কিউপিড ও সাইকি

  শান্তা মারিয়া

০৭ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রেমের দেবতা কিউপিড ও আত্মার দেবী সাইকির কাহিনি রোমান পুরাণের উল্লেখযোগ্য প্রেমকাহিনি। মানবসন্তান হয়েও সাইকি তার ভালোবাসার বলে দেবীত্ব পেয়েছিলেন।

প্রেমের দেবী ভেনাসের পুত্র কিউপিড ছিলেন অসাধারণ সুন্দর তরুণ। তার সঙ্গে থাকত ফুলশর আর ধনুক। ফুলশর ছুড়ে তিনি যে কোনো মানুষ বা দেবতাকে যে কারো প্রেমে পড়াতে সক্ষম ছিলেন।

সাইকি ছিল এক রাজকন্যা। তার আরও দুই বোন ছিল। অন্য বোনরা বেশ সুন্দরী। তবে সাইকির সৌন্দর্য ছিল অনন্যসাধারণ। প্রজারা সাইকির সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে তাকে সৌন্দর্যের দেবী ভেনাসের মতো সম্মান করত। তারা ভেনাসের মন্দিরে না গিয়ে সাইকিকে পূজা করা শুরু করল। এতে ভেনাস গেলেন ভীষণ চটে। তিনি কিউপিডকে আদেশ দিলেন সাইকি যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট চরিত্রের ও কুৎসিতদর্শন লোকের প্রেমে পড়ে। মাতৃআদেশ পালন করতে সাইকির দিকে প্রেমতীর নিক্ষেপের প্রস্তুতি নিলেন কিউপিড। কিন্তু সাইকিকে দেখে তিনি এতই মুগ্ধ হলেন যে নিজেই নিজের তীরে ঘায়েল হয়ে পড়লেন। প্রেমদেবতা সাইকিকে বিয়ে করার জন্য পরিকল্পনা আঁটলেন। এদিকে দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেলেও সাইকির বিয়ে হলো না এবং তার প্রেমেও কেউ পড়ল না। অবশেষে রাজা অ্যাপোলোর মন্দিরের এক দৈববাণীর মাধ্যমে জানতে পারলেন সাইকির বর হবে এক ভয়ঙ্কর ব্যক্তি যার ভয়ে দেবতারাও আতঙ্কিত। সাইকিকে যেন বধূবেশে সাজিয়ে এক পাহাড়ের চূড়ায় রেখে আসা হয়। সেখান থেকেই সেই ভয়ঙ্কর দানব তাকে নিয়ে যাবে। রাজারানী এবং প্রজারা কাঁদতে কাঁদতে তাদের প্রিয় রাজকন্যাকে বিদায় জানিয়ে রেখে এলো এক পাহাড়ের চূড়ায়।

এদিকে কিউপিডের অনুরোধে পশ্চিম বায়ুর দেবতা জেফাইরাস ভয়ে অচেতন মেয়েটিকে নিয়ে গেলেন বহু দূরের এক সুরম্য প্রাসাদে। সকালে জেগে উঠে সাইকি দেখল সে শুয়ে আছে এক সুন্দর তৃণভূমিতে। সামনে তার এক আশ্চর্য প্রাসাদ। কারুকার্যময় সেই প্রাসাদের দিকে এগিয়ে গেল সে। প্রাসাদের দরজা খুলে গেল কিন্তু কাউকে দেখা গেল না। প্রাসাদের কক্ষগুলো সব সোনা দিয়ে মোড়া আর মণিমুক্তায় শোভিত। বিলাসবহুল আসবাবে তা সাজানো। মৃদু বাজনা বাজছে সেখানে। অদৃশ্য কণ্ঠে কেউ একজন বলল এ সবই গড়া হয়েছে শুধু সাইকির জন্য। বিস্মিত রাজকন্যা ঘুরে বেড়াল এ-ঘর থেকে ও-ঘরে। অদৃশ্য পরিচারকরা পরিবেশন করল সুস্বাদু খাদ্য পানীয়। তার সব রকম আরাম আয়েশের ব্যবস্থা ছিল সেখানে। তার জন্য প্রস্তুত করা পোশাক ও অলঙ্কার দেথে মুগ্ধ হয়ে গেল সে। অবশেষে রাত্রি নেমে এলো। আর গভীর রাতে অন্ধকারে সাইকির বর এলেন। যদিও সাইকি তার চেহারা দেখতে পেল না। কিন্তু অনুভব করল তার স্পর্শ মোটেই ভয়ঙ্কর নয় বরং আশ্চর্য মধুর।

এভাবে কিছুদিন কেটে গেল। প্রতি রাতেই স্বামীর সঙ্গে মিলিত হয় সে। স্বামী তাকে বিভিন্ন গল্প কথা আদর সোহাগে ভরিয়ে তোলে। দিনের বেলা তার কাটে প্রাসাদের বিভিন্ন আমোদ প্রমোদে। তবে একাকিত্ব কিছুটা বোধ করে সে। একদিন সাইকি তার স্বামীকে আনুরোধ করল তার দুই বোনের সঙ্গে যেন দেখা করতে পারে। স্বামী প্রথমে রাজি না হলেও পরে সাইকির অনুরোধ রাখতে রাজি হলেন। পর দিন জেফাইরাস দুই বোনকে নিয়ে এলেন প্রাসাদে। সাইকি তাদের দেখে আনন্দে কেঁদে ফেললেন। তারাও খুশি হলো ছোট বোনকে জীবিত দেখে। কিন্তু যখন তারা সাইকির প্রাসাদ, তার পোশাক আর অলঙ্কার দেখল, দেখল তার আরাম আয়েশ তখন ভীষণ ঈর্ষা হলো তাদের। তারা বারবার জানতে চাইল কে তাদের বোনের স্বামী আর এত ধনরতেœর মালিক। সাইকি এ কথার উত্তর না দিয়েই প্রচুর উপহার দিয়ে তাদের বিদায় করল। কিছু দিন পর আবার সাইকি তার বোনদের দেখতে চাইল। স্বামী এবারও বাধা দিলেন, পরে সাইকির অনুরোধ রক্ষা করতে রাজি হয়ে তাকে বারবার সাবধান করে দিলেন সে যেন বোনদের কথায় প্ররোচিত হয়ে এমন কিছু না করে যার ফলে তাদের মধ্যে চিরবিচ্ছেদ নেমে আসে।

পরদিন জেফাইরাস আগের মতোই বোনদের নিয়ে এলেন। এবার বোনরা এসেই জানতে চাইল ভগ্নিপতির পরিচয়। সাইকি আর গোপন করতে পারল না। সে জানালো স্বামীকে সে কখনো চোখে দেখেনি। তবে তার কণ্ঠস্বর খুবই মধুর। বোনরা এবার বলল সাইকির স্বামী নিশ্চয়ই দৈববাণীর সেই ভয়ঙ্কর দানব। নিশ্চয়ই ডানাওয়ালা কোনো ড্রাগন। সাইকিও বলল সে ডানার স্পর্শ পেয়েছে। এবার বোনরা তার হাতে তুলে দিল এক শাণিত ছুরি। বলল তোমার স্বামী যখন ঘুমিয়ে পড়বে তখন এই ছুরি আমূল বসিয়ে দেবে তার বুকে। তা হলেই মুক্তি মিলবে ড্রাগনের হাত থেকে আর ফিরে যেতে পারবে বাবা-মায়ের কাছে। বোনরা চলে যেতেই প্রস্তুত হলো সাইকি। আজ সে দেখবেই কে তার স্বামী, কেন সে লুকিয়ে রাখে নিজেকে অন্ধকারে। অবশেষে রাতের আঁধারে উড়ে এলেন স্বামী। আজ সাইকি তাকে অন্যদিনের মতো সাদর সম্ভাষণ জানালো না। বরং অপেক্ষা করতে লাগল কখন সে ঘুমায়।

নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে সে যখন বুঝল স্বামী ঘুমিয়ে পড়েছে সে আগে থেকে তৈরি রাখা একটি প্রদীপ জ্বেলে ছুরিটা হাতে নিয়ে দেখতে গেল রহস্যময় এই ব্যক্তিকে। প্রদীপের আলোয় তার চোখে পড়ল কোনো দানব নয় বরং সব দেবতার মধ্যে সুন্দরতম প্রেমের দেবতাকে। ছুরিটা হাত থেকে ফেলে দিয়ে সাইকি আরও কাছ থেকে দেখতে লাগল তার প্রিয়তমকে। কিন্তু সেই সময় তার হাত কেঁপে গিয়ে প্রদীপের গরম তেল গড়িয়ে পড়ল সেই নবনীত শরীরের ওপর। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে জেগে উঠলেন কিউপিড। তার পর ক্ষণকাল সাইকির দিকে তাকিয়ে চিরবিচ্ছেদের কথা শুনিয়ে উড়ে চলে গেলেন তার মায়ের কাছে।

সেই দুঃসহ রাত ভোর হলে সাইকি প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল তার প্রিয়তমের খোঁজে। দুনিয়াজুড়ে অনেক সন্ধানের পর সে জানতে পারল যে ভেনাসের কাছেই রয়েছে তার প্রেমিক স্বামী। ভেনাসের বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে অন্য দেবদেবীরাও কেউ তাকে সাহায্য করতে রাজি হলো না। শেষপর্যন্ত সরাসরি ভেনাসের কাছে গিয়ে হাজির হলো সাইকি। তাকে দেখে ক্রূর হাসি হাসলেন ভেনাস। তার পর সাইকিকে তার পরিচারিকা হিসেবে নিযুক্ত করলেন যাতে কঠোর পরিশ্রমে সাইকির রূপ নষ্ট হয়ে যায়। বললেন তিনটি কাজ করে দিলে স্বামীর দেখা পাবে সে।

প্রথম দিন ভোরবেলা তিনি সাইকিকে একটি বিশাল পাত্রে পৃথিবীর সব রকম শস্যবীজ মিশিয়ে বললেন সূর্যাস্তের আগেই সেগুলো সব আলাদা আলাদা করে বেছে ফেলতে। এই কাজ একান্তই অসম্ভব ভেবে সাইকি যখন কাঁদছিল তখন তার সাহায্যে এগিয়ে এলো পিঁপড়া বাহিনী। পিঁপড়ারা বেছে দিল সব শস্যবীজ। দিনশেষে সাইকির কাজ দেখে ভেনাস বললেন নিশ্চয়ই কেউ তোমাকে সাহায্য করেছে।

পরদিন ভেনাস সাইকিকে বললেন জঙ্গলের প্রান্তে যে স্বর্ণপশমধারী হিংস্র ভেড়ার পাল চরে বেড়ায় তাদের পশম সংগ্রহ করে আনতে। এর ফলে ভেড়াদের হাতে সাইকির মৃত্যু হবে ভেবে খুশি হলেন ভেনাস। এবার মেয়েটিকে সাহায্য করল নলখাগড়া। নলখাগড়ার পরামর্শ মতো কাঁটাগাছের গায়ে লেগে থাকা ভেড়ার পশম সংগ্রহ করল সাইকি। ভেনাস এদিনও তাকে তিরস্কার করে কঠিনতর এক কাজের ভার চাপালেন। তিনি বললেন বিশাল উঁচু ও দুর্গম এক পাহাড়ের চূড়া থেকে অমরত্বের ঝরনার পানি নিয়ে আসতে। সেই ঝরনা আবার পাহারা দিচ্ছে এক হিংস্র্র ড্রাগন। অগম সেই শিখরের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলল সাইকি। এবার তাকে সাহায্য করল দেবরাজ জুপিটারের ঈগল। মেয়েটির প্রতি দয়াপরবশ হয়ে ঈগল পাত্র ভরে পানি নিয়ে এলো সাইকির জন্য।

ভেনাস এবার সাইকিকে পাঠালেন এমন এক কাজে যে কাজে তার মৃত্যু নিশ্চিত। একটা বাক্স সাইকির হাতে দিয়ে তিনি বললেন মৃতদের রাজ্যের রানি পার্সিফোনের (রোমান নাম প্রসারপিনা) কাছ থেকে কিছুটা রূপ চেয়ে আনতে। এবার হতবিহ্বল সাইকিকে পরামর্শ দিল এক সুউচ্চ টাওয়ার। টাওয়ারের নির্দেশ মতো মৃত্যুপুরীতে এগিয়ে গেল সাইকি। মৃত্যুপুরীর পাহারাদার কুকুর সার্বেরাসের জন্য নিল দুটি মধুমাখা পিঠা আর স্টিক্স নদীর মাঝি ক্যারোনের জন্য দুটি তামার মুদ্রা।

মৃত্যুপুরীতে পৌঁছে পার্সিফোনের দিকে বাক্সটি বাড়িয়ে দিতেই তিনি বাক্সে কী যেন ভরে দিলেন। বাক্সটি নিয়ে মর্ত্যে ফিরে আসার পর সাইকির কৌতূহল হলো সেটি খুলে দেখার। সে ভাবল এখান থেকে সামান্য একটু রূপ সে নিজেই ব্যবহার করবে। কারণ এতদিনের কঠোর পরিশ্রমে তার রূপ নিশ্চয়ই অনেক কমে গেছে। এখন যদি কিউপিডের তাকে ভালো না লাগে। পথের ধারে বসে বাক্সটি খুলতেই সাইকির চোখে নেমে এলো মরণঘুম। পাথরের ওপর এলিয়ে পড়ল সে।

এদিকে কিউপিডের ক্ষত ততদিনে নিরাময় হয়েছে। সুস্থ হতেই স্ত্রীর খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিলেন তিনি। যেতে যেতে পথের পাশে সাইকিকে পড়ে থাকতে দেখে মুহূর্তে সব কিছু বুঝতে পারলেন তিনি। সাইকির চোখ থেকে মরণঘুম তুলে নিয়ে আবার তা ভরে রাখলেন বাক্সে। তার পর সাইকিকে নিয়ে সোজা হাজির হলেন দেবরাজ জুপিটারের সভায়। সেখানে ভেনাসসহ সব দেবদেবীই উপস্থিত ছিলেন। তাদের সামনেই সাইকিকে বিয়ে করার অনুমতি চাইলেন কিউপিড। জুপিটার রসিকতা করে বললেন এতদিন তোমার প্রেমের তীরে সবাইকে তুমি নাকাল করেছ। তবে এবার নিজেই প্রেমে পড়ে বুঝেছ এর কী যন্ত্রণা। জুপিটারের অনুরোধে সাইকিকে ক্ষমা করলেন ভেনাস এবং মেনে নিলেন পুত্রবধূ হিসেবে। অ্যাম্ব্রোজিয়া বা অমৃত খাইয়ে অমর করা হলো সাইকিকে। তাকে আত্মার দেবী পদে অভিষিক্ত করলেন জুপিটার। তার পর বিয়ের আনন্দ উৎসব শুরু হলো। এভাবে প্রেমের দেবতা আর আত্মার দেবী চিরদিন সুখে বসবাস করতে লাগলেন।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে