পেশা হিসেবে সৌন্দর্যসেবা

  কানিজ আলমাস খান

০৭ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সারাবিশ্বে বিভিন্ন সেবা খাতকে উপযোগিতা অনুযায়ী বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সেই হিসেবে সৃষ্টিশীল সেবা খাত ক্রিয়েটিভ ইকোনমির অংশ। সৌন্দর্যসেবাও এই সৃজনশীল অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত। এখানে আছে ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে সৃষ্টির আনন্দ। বাংলাদেশের এই শিল্প খাতও দেখতে দেখতে অনেক বছর পার করেছে। বাংলাদেশে চৈনিক রূপবিশেষজ্ঞদের হাত ধরে স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে সূচনা এই সেবা খাতের। এর পর সময় অনেক গড়িয়েছে। নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আজকের শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে। আমাদের দেশের এই সেবা খাতের সবচেয়ে বড় গর্বের বিষয় হলোÑ এখানে উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে সেবাপ্রদায়ক প্রতিটি স্তরেই নারীদের জয়জয়কার। বাংলাদেশের নারীর স্বয়ম্ভরতা অর্জনে এবং নারী উদ্যোক্তাদের সাফল্যের ক্ষেত্রে সৌন্দর্যসেবা খাত অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বর্তমানে সারাদেশে বিউটিশিয়ান থেকে পার্লার পরিচালনার বিভিন্ন অবস্থানে পেশাদার নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য; এই সংখ্যা বর্তমানে কয়েক লাখ। পাশাপাশি এই খাতের অর্থনৈতিক টার্নওভারও উল্লেখের দাবি রাখে। নিয়মিতভাবেই রাজস্ব প্রদান করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশেষভাবে ভূমিকা রাখছে বিউটি ইন্ডাস্ট্রি; কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই সেবা খাত এখনো পায়নি শিল্পের মর্যাদা। ফলে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে নিয়মিতভাবেই বঞ্চিত হচ্ছে। তা সত্ত্বেও উদ্যোক্তা হিসেবে এই সেবা খাত নিয়ে আমি দারুণ আশাবাদী। আমি ব্যক্তিগতভাবে এর বিপুল সম্ভাবনা দেখি। এমনকি পেশা হিসেবে নেওয়ার ক্ষেত্রেও এই খাতকে আমি সম্ভাবনাময় মনে করি।

সারাবিশ্বে অত্যন্ত আধুনিক, সময়োপযোগী ও সৃষ্টিশীল পেশাগুলোর মধ্যে সৌন্দর্যসেবা একটি। এটি একটি সামগ্রিক বিষয়, যা ধারণ করে বহু কিছু, যেগুলোর প্রতিটি সম্পর্কে থাকতে হয় পূর্ণ জ্ঞান ও সঠিক অভিনিবেশ। এর জন্য রয়েছে পৃথক কোর্স কারিকুলাম। তাই সৌন্দর্যসেবা বলতে আমাদের মাথায় যে কেবল রূপচর্চা বদ্ধমূল হয়ে আছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ এখন এর ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। সঙ্গে রয়েছে পারসোনাল কেয়ারও।

সৌন্দর্যসেবায় আছে সৃজনশীলতা, নন্দনকুশলতা ও বিজ্ঞান। পাশাপাশি রয়েছে স্বাস্থ্য ও পুষ্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও। তাই সঠিক জ্ঞান ছাড়া সৌন্দর্যসেবা প্রদান করা সম্ভব নয়। বিশেষত এটি একটি সেবা খাত। বর্তমানে এটি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং আমাদের ব্যস্ত জীবনের রুটিনে গুরুত্বপূর্ণ একটি করণীয়। মানুষ এখন কেবল সাজতে পার্লার বা স্যালুনে যায় না, বরং নিজের পরিচর্যার জন্যও যায়। ফলে কাউকে সেবা দেওয়ার আগে পুরো বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত হওয়া প্রয়োজন।

আর পেশার কথা যদি বলা হয়, তা হলে বলবÑ এটা এক কথায় অনবদ্য। কথাটা এই পেশায় আমি আছি বলে নয়, বরং আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকেও সেটা বলতে পারি। কারণ আগেই কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেছি। সেগুলোর বাইরে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেকে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। তা হলে নিজে স্বাধীনভাবে কাজ করার অবকাশ যেমন থাকে, তেমনি অন্যের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির আনন্দও পাওয়া যায়। পাশাপাশি দেশের জন্য কিছু করার আনন্দও থাকে। যত ছোটই হোক, দেশের অর্থনীতিতে আমরা ভূমিকা রাখতে পারি। উন্নয়নের অংশীদার হতে পারি।

পেশা হিসেবে সৌন্দর্যসেবার সম্ভাবনা প্রচুর এবং দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে বিউটিশিয়ানরা নানা শাখায় বিশেষায়িত শিক্ষা নিয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠছেন। কেউ হেয়ার স্পেশালিস্ট হচ্ছেন, তো কেউ হেয়ারস্টাইলিস্ট; কেউ বা ত্বকচর্চায় বিশেষজ্ঞ, কেউ আবার মুখত্বক ও চোখ নিয়ে কাজ করেন। এমন নানা শাখা-প্রশাখা এখন এই সেবা খাতকে সমৃদ্ধ করছে। শেখার, জানার ও সেই মতো প্রয়োগের পাশাপাশি পেশা বেছে নেওয়ার সুযোগ

থেকে যাচ্ছে।

বিদেশে সৌন্দর্যসেবার বিষয়গুলো বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় আর ইনস্টিটিউটে পড়ানো হয়। আমাদের দেশে সেই চল শুরু হয়নি। তবে পারসোনা বাংলাদেশে প্রথম এ ধরনের একটি উদ্যোগ নেয়। মিরপুরে পারসোনা বিউটি অ্যান্ড লাইফস্টাইল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে ২০০৮ সালে। এই ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর শিক্ষা দেওয়া হয়। তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি হাতে-কলমেও শেখানো হয়। এখান থেকে শিখে অনেকে বিদেশে গিয়ে সম্মানের সঙ্গে কাজ করছেন। অনেকে আবার উচ্চতর শিক্ষাও নিয়েছেন।

আগেই উল্লেখ করেছি, আমাদের দেশে এই সৌন্দর্যসেবাকে পেশা হিসেবে নিতে গেলে সবার আগে নিজেকে পেশার উপযুক্ত অর্থাৎ পেশাদার করে তুলতে হবে। এ জন্য নির্দিষ্ট বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। সেটি নিশ্চিত করতে পারে কেবল মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান। কারণ সৌন্দর্যসেবা প্রদানে একটি বিষয় সচেতনভাবে মাথায় রাখা জরুরি। আমরা কাজ করি ত্বক, চুল, চোখ, নখের মতো শরীরের সেনসিটিভ অংশ নিয়ে। ফলে এই কাজে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান না হলে বিপদের আশঙ্কা থেকে যায় ব্যাপকভাবে। মানবশরীর সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ধারণা আয়ত্ত করেই পেশাদার সৌন্দর্যকর্মী হওয়া উচিত। এ জন্যই একজন সৌন্দর্যবিশেষজ্ঞকে গভীরভাবে জানতে হয় অ্যানাটমি ও ফিজিওলজির মতো শরীর সম্পর্কিত বিষয়। পাশাপাশি যেসব উপাদান ও উপকরণ ব্যবহার করা হয়, অর্থাৎ প্রসাধনসামগ্রী সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান অর্জন অতি আবশ্যক। কারণ এগুলোই সৌন্দর্যসেবার প্রয়োজনে ত্বক ও চুলে প্রয়োগ করতে হয়। অর্গানিক প্রসাধন এবং নন-অর্গানিক প্রসাধনÑ প্রত্যেকের বৈশিষ্ট্য, ত্বকে এবং চুলে এগুলোর ব্যবহার উপযোগিতা এবং প্রতিটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত হতে হয়। হেয়ার কালারের বৈশিষ্ট্য, গুণাগুণ ইত্যাদিও জানতে হয়। আমরা সবাই জানি এসব প্রসাধনীতে কেমিক্যাল থাকে। তাই ভালো মানের পণ্য সম্পর্কে জানা সম্ভব ভালো কোনো জায়গা থেকে ট্রেনিং করলে।

আসলে আমাদের যেমন জানতে হয় মানুষের শরীরের অ্যানাটমি ও ফিজিওলজি, তেমনি কেমিস্ট্রিও। তাই আমি অন্তত মনে করি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান ছাড়া এই পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করা উচিত হবে না। অবশ্য এটা যে কোনো পেশার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সঠিক শিক্ষার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ কারো অধীনে কিছুদিন অনুশীলন করে নিজেকে আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করে নেওয়া যেতে পারে। যদি তেমন সুযোগ থাকে বা পাওয়া যায়। বিশিষ্ট রূপবিশেষজ্ঞরা অনেক সময় কর্মশালা পরিচালনা করে থাকেন। সেগুলোতে অংশ নিয়ে নিজেকে আরও অগ্রবর্তী ও প্রত্যয়ী করে তোলা যায়।

এবার পেশা হিসেবে গ্রহণের বিষয়ে কিছু বলব। আমাদের দেশে একে পেশা হিসেবে নেওয়ার জন্য নিজেকেই প্রতিষ্ঠান খুলতে হয়। ফলে ব্যবসায়িক বিষয়ের আদ্যোপান্ত জানাও জরুরি। কারণ এই সার্ভিস সেক্টর অন্য আর দশটা ব্যবসাক্ষেত্রের চেয়ে কিছুটা হলেও আলাদা। এ বিষয়ে তো বটেই, সমকালীন বাজার পরিস্থিতি, ভোক্তার চাহিদা ইত্যাদি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। ভালো হয় বাজার জরিপ করে নিতে পারলে। এরপর প্রতিষ্ঠান খোলা। সেখানেও কথা আছেÑ এখন আর শূন্য হাতে শুরু করার কোনো সুযোগ নেই; বরং সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেই শুরু করতে হবে।

কারণ ঢাকা ও ঢাকার বাইরেও অনেক রূপসদন রয়েছে, যেগুলো সব দিক থেকেই স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাই প্রতিযোগিতায় নামার আগে খুঁটিনাটি সব গুছিয়ে পরিপাটি করে নিতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় সম্পূর্ণ বিনিয়োগ ভেস্তে যেতে পারে।

এখানে একটা পরামর্শ দেওয়া যেতে পারেÑ বর্তমানে একটি স্যালুনে বিভিন্ন ধরনের বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন হয়। তাই সমমনা বন্ধু বা আত্মীয়রা পৃথক বিষয়ে শিক্ষা নিয়ে একত্রে স্যালুন বা পার্লার খোলা যেতে পারে। তাতে দুই ধরনের সুবিধা হবে। এক. একার ওপর আর্থিক চাপ কমবে। দুই. ক্লায়েন্টরাও উন্নতমানের সেবা পাবেন।

আমি বা আমরা যে সময় শুরু করেছিলাম, তখনকার পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমানের তফাত আকাশ-পাতাল। এখন কোনো বাধা নেই। মানুষ পুরোপুরি সচেতন। ফলে এই একটা জায়গায় বর্তমান প্রজন্ম এগিয়ে রয়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে বাজারও প্রস্তুত। তাই এই সেবা খাতে নিজেকে নিয়োজিত করা যেতে পারে। মনোযোগ দিয়ে কাজ করলে স্বাধীন পেশাজীবী হিসেবে সৃজনশীল শিল্প খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার আনন্দও উপভোগ করা যায়। এই অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই সুখকর।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে