ বা কোমড়ের হাড় এবং অ্যালোগ্রাফ বা পায়ের নখ থেকে শুরু করে মাথার খুলি পর্যন্ত সব ধরনের হাড়। চিকিৎসা সুবিধার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে জীবিত মানুষের শরীর থেকে ফেলে দেওয়া এসব হাড় সংগ্রহের পর সাভারের ল্যাবে আনা হয়। মান নিশ্চিতের পর রেডিয়েশনের মাধ্যমে জীবাণুুমুক্ত করা হয়। এর পর আরও কয়েকটি ধাপে প্রক্রিয়াকরণের পর সংগৃহীত বড় হাড়গুলো কেটে কেটে তিনটি আকারের হাড়ের চিপস বানানো হয়।

দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তির শরীরের কোনো অংশ ভেঙে গেলে তুলণামূলক বড় আকারের হাড়গুলো সেখানে প্রতিস্থাপন করা হয়। মাঝারি আকারের হাড়গুলো ক্ষত অংশে। আর সবচেয়ে ছোট আকারের মিহি দানাগুলো অনেকটা ঢালাইয়ের মাধ্যমে দাঁত বা চোয়ালে প্রতিস্থাপন করা হয়।

ড. আসাদুজ্জামান বলেন, দুর্ঘটনা, রোগ বা ক্যারসারের কারণে একজন রোগীর মাথায় অপারেশন হলে মাথার খুলি তোলার পর তা তাৎক্ষণিকভাবে কিন্তু বসানো হয় না। কারণ খুলির জীবাণুমুক্ত করাটা অত্যন্ত জরুরি। জীবাণুমুক্তকরণসহ আনুষঙ্গিক কাজে একজন মানুষের মাথার খুলি গড়ে ২৫ দিন এখানে রাখতে হয়।

টিবিবিআরইউ সূত্র জানায়, ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে এখানে ৩৬ হাজার ২৩৬টি অ্যামনিয়ন আলোগ্রাফট বা ফুল এবং ৯২ হাজার ৬১৮টি হাড় প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৮২৬টি অ্যামনিয়ন আলোগ্রাফট এবং ৮৮ হাজার ১২৫টি হাড় দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সরবরাহ করা হয়। এতে গত ৯ বছরে ৫ হাজার ৪০০ মানুষ পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে