দখল-দুর্দশায় ব্যাংকিং খাত

  হারুন-অর-রশিদ

৩১ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাংকদখল দিয়ে শুরু হয় চলতি বছর। বছরজুড়েই আলোচনা ছিল আরও এক হালি ব্যাংকদখল নিয়ে। শেষের দিকে এসে আরেকটি ব্যাংক দখলও হয়। এ ছাড়া দুর্নীতি-অনিয়মে বিপর্যস্ত ছিল ব্যাংকিং খাত। দুর্নীতির সীমা লঙ্ঘন করায় দুটি ব্যাংকের এমডিকে অপসারণ করতে হয়েছে। পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন ৩ ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও কমিটির অন্য সদস্যরা। এ ছাড়া ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে বেসরকারি ব্যাংকে পরিচালকদের আধিপত্য বাড়ানো ও খেলাপি ঋণের দাপট নিয়ে সমালোচনা ছিল বছরজুড়েই।

২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় পদত্যাগ করেন চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানসহ কমিটির অন্য সদস্যরা। চট্টগ্রামের একটি গ্রুপের পক্ষে আরাস্তু খান নতুন পরিচালক নির্বাচিত হন। ওই সভাতেই তিনি চেয়ারম্যান হন। নতুন ভাইস চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন ওই সভায়। এ ছাড়া ব্যবস্থাপনা পরিচালকও (এমডি) পদত্যাগ করেন এবং নতুন এমডি নিয়োগ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক রাতারাতি কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই সব কিছু অনুমোদন করে দেয়।

গত ৩০ অক্টোবর রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত বোর্ডসভায় সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল) বেনামে দখল করে ওই গ্রুপটি। ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও এমডি পদত্যাগ করেন ওই সভায়। নতুন পরিচালক হওয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আনোয়ারুল আজীম আরিফ নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নতুন ভাইস চেয়ারম্যান ও এমডি নিযুক্ত করা হয় ওই সভাতেই। পরবর্তী সময়ে আরও ৭ পরিচালক পদত্যাগ করেন এবং নতুন ৯ পরিচালক নির্বাচিত হন। যাদের অধিকাংশই চট্টগ্রামভিত্তিক ওই গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধি। গত ২১ ডিসেম্বর এবি ব্যাংকের সাধারণ সভায় চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানসহ ৩ পরিচালক পদত্যাগ করেন এবং ৩ নতুন পরিচালক নির্বাচিত হন। ব্যাংকিং খাতে পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় এই পরিবর্তন নিয়ে বছরজুড়েই সমালোচনা হয়। এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতে আলোচিত ছিল নতুন প্রজন্মের দুটি ব্যাংক ফারমার্স ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক নিয়ে। উদ্যোক্তারা ঋণের নামে ব্যাংকের টাকা খেয়ে ফেলায় ধার করে চালাতে হয় ফারমার্স ব্যাংক। শেষ পর্যন্ত আমানতকারীদের অর্থও ফেরত দিতে ব্যর্থ হয় ব্যাংকটি। এই অবস্থার মধ্যে ২৭ নভেম্বর ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী লীগ নেতা মহীউদ্দীন খান আলমগীর পদ ছাড়তে বাধ্য হন। তার সঙ্গে পদ ছাড়েন ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী। আমানতকারীদের স্বার্থ পরিপন্থী কাজ করা ও পরিচালনায় ব্যর্থতার দায়ে গত ১৯ ডিসেম্বর অপসারণ হন এমডি একেএম শামীম। এর আগে ঋণে অনিয়ম ও অন্যান্য জালিয়াতির অভিযোগে ৬ ডিসেম্বর এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের এমডি দেওয়ান মুজিবুর রহমানকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ইস্যুতে ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার ফরাছত আলীসহ অন্য কমিটির প্রধানরা পদত্যাগ করেন। গত বছর ব্যাংকিং খাতে আলোচিত আরেকটি বিষয় ছিল ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন। একই পরিবার থেকে একই সময়ে পরিচালকের সংখ্যা ২ থেকে বাড়িয়ে ৪ জন এবং একটানা ৬ বছরের পরিবর্তে ৯ বছর পরিচালক হিসেবে থাকার সুযোগ রাখা হয়েছে সংশোধিত আইনে। বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থনীতিবিদরা এটির বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত বিল পাস হয়। এ ছাড়া নতুন ৩টি ব্যাংকের লাইসেন্স প্রসঙ্গ বছরজুড়ে ঘুরেফিরে আলোচনায় এসেছে। শেষ পর্যন্ত ৩টি ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

ব্যাংকিং খাতের মারাত্মক ক্যানসার খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি এবার মহামারী রূপ নিয়েছে। খেলাপি ঋণ কমাতে আগে পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিল সুবিধা প্রদান করা হয়। সেই সুবিধাভোগী গ্রাহকরা চলতি বছরে খেলাপি হয়ে গেছেন। বছরের ৯ মাসে খেলাপি ঋণ ১৮ হাজার কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। বড় অঙ্কের খেলাপিরা সর্বশেষ সুবিধা ভোগ করেও আবার সুবিধা চেয়ে আবেদন করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক সেটি দেওয়ার জন্য আলোচনার পর্যায়ে রেখেছে। এ ছাড়া গত ১০ জুলাই জাতীয় সংসদে ১০০ শীর্ষ খেলাপির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে রাঘববোয়ালদের নাম নেই। এটি নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে ঘটে যাওয়া বড় বড় জালিয়াতির ঘটনাগুলো এ বছরেও আলোচনায় ছিল। আইনি প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন অনুসন্ধান চলমান থাকায় এগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বেসিক ব্যাংক জালিয়াতির অন্যতম হোতা ব্যাংকের ওই সময়ের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে এ বছরের শেষ দিকে দুদকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে; কিন্তু সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ব্যাংকের পর্ষদকে এখনো জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হয়নি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে