বইয়ে ভুল দিয়ে শুরু আলোচনায় প্রশ্নফাঁস

  এম এইচ রবিন

৩১ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘ভুল সবই ভুল, এই জীবনের পাতায় পাতায়, যা লেখা, সে ভুল’Ñ গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের এমন গানের কথার যথার্থ মিল ছিল শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বিতরণ করা পাঠ্যবইয়ে। এর পর বছরের বাকি সময়জুড়ে ছিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর। প্রশ্নফাঁস থেকে বাদ যায়নি প্রাইমারি স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষাও। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসে আলোচনায় ছিল শিক্ষা প্রশাসন।

যে ভুলে ছিল হইচই : তৃতীয় শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের অধ্যায় ১০-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মায়ের নাম ভুল (সায়েরা বেগম) উপস্থাপন করা হয়। সঠিক নাম ‘সায়েরা খাতুন’Ñ যা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে শেখ মুজিবুর রহমান নিজের লেখায় উল্লেখ করেছেন। ‘হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ বইয়ে পেছনের প্রচ্ছদে ‘কাউকে কষ্ট দিও না’-এর ইংরেজি লেখা হয়েছে, উঙ ঘঙঞ ঐঊঅজঞ অঘণইঙউণ. আঘাত করা বোঝাতে গিয়ে ঐঁৎঃ বানান লিখতে ভুল হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে কুসুমকুমারী দাশের ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতায় বেশ কয়েকটি লাইন বিকৃত করা হয়েছে। ‘ও’তে ওড়না চাই ছিল সমালোচনার কেন্দ্র। একই বইয়ে ‘অজ’ (ছাগল) আসে। আম খাই’। আম খাওয়া বোঝাতে ছাগলকে গাছে ওঠানো নিয়ে চলে হাস্যরস। এর মধ্যে পেরিয়ে যায় বছরের প্রথমার্ধ। বছরের প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার আগের রাত ছিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের আতঙ্ক। গণমাধ্যমেও ফলাও করে প্রচার করেছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর। ইমেজ সংকটে পড়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ফেসবুকসহ নানা মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এসব আমলে নিয়ে কোনো কূলকিনারা পায়নি সরকার। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সন্দেহে সারা দেশে আটক হয়েছে কয়েকজন।

আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে : শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের উদ্ধৃতিÑ ‘ঘুষের সহনীয় মাত্রা’ এবং ‘অফিসাররা চোর’, ‘মন্ত্রী চোর’। বিসিএস পরীক্ষা ছাড়া ক্যাডার! এমন ক্যাডার মর্যাদা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত বেসরকারি আত্তীকরণ কলেজ শিক্ষক ও সরকারি কলেজ শিক্ষকরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদ মাস্টার্সের সমমান ঘোষণার বিষয়। প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ে সমাবর্তন। বছরের বিশ্বসেরা শিক্ষক হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ‘গ্লোবাল টিচার্স প্রাইজ’ পান বগুড়ার শাহনাজ পারভিন। চাঁদপুর হাইমচর উপজেলার নীলকমল ওছমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানে উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন পাটওয়ারীর প্রতীকী পদ্মা সেতু তথা শিক্ষার্থীদের ঘাড়ের ওপর চড়ে হেঁটে যাওয়ার ঘটনা। ঘুষ, দুর্নীতির আখড়া হিসেবে উপনীত হয়েছে শিক্ষার মাঠ প্রশাসন কার্যালয়। শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে কোচিংবাণিজ্যের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরদারির আতঙ্ক ছিল কোচিংবাজ শিক্ষকদের মধ্যে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের আন্দোলন।

বরাবরই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতির লাগাম টানতে পারেনি সরকার। অস্থায়ী অনুমোদনে চলছে দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যলয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুযায়ী এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাঠদানের মানদ- আর প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর শর্তপূরণে ব্যর্থ। কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও সরকারি বিধি-বিধান মানা হয়নি। অধিকাংশ বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের প্রাথমিক অনুমোদনের শর্ত পূরণ না করে চলছে পাঠদান। নেই নিজস্ব ক্যাম্পাস, নির্ধারিত জমি, ভবন, আসবাবপত্র ও ল্যাব সুবিধা।

লেখাপড়ার মান নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে, হইচই পড়ে যায় গোটা শিক্ষা প্রশাসনেÑ তখন ইমেজ সংকটে পড়ে সরকার। সংকট উত্তরণে বরেণ্য শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনায় বসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষার্থীদের কী ধরনের শিক্ষা দেওয়া হবে, পাঠ্যপুস্তকে কোন বিষয় বাদ যাবে, কোন বিষয়ে পরীক্ষা বোর্ডে হবে, কোনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হবে, কোনটি সুখপাঠ্যÑ এসব নিয়ে বছরজুড়ে সভা-সমাবেশ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ছিল হাঁস-ফাঁস। সুপারিশ আসে পাঠ্যক্রম, পাঠ্যসূচি, পাঠ্যপুস্তক, পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতিতে সংস্কারের। বেশি সমালোচিত হয়েছে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে সমাপনী পরীক্ষার নামে পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে। সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করেও এর সুফল কুড়াতে পারেনি সরকার। পরীক্ষাগুলোয় জিপিএ-৫ প্রাপ্তির রেকর্ডের সূচক যতটা ঊর্ধ্বমুখী, বিপরীতে শিক্ষার মান ততটাই নিম্নগতি বলে সমালোচিত হয়েছে সর্বত্র।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে