• অারও

উত্তরাঞ্চলে বাল্যবিয়ের শিকার ২০ লাখ কিশোরী

  নজরুল মৃধা, রংপুর

১৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার দাঁতভাঙ্গা এলাকার জয়েনউদ্দিন ১১ বছরের কন্যা জরিতন নেছাকে যষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রীবস্থায় জোর করে বিয়ে দেন প্রায় দ্বিগুণ বয়সী মমিনুল নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। বিয়ের পর থেকেই এক লাখ টাকা যৌতুকের জন্য নির্যাতন শুরু হয় জরিতনের ওপর। ২০১২ সালে যৌতুকের জন্য স্বামী তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এর পর বাবার বাড়িতে আশ্রয় হয় জরিতনের। গত ৬ মাস থেকে আছেন রংপুরের সেফহোম আলোকিত ভুবনে।

পঞ্চগড়ের আমির হোসেনের কন্যা রুমি আক্তার। তৃতীয় শ্রেণিতে থাকাবস্থায় তার বিয়ে হয়। স্বামী মাসুদ নেশাগ্রস্ত হওয়ায় প্রায়ই মারপিট করত। একপর্যায়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। সেও আশ্রিত আলোকিত ভুবনে। দিনাজপুর সদরের মহসিন আলীর কন্যা মৌসুমী আক্তারের বিয়ে হয়েছিল ১১ বছর বয়সে ২০১৪ সালে। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করায় সে বাবার বাড়িতে চলে আসে। সেও আলোকিত ভুবনের বাসিন্দা।

শুধু জরিতন, রুমি কিংবা মৌসুমী নয়, তাদের মতো উত্তরাঞ্চলে লাখ লাখ কিশোরী বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বাল্যবিয়ে হচ্ছে। মাঝে মধ্যে স্থানীয় প্রশাসন খবর পেয়ে রুখে দিলেও থেমে নেই বাল্যবিয়ে। ধর্মীয় কুসংস্কার, দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবে এ অঞ্চলে বাল্যবিয়ে রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

আমাদের দেশে ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া আইনসম্মত নয়। ইউনিসেফের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, দেশে বর্তমানে ৩০ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে ১৫ বছর বয়সে; আর ১৮ বছরের নিচে বিয়ে হয় ৩৯ শতাংশ মেয়ের। এ ছাড়া প্রতি ১০ জন কিশোরীর মধ্যে তিনজনকে ১৫ বছর হওয়ার আগে বিয়ে দেওয়া হয়। আর প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজনকে বিয়ে দেওয়া হয় ১৮ বছরের আগে। মোট জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ কিশোরী। উত্তরাঞ্চলে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ রয়েছে কিশোরী। সব মিলিয়ে বাল্যবিয়ের হার ৪৩ দশমিক ২ ভাগ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী উত্তরাঞ্চলে ২০ লাখের ওপর কিশোরী বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তারা অল্প বয়সে সংসারের বোঝা মাথায় নিয়ে অকালে বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

জানা গেছে, প্রতিবছর এ অঞ্চলে সহায়-সম্বলহীন হতদরিদ্র ঘরের মেয়েরা বিয়ের পর যৌতুকের দাবি মেটাতে না পেরে স্বামীর অমানুষিক নির্যাতনে শিকার হয়ে গৃহছাড়া হচ্ছে। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় স্বামীর পরিবারের অন্যায়-অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যাও করছে কেউ কেউ। বাল্যবিয়ে আর যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার ২২ কিশোরীকে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস তাদের সেফহোম আলোকিত ভুবনে নিয়ে আসে। ভাগ্যবঞ্চিত এসব কিশোরীকে ৬ মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের স্বাবলম্বী করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আলোকিত ভুবনে তাদের দর্জির কাজ, স্টিচিং, এমব্রয়ডারি, চটের ফাইল ও ঝুড়ি তৈরিসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তারা এখন স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

১২ জানুয়ারি সকালে রংপুর নগরীর গুপ্তপাড়ায় অবস্থিত আলোকিত ভুবনে কথা হয় ভাগ্যবিড়ম্বিত পঞ্চগড়ের রুমি আক্তারের সঙ্গে। সে জানায়, মাত্র আট বছর বয়সে তাকে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিয়ে কী, তা বুঝত না। নেশাগ্রস্ত স্বামী প্রায়ই মারপিট করত। এক মাস না যেতেই স্বামীর অত্যাচারে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয় সে।

জরিতন নেছা জানালেন, এখানে এসে বুঝেছি বাল্যবিয়ের কুফল কী। ১ লাখ টাকা যৌতুকের কারণে সংসার করতে পারিনি। আমার মতো অবস্থা যেন আর কারো না হয়।

বাল্যবিয়ের শিকার মৌসুমী ও নিনাজ বেগম জানান, বাল্যবিয়ের কারণে তাদের ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করা হয়েছে। ভাগ্যবিড়ম্বিত এসব কিশোরী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানায়, কোনো বাবা-মা যেন তাদের সন্তানদের অল্প বয়সে বিয়ে না দেন।

আরডিআরএস রংপুরের সিনিয়র নারী অধিকার কর্মকর্তা সমশে আরা বিলকিছ জানান, এ অঞ্চলে বাল্যবিয়ের হার দেশের অন্যান্য স্থানের চেয়ে অনেক বেশি। যৌতুক এখন সামাজিক ব্যাধি হিসেবে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এ অঞ্চলে বিয়ের রাতেই যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার হচ্ছে কিশোরীরা। এ ছাড়া ধর্মীয় কুসংস্কারের কারণেও অনেক অভিভাবক অল্প বয়সে মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছেন। বাল্যবিয়ে থেকে পরিত্রাণের জন্য অভিভাবকসহ জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে