‘বিলুপ্তপ্রায়’ লাল বাস প্রশাসনের নজর ভাড়ায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবহন সংকট

  মেহেদী হাসান

১১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের বড় একটি অংশ ব্যয় হয় পরিবহন খাতে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও আদায় করা হয় কোটি কোটি টাকা। তার পরও পরিবহন সংকটে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি দিন দিন বেড়ে চলেছে। নতুন বাস না কেনায় এবং পুরনোগুলো বেশিরভাগ সময় নষ্ট থাকায় যাতায়াতে দুর্ভোগে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। তাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী লাল রঙের বাস ‘বিলুপ্ত’ হতে চললেও প্রশাসন বেশি মনোযোগী বাস ভাড়া করার দিকে। অন্যদিকে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের পরিবহনের জন্য প্রতিবছর বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন শাখা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ঢাবির জন্য চারটি বাস কেনার কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কিছু বাসের অবস্থা খুবই করুণ। এগুলো প্রতিদিন সকালে মেরামত করে রাস্তায় নামাতে হয়। এসব বাসের কারণে রাস্তায় দুর্ঘটনায় পড়ারও আশঙ্কা রয়েছে।

একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা একটি পরিচিতি বহন করত লাল রঙের বাসগুলো। এখন শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ১১টি বাসের মধ্যে সচল ৮টি। এই ৮টি এবং বিআরটিসি থেকে ভাড়া নেওয়া ২২টি বাস ১৪ রুটে সারাদিনে ২০৬টি ট্রিপ দেয়। ঢাকার ভেতরে ও আশপাশের

জেলাগুলোয়ও যায় এসব বাস। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, প্রায়ই বাস রাস্তায় নষ্ট হয়ে যায়। অনেক বাস সময়মতো আসেও না। এর ফলে ক্যাম্পাসে আসতে দেরি হয়। ক্লাস মিস করতে হয়।

রেজিস্ট্রার ভবনের হিসাবরক্ষণ বিভাগের সূত্র অনুসারে, শিক্ষার্থীদের পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। কেবল পরিবহন ফি ও পরিবহন উন্নয়ন ফি হিসেবে শিক্ষার্থীদের থেকে নেওয়া হয় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪ কোটি ৯৫ হাজার ২০৭ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে (এপ্রিল পর্যন্ত) ৪ কোটি ৫০ লাখ ৬১ হাজার ১৮২ টাকা। এ ছাড়াও শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থেকে কর্তনকৃত পরিবহন ফি, গ্যারেজ বিল, বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট ট্যুরের জন্য বাসভাড়া নেওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন খাত থেকে আয় যোগ হচ্ছে।

তার পরও নিজস্ব বাসের ব্যবস্থা না করে বিআরটিসি থেকে ভাড়া নেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়কে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। বাসগুলোকে প্রতিদিন দূরত্বভেদে ট্রিপপ্রতি চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিতে হয় বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিবছর পরিবহন খাতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, তার প্রায় ৪৩ শতাংশই যায় শিক্ষার্থীদের বাস ভাড়া বাবদ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসচালকরা বলেন, ২৫ বছরের পুরনো গাড়ি নষ্ট তো হবেই। কোনো বাস নষ্ট হলে মেরামতের অনুমোদন পেতেই ১০-১৫ দিন লেগে যায়। নিজস্ব বাসগুলোর প্রায় সবই বিভিন্ন সময় উপহার হিসেবে পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন শাখায় ৮০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত। এর মধ্যে মেকানিক মাত্র তিনজনÑ দুজন ইলেকট্রিশিয়ান ও তাদের সহকারী দুজন। পরিবহন শাখার এক মেকানিক জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একটি বাসের অবস্থাও ভালো নয়। এগুলো মৃতপ্রায়। আগের জাপানি গাড়িগুলো কিছুটা চললেও চীনের নতুন গাড়িগুলো ‘ওয়ানটাইম’ ব্যবহারের মতো। প্রতিদিন সকালে এগুলো মেরামত করে রাস্তায় পাঠানো হয়। এ বাসগুলো যে কোনো দিন বড় ধরনের দুর্ঘটনায় পড়তে পারে। প্রশাসনকে অনেকবার জানিয়েও লাভ হয়নি বলে জানান তিনি।

জানা যায়, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট চারটি বাস কেনার অনুমতি দিলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তা আজ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। কিন্তু জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের জন্য গাড়ি ক্রয় ঋণ প্রকল্পে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বরাদ্দ করা হয় দুই কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও বরাদ্দ হয়েছে এক কোটি টাকা। কর্মকর্তাদের যাতায়াতের সুবিধার্থে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত গাড়ি ক্রয়ের বিল পরিশোধ হয়েছে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪৫ লাখ টাকা। এ ছাড়াও উপাচার্য, দুই উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের জন্য ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় চারটি স্পোর্টস জিপ কেনা হয়।

পরিবহন শাখার সিনিয়র পরিবহন ম্যানেজার কামরুল হাসান আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব বাস অনেক কম। বিআরটিসির বাস ভাড়া করে পরিবহন সংকট সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে শিক্ষার্থীদের বাস কেনার জন্য কোনো বরাদ্দ নেই, তবে শিক্ষকদের জন্য দুটি মিনিবাস কেনার বরাদ্দ আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দুটি বাস কেনার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। নতুন বাস না কিনলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ঐতিহ্যবাহী লাল বাস, তা হয়তো পাঁচ বছর পর আর থাকবে না।’

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে