সঞ্চয়পত্রে অতিরিক্ত বিনিয়োগ

দেনা বাড়ছে সরকারের বাজেটেও চাপ পড়বে

  আবু আলী

১০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৮, ০৯:১৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে নামিয়ে এনে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু সঞ্চয়পত্রে এখনো ১১ শতাংশের বেশি সুদহার। ফলে আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা রাখার বদলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন বলে মনে করেন ব্যাংকাররা। তারা ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ কার্যকর করতে সঞ্চয়পত্রের সুদহার নামিয়ে আনতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বেশকিছু দিন ধরেই সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানোর দাবি করে আসছেন। তাদের মতে, সঞ্চয়পত্রে জনগণের অতিরিক্ত বিনিয়োগের কারণে সরকারের দায়দেনা বেড়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে। তাই এ খাতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহে সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানোর পক্ষে অর্থনীতিবিদরা। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার সঞ্চয়পত্রে সুদহার না কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানান, সঞ্চয়পত্রের সুদহার ব্যাংকে আমানতের সুদহারের চেয়ে অনেক বেশি। এটা কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে আনার জন্য অর্থ বিভাগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। কমিটি দুমাসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেবে। তার পরিপ্রেক্ষিতে আগামী নির্বাচনের পরে সঞ্চয়পত্রের সুদহার যৌক্তিকীকরণ করা হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক ধরনের সেভিংস ইনস্ট্রমেন্ট বা সঞ্চয় প্রকল্প আছে। এগুলোর সংখ্যা কমানোর বিষয়েও কমিটি সুপারিশ করবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে সরকারের বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের উৎসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল হলো সঞ্চয়পত্র থেকে অর্থায়ন। সঞ্চয়পত্র বিক্রির এ গতিধারা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে এ খাত থেকে ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। এর ফলে সুদ বাবদ সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে, যা স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমিয়ে আনার পক্ষে। সংগঠনটি বলছে, ব্যাংকের সুদহার অনেক কম। পুঁজিবাজারের অবস্থা ভালো নয়। তাই মানুষ সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে। এ খাতে সরকারের আয় বাড়ছে, সঙ্গে সুদ ব্যয়ও বাড়ছে। তাই সরকারের উচিত কম খরচের ঋণ নেওয়া। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্র সুদহার কিছুটা কমিয়ে আনার সময় এখন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংক থেকে কম সুদে ঋণ নিয়ে সেই টাকার একটা বড় অংশ শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগ না করে অধিক মুনাফার আশায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে ব্যাংক ঋণের অর্থের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না; অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রের সুদ বেশি হওয়ায় সরকারের বাজেট ব্যয় বাড়ছে, যা বাজেট ঘাটতি বাড়ানোর পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করছে। এর আগে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের (বিএবি) নেতারাও সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোর দাবি জানিয়েছিলেন।

এদিকে ব্যাংকের আমানত ও ঋণের সুদহার কমানো হয়েছে। ইতোমধ্যে সেটা কার্যকরও হয়েছে। ফলে সঞ্চয়পত্রের সুদহার সমন্বয় এখন খুবই জরুরি বলে মনে করেন ব্যবসায়ী নেতারা। তারা বলেছেন, কম সুদে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে সঞ্চয়পত্রে ডাইভার্ট করা হচ্ছে। এতে সরকারকে বেশি পরিমাণে সুদ গুনতে হচ্ছে। এর ফলে সরকারের দায়ও বাড়ছে। বাজেটে একধরনের চাপের সৃষ্টি হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে বিভিন্ন সঞ্চয়পত্র প্রকল্পের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় দুই কোটি। আর নতুন বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সরকার ২৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, যা সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে ধরা হয়েছিল ৩০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে ৪৪ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয় এবং অর্থবছর শেষে সেই সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে যায়।

জানা গেছে, বর্তমানে পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশন সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে পাওয়া যায় ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ সুদ। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের সুদের হার এখন ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। তিন বছর মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। তিন বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ কার্যকর রয়েছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে