ভালোবাসা কে জেনেছে তারে

  মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভালোবাসা কোনো যুগের চাহিদা নয়। ভালোবাসা পরিমাপ করা যায় না নিক্তিতে। যা শুধু বোঝা যায়, বোঝানো যায় একে অন্যকে। ভালোবাসা তাকেই বলে যা বলা যায় না; কিন্তু হৃদয়ের গহিনে কোথায়ও গভীরতম স্পন্দন অনুভব করা যায়। অনুভব করা যায় এক ঐশ্বরিক ভাবের আদান-প্রদান। সেই ভালোবাসায় নেই কোনো নির্দিষ্ট দিনের চাহিদা। ভালোবাসা প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তেই প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন। তার পরও আমরা একটি নির্দিষ্ট দিনকে ‘ভালোবাসা দিবস’ হিসেবে পালন করি। এই ভালোবাসা দিবসের কাহিনি হাজার বছরের ইতিহাস। ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেইন্ট ভ্যালেইটাইনস নামে একজন খ্রিস্টান পাদ্রি ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচার অভিযোগে তৎকালীন রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাকে বন্দি করেন। কারণ তখন রোম সাম্রাজ্যে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। বন্দি অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টিহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এতে সেইন্ট ভ্যালেইটাইনের জনপ্রিয়তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদ- দেন। সেই দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল। এরপর ৪৯৬ সালে পোপ সেইন্ট জেলাসিউও প্রথম জুলিয়াস ভ্যালেইটাইনস স্মরণে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইনস দিবস ঘোষণা করেন।

কিন্তু এর আগে কি এমন ভালোবাসার কোনো নির্দশন ছিল না? অব্যশই ছিল। হয়তো ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়েছে আবার কিছু ভালোবাসার ইতিহাসের চোখকে ফাঁকি দিয়ে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে। আবার কয়েকশ বছর আগের কিছু প্রেম-ভালোবাসা এখনো ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। সেই তুর্কির অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান সুলেমানের হেরেমের রোক্সেলানা (হুররোম খাতুন) থেকে শুরু করে মোগল সাম্রাজ্যের শাজাহানের মমতাজ পর্যন্ত। গত দুইশ বছরের দিকে তাকালে দেখা যায় সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ তার প্রেমিকাকেই কবিতার অনুপ্রেরণা হিসেবে সবাই বলে থাকি। কবি নজরুলের অনেক প্রেমিকার ভেতর প্রমীলা দেবীও তার অনুপ্রেরণা। বড়-ছোট সব সাহিত্যকর্মের ভেতরই লুকিয়ে আছে তাদের প্রেম-ভালোবাসা ও প্রেমিককুল। তাতে আমরা দেখতে পেয়েছি ভালোবাসার কোনো শ্রেণি-সমাজ-কুল কিংবা ধর্ম ছিল না।

দান্তে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব। তিনি তার সময়ের অন্যতম একজন জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব এবং তিনি নিজেকে মধ্যযুগের ইউরোপীয় আদর্শের সেরা ব্যাখ্যাকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ করেন। দান্তের সবচেয়ে বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম তার মহাকাব্য দ্য ডিভাইন কমেডি সম্ভবত ১৩০৭-এর দিকে এটি লেখা শুরু করেন এবং পুরোমাত্রায় ও সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তোলার জন্য তিনি এটি দেশি ভাষায় রচনা করেন। এটি মধ্যযুগীয় দর্শন এবং আংশিক বিতর্কিত আকারে ধর্মতত্ত্ব এবং তেরোশ ও চৌদ্দশ শতকের ইতালীয় ব্যক্তিত্বের নাট্যরূপ প্রদান করা হয়েছে। এটি মধ্যযুগীয় ধর্মে উল্লেখ থাকা দোজখ, শুদ্ধিস্থান এবং স্বর্গ নামের তিনটি জগতে ভ্রমণের বর্ণনা। এই তিন জগতে ভ্রমণের সময় দান্তের পথপ্রদর্শক হিসেবে ছিলেন তার চির আরাধ্য নিষ্পাপ প্রেমিকা বিয়াত্রিচে এবং রোমান কবি ভার্জিল। আমরা ইতিহাস থেকেই পাই দান্তের আজীবনের প্রেমিকা বিয়াত্রিচেই তার সব সাহিত্যকর্মের অনুপ্রেরণা। তাই হয়তো তার বিখ্যাত বাণীÑ ‘ভালোবাসা তার প্রেমিকের প্রেম ফিরে পেতে চায়’।

মহাত্মা কবি জীবনানন্দের ডায়েরিতে লেখা কয়েকটা লাইন দিয়ে লিখেছেন, অন্ধপ্রেম আমাদের কী যে ক্ষতি করে!

এই অন্ধপ্রেম তখন তার জেগেছে শোভনাকে ঘিরে। শোভনা কবির কাকাতো বোন। শোভনাকেই তিনি তার প্রথম কবিতার বইটা উৎসর্গ করেছিলেন। আর শোভনাই তার জীবনে আমৃত্যু কাব্য ছিলেন।

জীবনানন্দের অনুরোধে বিয়ের রাতে নববধূ লাবণ্য তাকে গাইয়ে শোনালেন রবীন্দ্রনাথের ‘জীবন মরণ সীমানা ছাড়ায়ে, বন্ধু হে আমার রয়েছে দাঁড়ায়ে।’ বিয়ের দিনকে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ মনে হলো কেন জীবনানন্দের? সেই জীবন-মৃত্যুর সীমানায় কোনো বন্ধুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন তিনি? কার কথা স্মরণ করেছেন তিনি? কবি লিখলেনÑ

একদিন একরাত করেছি প্রেমের সাথে খেলা!

একরাত একদিন করেছি মৃত্যুরে অবহেলা।

একদিন— একরাত; তারপর প্রেম গেছে চলে,

সবাই চলিয়া যায়, সকলের যেতে হয় বলে

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে