নতুন ইতিহাস গড়ার বছর

  এম.এম. মাসুক

৩১ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুয়ারে নতুন বছর ২০১৮। সময়ের পরিক্রমায় আরেকটি বছর বিদায় নিচ্ছে। বিদায়ী ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেটে অনেক অর্জন ও প্রাপ্তি রয়েছে। ঘটেছে নানা ঘটনা, হয়েছে অনেক আলোচনা-সমালোচনা। ফিরে দেখা যাকÑ ২০১৭ সালে কতটা সাফল্য ও হতাশায় কেটেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট।

১৫ জুন ২০১৭। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এই তারিখটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা ওই দিনই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আইসিসির কোনো টুর্নামেন্টে সেমিফাইনাল খেলেছিল বাংলাদেশ। অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করেছিল লাল-সবুজের দল। ‘গ্রুপ অব ডেথ’ (অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড ও বাংলাদেশ) থেকেই সেমিফাইনালে ওঠার আকাশকুসুম কল্পনা বাস্তবে রূপ নিয়েছিল। এই গ্রুপ থেকে ইংল্যান্ড তিন ম্যাচে জয় তুলে নিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে। বাংলাদেশ পেয়েছিল একটি জয়। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের ওই একটি জয়েই বিশ্ব ক্রিকেটে আলোড়ন উঠে যায়। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাঁচামরার লড়াইয়ে সাকিব-মাহমুদউল্লাহর দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে দাপুটে জয় তুলে নিয়েছিল বাংলাদেশ। অবশ্য ভাগ্যের ছোঁয়াও যে ছিল না তা নয়। বৃষ্টির কল্যাণে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১ পয়েন্ট পাওয়ায় সেমিফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে যায় বাংলাদেশের। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে পেছনে ফেলে গ্রুপের দ্বিতীয় দল হিসেবে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে ওঠার গৌরব অর্জন করে বাংলাদেশ। যদিও সেমিফাইনালে ভারতের কাছে ৯ উইকেটে হেরে যাওয়ায় ফাইনালের ওঠার বড় স্বপ্ন সত্যি হয়নি। বাংলাদেশের ক্রিকেটের অনেক বড় অর্জন ও প্রাপ্তি এটি। এর আগে ২০১৫ সালে আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার বড় সাফল্য দেখিয়েছিল বাংলাদেশ।

এ বছর বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় যোগ হয়েছে আরও বড় বড় সাফল্য। মার্চে বাংলাদেশ নিজেদের শততম টেস্টে স্বাগতিক শ্রীলংকার মুখোমুখি হয়েছিল। ৪ উইকেটে জয় তুলে শততম টেস্ট রাঙিয়েছে বাংলাদেশ। এ সাফল্যের পর টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় নামক সোনার হরিণের দেখা পায় বাংলাদেশ। গত আগস্টে ঘরের মাঠে টেস্ট ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবারের মতো হারানোর গৌরব অর্জন করে মুশফিক বাহিনী। তাও আবার ম্যাচের দেড় দিন বাকি থাকতেই জয় ছিনিয়ে নেয় বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টানা চার টেস্ট হারের পর এ কীর্তি দেখায় টাইগাররা। নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে অনেক টালবাহানার পর বাংলাদেশে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলতে এসে নাকানি-চুবানি খায় অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল। তাদের বিপক্ষে দুই টেস্ট ম্যাচ সিরিজ ১-১ ব্যবধানে ড্র করে বাংলাদেশ। এ বছর ৯টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। টানা চার ম্যাচ হারের পর বছরের পঞ্চম টেস্টে কলম্বোতে (শততম টেস্ট) শ্রীলংকাকে হারায় বাংলাদেশ। পরের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারায় টাইগাররা। বাকি তিন ম্যাচ হেরেছে বাংলাদেশ।

আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে ওঠা, নিজেদের শততম টেস্টে শ্রীলংকাকে হারানো, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ের বড় সাফল্য, আইসিসি ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে ছয় নম্বরে উঠে আসার বীরত্ব দেখালেও চলতি বছর ঘরের মাঠে কোনো ওয়ানডে ম্যাচ খেলেনি বাংলাদেশ। গত সেপ্টেম্বরেই ২০১৯ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করে লাল-সবুজের বাংলাদেশ দল। ২০১৫ সালের মতো সোনায় মোড়ানো বছর না কাটলেও এই অর্জনগুলো অনেক বড় প্রাপ্তি। এ বছর ১৪টি ওয়ানডে খেলে জয় মাত্র ৪টিতে। ৭টিতে হার ও ৩টি ম্যাচের ফল হয়নি। বছরের প্রথম ওয়ানডেতে ২৫ মার্চ ডাম্বুলায় শ্রীলংকাকে ৯০ রানে হারায় বাংলাদেশ। ত্রিদেশীয় আয়ারল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডকে হারায় বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গিয়ে কোনো ফরম্যাটের ক্রিকেটেই সুবিধা করতে পারেনি বাংলাদেশ।

৩ জানুয়ারি নেপিয়ারের টি-টোয়েন্টিতে নিউজিল্যান্ডের কাছে ৬ উইকেটের হার দিয়ে বছর শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের। বছরের শেষটাও হয়েছে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দিয়ে। ২৯ অক্টোবর পচেফস্ট্রুমে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ৮৩ রানে হেরে বছর শেষ করে বাংলাদেশ। ৭টি টি-টোয়েন্টি খেলে একটি জয়, ৬টিতে হেরেছে লাল-সবুজের দল। এপ্রিলে শ্রীলংকাকে ৪৫ রানে হারায় বাংলাদেশ। বছরের শুরু ও শেষে হারের তিক্ত স্বাদ পেলেও এ বছরটিও স্মরণীয় হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায়।

এ বছর ওয়ানডে ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ে সেরা সাফল্য দেখিয়েছেন তামিম ইকবাল। এ বছর ১২টি ওয়ানডে খেলে সর্বোচ্চ ৬৪৬ রান সংগ্রহ করেছেন এই ওপেনার। এর মধ্যে ২টি সেঞ্চুরি ও ৪টি হাফসেঞ্চুরি রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গিয়ে তামিম ইনজুরিতে না পড়লে রানের সংখ্যা বেড়ে যেত। এর পর মুশফিক ৪৫৮, সাকিব ৪৩০, মাহমুদউল্লাহ ৩৬০ ও সাব্বির ২৮৯ রান করেছেন। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গিয়ে ইনজুরিতে পড়েন বাংলাদেশ দলের বিশ্বতারকা বোলার মোস্তাফিজুর রহমান। ইনজুরি ভোগালেও বছরের সেরা সাফল্য দেখিয়েছেন এই বাঁহাতি পেসারই। ১১ ম্যাচে সর্বোচ্চ ১৪ উইকেট শিকার করেন তিনি। এ ছাড়া মাশরাফি ১৩, রুবেল ১০, তাসকিন ১০ ও মিরাজ ৬ উইকেট শিকার করেন।

এ বছর বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিবের। বছরের শুরুর দিকেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে ২১৭ রানের অনবদ্য ইনিংস, শ্রীলংকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট জয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন সাকিব। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেঞ্চুরিও পেয়েছেন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে টেস্টে সাকিবের বিশ্রাম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অবশ্য ওই সফরে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ভালো কাটেনি তার। ২০১৭ সালে টেস্টে সবচেয়ে বেশি উইকেট শিকার করেছেন সাকিব (২৯টি)। টেস্টে সর্বোচ্চ ৭৬৬ রান করেছেন মুশফিকুর রহিম। ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ ৬৪৬ রান করেন তামিম ইকবাল। টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ ২৩৫ রান আসে সৌম্য সরকারের ব্যাট থেকে।

২০১৭ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেটেও অনেক ঘটনা ঘটেছে। তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটে তিন অধিনায়কের যুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। গত এপ্রিলে শ্রীলংকা সফরে হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। তিনি টি-টোয়েন্টি অধিনায়কও ছিলেন। এর পর বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান সাকিব আল হাসান। এতে টেস্টে মুশফিকুর রহিম, ওয়ানডেতে মাশরাফি ও টি-টোয়েন্টিতে সাকিব অধিনায়ক হন। কিন্তু তিন অধিনায়কের বৃত্ত থেকে বেরিয়েও আসে বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে টেস্টে মুশফিকের নেতৃত্ব বিতর্কের মুখে পড়ে। বছরের শেষ দিকে এসে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় এনে দেওয়া মুশফিককে অধিনায়কের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। আবারও টেস্ট দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পান সাকিব। টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি দলের বর্তমান অধিনায়ক তিনি। অধিনায়ক রদবদলের সঙ্গে বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচের পদেও পরিবর্তন আসছে। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের মাঝ পথে বিসিবিকে পদত্যাগপত্র জমা দেন লংকান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। পরে ঢাকায় এসে আনুষ্ঠানিকভাবে বিসিবির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে যান এই লংকান। বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের প্রধান কোচের পদ শূন্য রয়েছে। ধীরে-সুস্থে ভেবেচিন্তে নতুন কোচ নিয়োগ দেবে বিসিবি। এ ছাড়া এ বছর আরও অনেক আলোচিত ঘটনা ঘটেছে। মুমিনুল হককে টেস্ট দল থেকে বাদ দেওয়া, মাহমুদউল্লাহকে দলের বাইরে রাখা, টেস্টে ব্যাটিং অর্ডারে পরিবর্তন, ঘরোয়া ক্রিকেটে বাজে রেফারিং, বিপিএলে কোয়ালিফায়ার ম্যাচ নিয়ে বিতর্ক, বিসিবির আইনি লড়াইসহ অনেক ঘটনায় বছর পার হয়েছে। নতুন বছরে নতুন কিছু অর্জনের প্রত্যাশায় থাকবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলÑ এমন আশায় ক্রিকেটপ্রেমীরাও।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে