যাদের হারিয়েছি

  আসাদুর রহমান

৩১ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিদায় ২০১৭। শুধু একটি বছরকেই বিদায় নয়, এ সময়ে আমাদের বারবার বিদায় জানাতে হয়েছে প্রিয় মানুষ ও প্রিয় মুখগুলোকে। হারিয়েছি রাজনীতির প্রিয় মুখ থেকে রুপালিজগতের সেরা মানুষকে। বিদায় বলতে হয়েছে সংগীতের প্রিয় মুখ, প্রকৃতিপ্রেমিকসহ দেশের বিখ্যাত গুণীজনদের। বছর শেষে আরও একবার শ্রদ্ধা জানাতে আমাদের সময়ের পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলো মৃত্যুঞ্জয়ীদের।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : বাংলাদেশের একজন বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান। দ্বিতীয়, তৃতীয়, পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম জাতীয় সংসদসহ সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। এর আগে সত্তরের নির্বাচনেও তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। কিছু দিন রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও ছিলেন। জাতীয় সংসদে তার মতো প-িত ব্যক্তি ছিলেন হাতেগোনা। নতুন আইন তৈরি, আইনের সংস্কারÑ সবখানে ছিল তার দক্ষ হাতের ছোঁয়া। গত ৫ ফেব্রুয়ারি তাকে হারিয়েছি আমরা।

মহিউদ্দিন চৌধুরী : চট্টগ্রামের মাটি আর মানুষের প্রাণের নেতা ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। প্রথমবার ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৫ সালে মেয়র নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) এক মন্ত্রীকে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো চট্টগ্রামে মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন। আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা রেখে তিনি বছরের বিদায়লগ্ন ১৫ ডিসেম্বর পাড়ি জমান না ফেরার দেশে।

নায়করাজ রাজ্জাক : নায়করাজ বলতে একজনকেই বোঝানো হয়। আর তিনি হচ্ছেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়করাজ রাজ্জাক। তিনি একাধারে একজন অভিনেতা, প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্রাঙ্গনে নিজেকে মেলে ধরেছিলেন। তিনি বেহুলা, আগুন নিয়ে খেলা, এতটুকু আশা, নীল আকাশের নিচে, জীবন থেকে নেয়া, ওরা ১১ জন, অবুঝ মন, রংবাজ, আলোর মিছিল, অশিতি, ছুটির ঘণ্টা, বড় ভালো লোক ছিল, বাবা কেন চাকরসহ মোট ৩০০টি বাংলা ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। সাবলীল অভিনয়শৈলী সবাইকে ছাপিয়ে অনন্য উচ্চতার আসনে বসিয়েছে তাকে। আমাদের প্রিয় মানুষ হৃদয়ের হিরোকে গত ২১ আগস্ট বিদায় বলতে হয়েছে।

এমকে আনোয়ার : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ খোরশেদ আনোয়ার। তিনি এমকে আনোয়ার নামে পরিচিত ছিলেন। পাকিস্তান আমলে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশেও প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সরকারের অর্থ সচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্বও তিনি পালন করেন। ১৯৯০ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর এমকে আনোয়ার রাজনীতির মাঠে নামেন এবং যোগ দেন বিএনপিতে। কুমিল্লার হোমনা আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এমকে আনোয়ার খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকারে দুই দফা মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। জীবনের ৮৪-তে গত ২৪ অক্টোবর তিনি চলে যান না ফেরার দেশে।

বারী সিদ্দিকী : ‘শুয়া চান পাখি আমি ডাকিতেছি তুমি ঘুমাইছো নাকি?’ সত্যিই শুয়া চান পাখি শেষ ঘুম ঘুমালেন। সবাইকে কাঁদিয়ে গত ২৪ নভেম্বর পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে বারী সিদ্দিকী চলে যান না ফেরার দেশে। এত সুন্দর বাঁশি কে কবে বাজিয়েছে তা কে-ই বা বলতে পারেন। কী বাঁশিতে, কী সুরে সমান জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। তার বাঁশি আর কেঁদে উঠবে না এবং তার সুর আর হৃদয় রাঙাবে না।

আবদুল জব্বার : সালাম সালাম হাজার সালাম, লাখো শহীদ স্মরণে আমার হৃদয় রেখে যেতে চাই তাদের স্মৃতির চরণেÑ এখান থেকে ওরে নীল দরিয়া আমায় দে রে দে ছাড়িয়া, বন্দি হইয়া মনোয়া পাখি হায়রে কান্দে রইয়া রইয়া। আবদুল জব্বারের অমর এই গানের শ্রোতা বাংলাদেশের সবাই। জয়বাংলা বাংলার জয় কোটি প্রাণ এক সাথে জেগেছে অন্ধরাতে নতুন সূর্য ওঠার এইতো সময়Ñ আবদুল জব্বারের এই গানে মুক্তিযুদ্ধের মতো আজও উজ্জীবিত হয় কোটি প্রাণ। মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সময়েও তার কণ্ঠের জাদুতে মহিত হয়েছেন শ্রোতামাত্রই। এখনো মুখে মুখে ফেরে পিচঢালা এই পথটারে ভালো বেসেছি তার সাথে এই মনটারে বেঁধে নিয়েছিÑ এমন অসংখ্য গান আর সুর বহুকাল বেঁচে থাকবে। গত ৩০ আগস্ট সুরের মায়া কাটিয়ে চলে যাওয়া আবদুল জব্বারকে আমরা খুঁজব সুরে-গানে।

আনিসুল হক : বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান সঞ্চালক হিসেবে প্রথম জনপ্রিয়তা পান। যারা আনিসুল হককে সেই সময় দেখেছেন, তারা জানেন সেই জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়েছিল। এর পর ব্যবসায়ী নেতা সেখানেও সমান জনপ্রিয়। তবে সব জনপ্রিয়তা ছাপিয়ে গেছে মেয়র আনিসুল হকের কাছে। অল্প দিনেই তিনি যা করেছেন, অনেকে বহুদিন চেষ্টা করেও তা করতে পারেননি। গত ৩০ নভেম্বর প্রিয় মানুষটি চিরবিদায় নেন।

লাকী আখন্দ : আমায় ডেকে না-ফেরানো যাবে না, ফেরারি পাখিরা কোলায় ফেরে না।Ñ সত্যিই শতবার ডেকেও আমরা তাকে আর ফেরাতে পারিনি। সুরস্রষ্টা কোটি ভক্তের হৃদয় ভেঙে গত ২১ এপ্রিল চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আর কোনো দিন তিনি গাইবেন না এই নীল মনিহার, আবার এলো যে সন্ধ্যার মতো জনপ্রিয় গানগুলো। দেশের অনেক বরেণ্য শিল্পীর গানের সুর আর কথায় লাকী আখন্দ অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ের মনিহারে।

ছায়েদুল হক : আমাদের দেশের রাজনীতিবিদের সততা সহজে দেখা যায় না। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানুষটির সততা সবার সামনে এসেছে। তিনি প্রয়াত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক। মৃত্যুই যেন চোখে আঙুল দিয়ে তার সরল-সাধারণ জীবনযাপনের কথা জানিয়ে গেল। জনপ্রিয় এই রাজনীতিবিদ থাকতেন পুরাতন দুই টিনের ঘরে। জেলার সার্কিট হাউসের একদিনের ভাড়াও বাকি রেখে যাননি। নির্লোভ এই মানুষটিকে আমরা হারিয়েছি আমাদের বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বরে।

দ্বিজেন শর্মা : যান্ত্রিকতা মানুষকে গ্রাস করেছে। কোন গাছের কী নাম। ঘাসফুল কেন এত সুন্দর হয়, কেন সেথায় চোখ হারায় উদাসী পথিকেরÑ এসব ভাবার যেন সময় নেই। এই অস্থিরতা আর দূষণের মধ্যেও যে মানুষটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে প্রকৃতিকে চেনাতেন, জানাতেন তিনি দ্বিজেন শর্মা। গত ১৫ সেপ্টেম্বর আমরা হারাই এই নিসর্গ সখাকে।

এ ছাড়া ২৯ সংসদ সদস্য চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬ জন সাবেক। সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। দলটির সাবেক ও বর্তমান মিলে ১৩ সংসদ সদস্য মারা গেছেন। আর দেশের অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপির ১১ সাংসদ মারা গেছেন। তাদের মধ্যে একজন সাবেক রাষ্ট্রপতিও রয়েছেন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির চারজন এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের একজন সাবেক সংসদ সদস্য মারা যান।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে