ওদের ঘরে ঈদ আসছে দুঃখের অথৈ বান নিয়ে

মেঘলা ও সুমির খোঁজ নিল না কেউ

  নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া ও শেরপুর প্রতিনিধি

১৪ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ জুন ২০১৮, ০২:০৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

সর্বগ্রাসী অভাবের যাতনায় দরিদ্র দুলাল খাঁর পরিবারে প্রতিবারই ঈদের আনন্দ আসে অনেকটা মলিনতা নিয়ে, উৎসবের বর্ণিল ছটা সেখানে অনুপস্থিত। তা-ও গা সহা হয়ে গেছে। কিন্তু এবারের ঈদ এসেছে দুঃখের করাল স্রোত নিয়ে, হৃদয়ের গভীরে চলছে যন্ত্রণার গোঙানি। তার প্রাণপ্রিয় সন্তান বায়না ধরেছে ঈদে নতুন জামা দিতে হবে। জামা দূরে থাক, দুবেলা দুমুঠো ভাতের সংস্থান করাই কঠিন হয়ে পড়েছে দুলাল খাঁর কাছে। ৮ বছরের শিশুসন্তান সুমির মুখের দিকে তাকিয়ে তার বুকজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে হাহাকার। সেই সুমি, বগুড়ায় দুমাস আগে যন্ত্রদানব ট্রাক যে সুমির একটি হাত কেড়ে নিয়ে গেছে, তার ভবিষ্যতকে করে দিয়ে গেছে অন্ধকার।

ঈদের আনন্দ নেই কাজলি বেগমের মনেও। সেই কাজলি, সুমির দুর্ঘটনার দিনই রংপুরের শেরপুরে যার সাড়ে তিন বছরের শিশুকন্যা সুমাইয়া আক্তার মেঘলার পা কেড়ে নিয়েছে ঘাতক ট্রাক। মেঘলা এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কাজলির মনের ঈদ আনন্দ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সন্তান মেঘলার ভবিষ্যৎ-ভাবনা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে কাজলি বলেন, মেঘলা বড় হলে অন্য আর দশটি মেয়ের মতো স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে না, এটা ভাবলেই বুকটা হাহাকার করে উঠে। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করলে নিজের জীবন দিয়ে দিতে ইচ্ছা করে।

মঙ্গলবার দুপুরে শেরপুর উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের ফুলতলা গ্রামে সুমিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, সুমির পরিবারের সবার মুখই মলিন। সুমি, তার বোন ও বাবা-মার দিন কাটছে অর্ধাহারে-অনাহারে। ভাঙা ঘরে বসবাস তাদের। বাবা দুলাল খাঁর উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন ভ্যানটিও ভেঙে পড়ে আছে বাড়ির আঙিনায়; রুজির পথ বন্ধ। সামনে ঈদুল ফিতর। প্রতিবেশী শিশুদের দেখাদেখি সুমিও আবদার ধরেছে নতুন জামার। অসহায় দুলাল খাঁ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছেন মেয়ের দিকে।

দুলাল খাঁ বলেন, সুমির দুর্ঘটনার পর থেকে আমরা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারছি না। আমাদের কোনো জমিজমা, সহায়-সম্পদ নেই। একটি গরু ছিল, সেটি বিক্রি করেই চলেছে সুমির চিকিৎসাব্যয়। এর মধ্যে আবার চিকিৎসার জন্য ঢাকায় হাসপাতালে যাওয়া আসা করতে গাড়ি ভাড়া ব্যবস্থা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে ভ্যান চালিয়ে রোজগার করে সংসার চলত আমাদের। এখন সেই ভ্যানও নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।

সন্তানবৎসল পিতার চোখ ছলছল। বলেন, এই ঈদে সুমি আমার

কাছে আবদার করেছে নতুন জামার। কিন্তু আমি কীভাবে তার আবদার পূরণ করব জানি না। কষ্টে আমার বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে।

তিনি জানান, সুমির দুর্ঘটনার পর স্থানীয় এমপি হাবিবর রহমানের কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছিলেন। এ ছাড়া হাসপাতালে জেলা প্রশাসনসহ অনেকেই সাহায্য দিয়েছিল। সে সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। এখন কী করবেন ভেবে কূল পাচ্ছেন না।

তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ভিজিএফের ১০ কেজি চাল পেয়েছিলাম, তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চলছে।

সুমির মা মরিয়ম বেগম বলেন, পাশের বাড়ির বাচ্চাদের নতুন পোশাক দেখে সুমিরাও কান্নাকাটি করছে, কিন্তু আমাদের কিছুই করার নেই। কান্নায় ভেঙে পড়েন মরিয়ম।

শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম জানান, সুমির পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। তাদের ঈদ আনন্দ বজায় রাখতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

২২ এপ্রিল বেলা দেড়টার দিকে বাবা দুলাল খাঁর হাত ধরে ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের উপজেলার ধরমোকাম এলাকায় মহাসড়ক পার হওয়ার সময় ঢাকাগামী পাথর বোঝাই ট্রাকের ধাক্কায় সুমির বাঁ হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; ভেঙে যায় ডান হাতের তিনটি আঙুল।

এদিকে রংপুরে ট্রাকের চাপায় ডান পা হারানো সাড়ে তিন বছরের শিশু সুমাইয়া আক্তার মেঘলার এবারের ঈদ হাসপাতালেই করতে হবে। গত ২২ এপ্রিল সন্ধ্যায় নগরীর মাহিগঞ্জ এলাকায় একটি ইট বোঝাই ট্রাকের চাপায় পা হারায় সুমাইয়া। তখন থেকেই রমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে অপারেশনের টেবিলে যেতে হয়েছে দুবার।

শিশুটির বাবা শফিুকল ইসলাম দিনমজুর। মা কাজলি বেগম অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। মেয়ের চিকিৎসায় অনেক টাকা ব্যয় করেছেন তারা। সাহায্য-সহযোগিতা তেমন একটা পাননি। তাই ঋণ করে চালাতে হচ্ছে মেয়ের চিকিৎসার খরচ।

গতকাল রমেক হাসপাতালের তৃতীয় তলার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে কথা হয় শিশু মেঘলার বাবা-মার সঙ্গে। তারা জানান, গত রবিবার দ্বিতীয় দফায় মেঘলার পায়ে অপারেশন করা হয়েছে। কেটে ফেলা অংশের নিচে চামড়া লাগানো হয়েছে। চামড়া শুকালে হাঁটুর নিচে কৃত্রিম পা লাগাতে হবে। এবার ঈদ হাপাতালে করতে হবে বলে জানান তারা।

মেঘলার বাবা জানান, মেয়ের চিকিৎসা করাতে হচ্ছে ধারদেনা করে। দু-একজন যা সাহায্য করেছিলেন, তা চিকিৎসার শুরুতেই শেষ হয়ে গেছে।

সুমি ও মেঘলার সচিত্র প্রতিবেদন গত ২৩ ও ২৪ এপ্রিল গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এসব খবর পড়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক ব্যবসায়ী রংপুরের তার এক বন্ধু মারফত মেঘলার চিকিৎসায় ১৫ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। এ ছাড়া তেমন একটা সাহায্য-সহযোগিতা পাননি তারা।

শিশুটির বিষয়ে রমেক হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধান ডা. শফিকুল ইসলাম জানান, গত রবিবার শিশুটির কেটে ফেলা অংশে অপারেশন করে চামড়া লাগানো হয়েছে। চামড়া শুকালেই হাসপাতাল থেকে শিশুটিকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে কৃত্রিম পা সংযোজনের বিষয়টি দেখা হবে বলে তিনি জানান।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে