এপিঠ-ওপিঠ

  শাহনেওয়াজ চৌধুরী

০৭ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এ অফিসে আমার চাকরির বয়স এক বছরের বেশি। এ মুহূর্তে একদম ঠিকঠাক বলতে পারব না। বেতন বাড়ানোর সময় না হলে কি আর আমরা চাকরির বয়স হিসাবের পেছনে সময় দিই? কিন্তু সমস্যা এটা না। সমস্যা অন্যখানে। এ অফিসের বসের খাসলত নিয়ে।

নারী স্টাফের প্রতি বসের অন্য রকম নমনীয়তা। আর পুরুষ স্টাফরা যে খেটে খেটে হয়রান সেদিকে খেয়ালই নেই। অফিস চলাকালে অফিসের সব মেয়ের প্রতি বসের স্পেশাল আদিখ্যেতা। কোনো নতুন মেয়ে জয়েন করলে তো কথাই নেই! তার দিকে সুপারস্পেশাল নজর। একেক নারীর সঙ্গে একেকভাবে সখ্য বসের। তবে সব নারীর সঙ্গে তো সখ্য হয় না। সব নারী এক রকম নয়। কেউ কেউ বসকে খুশি করে ফায়দা লোটে। ফায়দায় তাদের বেতনের দ্বিগুণ-তিনগুণ আয়ের কথাও শোনা যায়। রিসেপশনে নতুন এক মেয়ে যোগ দিয়েছে। মেয়েটি চোখে লাগার মতো। রিসেপশনে এমন ফুলের মতো স্নিগ্ধ মেয়েকেই মানায়। অফিসে যাতায়াতে ওর দিকে আমার চোখ যাবেই।

আমি অবাক হইÑ এত বছরের চাকরিতে এ অফিসে এত মেয়ের সঙ্গে দেখা হলো, কিন্তু এই মেয়েটি চোখে লাগল কেন?

রিসেপশন থেকে মাঝে মাঝে ইন্টারকমে ফোন এলে মেয়েটির সঙ্গে কথা হয়। কোনো একদিন মেয়েটির হাতে বস আমাকে একটা ফাইল পাঠিয়েছিলেন। তখন মেয়েটির সঙ্গে কিছুটা আলাপ হলো। ইউনিভার্সিটি পেরিয়েছে মাত্র। চাকরিতে আসার কারণ একটা কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকা!

মেয়েটিকে নিয়ে যতই ভাবি ততই বসের কথা মনে পড়ে। এই মেয়েটি কবে বসের চোখে পড়বে।

আমার আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিল কদিনেই। দেখা গেলÑ অফিস টাইমে একাধিক বার বসের রুমে যায় মেয়েটি।

বসের রুমে রিসেপশনিস্টের কী এত কাজ? অন্য নারী অফিস স্টাফরা যায়, এটা না হয় মেনে নেওয়া যায়। এ প্রশ্ন শুধু আমার মনে নয়, সারা অফিসে ঘুরপাক খেতে লাগল। স্টাফদের মধ্যে কানাকানিও হতে লাগল। বিশেষ করে যে নারীরা বসের নিয়মিত সেবা করে তাদের আঁতে ঘা লাগাই স্বাভাবিক। নতুন রিসেপশনিস্ট নিতু আর বসের বিষয় তারাই রাষ্ট্র করেছে। ধরে নিলাম বসের সঙ্গে নিতুর অন্য কোনো সম্পর্ক নেই, অফিসিয়াল কাজেই সে বসের রুমে যায়। তবুও যুক্তি একটি থেকেই যায়Ñ রিসেপশনের সঙ্গে অফিসিয়াল কী এত কাজ?

এই যুক্তিটি আরেক কারণে প্রবল হয়ে ওঠে। মাঝে মাঝে বসের রুম থেকে বেরোনোর সময় অফিসের কোনো স্টাফের মুখোমুখি হয়ে গেলে নিতুকে বেশ অপ্রস্তুত মনে হয়। এ ক্ষেত্রে কেবল নিতুকে দোষ দিলে হবে কেন? অফিসের যে নারীরা বসের স্পেশাল শুভাকাক্সক্ষী তাদের প্রত্যেকের একই অবস্থা।

বসের নারীপ্রীতি অফিসের অনেক কাজে প্রভাব ফেলে। এতে অন্য স্টাফদের কাজে বিঘœ ঘটে। এই যেমন একটা জরুরি ফাইল বসকে দেখাতে হবে, কিন্তু তার রুমের দরজার ওপরে লালবাতি জ্বলছে। লালবাতির অর্থ বসের রুমে ঢোকা যাবে না। স্টাফদের বিরক্তির শেষ নেই। কেননা অনেক কাজে বিলম্ব হয় বসের কারণে, কিন্তু কাজে দেরি হয়ে গেলে তিনি দায় নিতে চান না। এ কারণে কখনো কখনো অনেকে দরজায় টোকা দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দেন। যেন পরবর্তী সময়ে দোষারোপ করলে বলতে পারেনÑ ‘স্যার, আমি তো আপনার রুমের সামনে গিয়েছিলাম। কিন্তু আপনার রুমের দরজা বন্ধ ছিল। কয়েকটা টোকাও দিয়েছিলাম। দরজা খোলেননি। আমার কী দোষ বলেন স্যার?’

অফিসের পিয়ন জমির মিয়া তো আরও ভয়াবহভাবে বসের অভিযোগ এড়াতে চেষ্টা করে। হয়তো এমন হলোÑ বস চা-কফি কিছু চেয়েছেন। জমির মিয়া চা-কফি নিয়ে যাওয়ার আগেই বসের রুমে হয়তো বসের শুভাকাক্সক্ষী কোনো নারী স্টাফ ঢুকেছে। যথারীতি বসের রুমের দরজা বন্ধ। লালবাতি জ্বলছে। জমির চা-কফি নিয়ে ঢুকতে পারল না। পরে বস যেন ধমকাতে না পারেনÑ ‘তোকে কখন কফির কথা বলেছিলাম হারামজাদা? খবর নেই।’

‘আমি তো ছার কফি নিয়া গেছিলাম। কিন্তু আপনার রুমের দরজা বন্ধ ছিল।’

‘মিথ্যা বলিস না। তুই যে কত বড় ফাঁকিবাজ তা কি আর আমি জানি না?’

এখন এ রকম পরিস্থিতিতে জমির মিয়া বসের রুমের সামনে চা-কফির ট্রে রেখে আসে। যেন রুম থেকে বেরোলে বসের চোখে পড়ে যায়। তা হলে আর জমির মিয়াকে অভিযুক্ত করতে পারবে না।

বসের আচরণ ইদানীং বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছেছে। সব সময় খিটখিটে মেজাজে থাকেন। কারণ আজকাল শুধু তার দরজার ওপরে লালবাতি জ্বলে না। বাড়ি, ব্যবসায়ও লালবাতি জ্বলতে শুরু করেছে। এর কারণ তার মাত্রাতিরিক্ত নারীপ্রীতি। কেউ কেউ ঠাট্টাচ্ছলে বলেÑ ডোজ বেশি পড়ে গেছে!

বসের অবস্থা লেজে-গোবরে পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা কয়েকজন কলিগ সিদ্ধান্ত নিলামÑ চাকরি ছেড়ে দেব। নিজেরাই একটা ফার্ম দেব। এভাবে আর কত? মাইনে ঠিকমতো পেলেই তো ল্যাঠা চুকে গেল না, ব্যক্তিত্বও টেকাতে হবে। এ অফিসে মর্যাদা তলানিতে নেমেছে। কিন্তু নিতুর কথা ভাবলে আমার চাকরি ছাড়তে ইচ্ছে করে না। তাই কলিগদের কথা দেইনি এখনো।

এখন একটা অদ্ভুত কথা বলবÑ এক সকালে টয়লেটে ঢুকে মাত্র কমোডে বসেছি, খুব তাড়া; অমনি বিষয়টা মাথায় এলো। নিতুকে নিয়ে এত চিন্তার কী আছে? আমরা নতুন ফার্ম করলে সেখানকার রিসেপশনে ওকে নিয়োগ দিলেই তো হয়।

কমোডে বসেই মুহূর্তে একটি প্রশ্ন মনে জাগলÑ বসকে জড়িয়ে নিতুকে নিয়ে এত কিছু জানার পরও ওর প্রতি এতটা মোহ কাজ করে কেন? একদিন তো আমি নিজেই বসের রুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজার ছিটকিনি লাগানোর শব্দ শুনেছি আমি! তাতেই বোঝা হয়ে গেছেÑ শুধু বসের দোষ দিয়ে লাভ নেই, নিতুরও কিছুটা আগ্রহ আছে।

দুই. প্রথম দিকে রাজি হচ্ছিল না নিতু। অনেক বুঝিয়ে তবেই রাজি করিয়েছি।

নিতু জয়েন করার পর কলিগরা সুযোগ পেলেই আমাকে টিপ্পনী কাটে। আমি সয়ে যাই। তবে নিতুর প্রতি আমার দুর্বলতা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। ওকে ঘিরে আগের অফিস এবং এই অফিসের মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতির তুলনা করছি।

এর মাঝে মনে হলোÑ আমি যে ওকে পছন্দ করি নিতু কি আন্দাজ করতে পারে? সে যদি না-ই জানতে পারে তা হলে আমার ভেতরের তোলপাড়ে লাভ কী?

শুনে অবাক হলো না নিতু। এমন কিছু শোনার জন্য তার মানসিক প্রস্তুতি যেন আগেই ছিল। তাই তেমন আগ্রহ দেখাল না। এটা তার কোনো কৌশল কিনা কে জানে!

আমি অপেক্ষায় থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু মাঝে মাঝে নিতুকে জানান দেই আমি তাকে পছন্দ করি।

ধরি মাছ না ছুঁই পানি কৌশলে নিতু। আমার ধৈর্য সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

একদিন অফিস থেকে প্রায় সবাই বেরিয়ে গেছে। আমাদের নতুন ফার্ম। অফিসের বাইরে কমিউনিকেশনের জন্য যেতে হয়। এ কারণে আমাদের শেয়ারহোল্ডার বা স্টাফরা সপ্তাহে এক-দুদিন অফিস ছুটির বেশ আগে বেরিয়ে যায়।

এ রকম এক নিরিবিলি দুপুরে নিতুকে আমার রুমে ডাকলাম। নিতু এলো অনেক পরে। সে কি ইচ্ছের বিরুদ্ধে এলো?

রুমে ঢুকেই নিতুর সে কী রুদ্রমূর্তি!

‘আমাকে এভাবে ডেকেছেন কেন?’

‘কীভাবে?’

‘অফিসে কেউ নেই। এই সুযোগে...’

‘তুমি বাড়িয়ে বলছ নিতু। কেউ নেই কে বলল? পিয়ন-দারোয়ান, অ্যাকাউন্টস ক্লার্ক এখনো অফিসে।’

কপাল কুঁচকে নিতু বলল, ‘দেখুন, আমাকে যেমন ভেবেছেন আমি কিন্তু তেমন মেয়ে নই।’

নিতুর কথা শুনে ভেতরে ভেতরে বেশ ঠাট্টা অনুভব করলাম। মেয়েটি বলে কী! এ তো দেখছি পুরোপুরি অন্যরূপ! এপিঠ এক রকম, ওপিঠ আরেক রকম। যে মেয়েকে নিজের চোখে দেখেছি বসের রুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করতে; সে মেয়ে কিনা...

প্রচ- মেজাজ বিগড়াল। ইচ্ছে হলো ওর মতের বিরুদ্ধে হলেও জাপটে ধরে ওর যাবতীয় অহঙ্কার মাটিতে লুটিয়ে দেই। জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছেÑ আগের অফিসে ছুটির পরও বসের সঙ্গে তার রুমে সময় কাটিয়েছ, বসের পিওনের কাছে শোনা সে কথা কি মিথ্যে? মাঝে মাঝে অনেক রাত করে বসের রুম থেকে বেরিয়ে অফিস ছেড়েছ, সে কথা কি আমরা জানি না? বসের রুমে ঢুকতে লাল লিপস্টিক মেখে, বেরোনোর সময় অন্য রঙের লিপস্টিকেÑ এসব বুঝি কারো চোখে পড়েনি?

আমি অবাকÑ নিতু বুঝতে পারছে না, বসের সঙ্গে তার বাড়াবাড়ি রকম অন্তরঙ্গতার কথা জেনেও তাকে

আমি চাইছি!

মুহূর্তে টং করে একটি শব্দ হলো মগজেÑ এত কিছু জেনেও নিতুকে আমি চাইছিইবা কেন?

মন খারাপ হলো খুব। নিতুর প্রতি মন এতটা দুর্বল হলো কেন? হিবিজিবি অনেক কথা চিন্তা করতে করতে নিজের ওপর খুব বিরক্তি জমে গেল। কেন যেন মনে হলোÑ এ থেকে মুক্তির উপায় আত্মহত্যা!

রাতে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিতেই মনে হলোÑ আমি যেন অন্য কোনো গ্রহে। হাওয়ায় ভাসছি।

তিন. আমার কোনো দুঃখ নেই। কেননা আমি আর নিতুকে চাই না! এখন আর চাইলেও তা সম্ভব নয়।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে