বিএনপিতে ২ হেভিওয়েট, মহাজোটে মহাজট

  আল মামুন, বরিশাল ও আরিফুর রহমান, বাবুগঞ্জ

১০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:৩২ | প্রিন্ট সংস্করণ

বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে লেগেছে তুমুল জট। আসনটিতে মহাজোটের মনোনয়ন চাইছে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও ওয়ার্কার্স পার্টি। গত দুই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ও ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী মহাজোটের মনোনয়ন নিয়ে জয়ী হয়েছেন।

তবে আসছে নির্বাচনে ছাড় দিতে যেমন চাইছে না আওয়ামী লীগ, তেমনি বর্তমান এমপির বিরোধী হয়ে মাঠে রয়েছেন একটি বিশাল গ্রুপ। অপরদিকে বিএনপিতে দুই হেভিওয়েট প্রার্থী দীর্ঘদিন ধরে আসনটির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে নিতে দুটি গ্রুপ নিয়ে মাঠে রয়েছেন।

জানা গেছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে সীমানা পুনর্নির্ধারণের কারণে বাবুগঞ্জের সঙ্গে মুলাদী যুক্ত হয়ে বরিশাল-৩ আসন গঠন করা হয়। এর আগে উজিরপুর ও বাবুগঞ্জ উপজেলা নিয়ে ছিল বরিশাল-৩ আসন। তখন মুলাদী ছিল বরিশাল-৪ আসনে। ১৯৯১ সাল থেকে এ আসনে একটানা তিনবার নির্বাচিত হন বিএনপির মোশারফ হোসেন মঙ্গু। সেলিমা রহমানের বাড়ি বাবুগঞ্জ এবং মোশারফ হোসেন মঙ্গু ও অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের বাড়ি মুলাদী হওয়ায় বর্তমান বরিশাল-৩ আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

রাশেদ খান মেননের বাড়ি বাবুগঞ্জ হওয়ায় এ আসনে ওয়ার্কার্স পার্টির সাংগঠনিক অবস্থাও বেশ মজবুত। মেনন ১৯৯১ সালে এ আসনে নির্বাচিত হন। বড় মাপের কোনো নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী না হলেও দুই মেয়াদে দল ক্ষমতায় থাকায় এ আসনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থাও শক্তিশালী।

বাবুগঞ্জ ও মুলাদীর রাজনীতি সচেতন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে বিএনপিতেও। ২০০৮ সালে এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পান সেলিমা রহমান। নির্বাচনে বিজয়ী হন মহাজোট মনোনীত জাতীয় পার্টির প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া টিপু।

২০১৪ সালের বিএনপিবিহীন নির্বাচনে মহাজোটের দুই শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় পার্টির কাড়াকাড়ির কারণে আসনটি উন্মুক্ত করে দেয় আওয়ামী লীগ। দুই শরিক দলের নির্বাচনী যুদ্ধে জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপুকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক শেখ টিপু সুলতান। এবারও টিপু সুলতানকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। কিন্তু তাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে দলের তৃণমূলে। গত সেপ্টেম্বরে জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির ওই ঘোষণার প্রতিবাদে বাবুগঞ্জ ও মুলাদী উপজেলা নেতাকর্মীদের একটি অংশ তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলন করে তৃণমূলের মতামতকে উপেক্ষা করার অভিযোগ করেন।

স্থানীয় ওয়ার্কার্স পার্টির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এমপি টিপু সুলতানকে দিয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচনের বৈতরণী পার করতে পারবে না ওয়ার্কার্স পার্টি। তাদের অভিযোগ, গত পাঁচ বছরে টিপু সুলতানের সঙ্গে নেতাকর্মীদের সম্পর্ক ভালো যায়নি। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শেখ টিপু সুলতান এমপি।

জানা যায়, এ অবস্থায় নেতাকর্মীদের বড় অংশটি মাঠে নিয়ে এসেছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের ব্যক্তিগত সহকারী ও ওয়ার্কার্স পার্টির যুব সংগঠন যুবমৈত্রীর কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আতিকুল ইসলাম আতিককে। তিনিও স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার আগাম ঘোষণা দিয়ে মাঠে গণসংযোগ করছেন জোরেশোরে।

এ ছাড়া আসনটিতে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী না থাকায় দলটির অনেক নেতাকর্মী আতিকের সঙ্গে মাঠে নেমেছেন। আতিক দাবি করেন, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যুবমৈত্রীর কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে সারাদেশের ১০ মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকা ওয়ার্কার্স পার্টির নীতিনির্ধারকদের কাছে জমা দিয়েছেন। ওই তালিকায় তারও নাম আছে। এদিকে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টিও সাবেক এমপি গোলাম কিবরিয়া টিপুকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।

আগামী নির্বাচনে আসনটিতে ক্ষমতাসীন দলের চেয়ে বিএনপি জোট থেকে কে মনোনয়ন পাচ্ছেন তার দিকেই তাকিয়ে সাধারণ জনগণ। আসনটির মুলাদী উপজেলা বিএনপিকে জয়নুল আবেদীন ও বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন সেলিমা রহমান।

একসময় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পাশে সার্বক্ষণিক থাকা সেলিমা রহমানকে নিয়ে শুধু নির্বাচনী আসনেই নয়; গোটা দক্ষিণাঞ্চলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। বর্তমান সরকারের মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের ছোটবোন সেলিমা রহমান। এ জন্য দলের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত তাকে নিয়ে নানা কথা চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।

এদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিমকোর্ট বারের সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন খালেদা জিয়ার মামলাসহ আইন-আদালতে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের নেতৃত্ব দেওয়ায় তার অবস্থান শীর্ষ থেকে তৃণমূলে অনেক প্রশংসা পাচ্ছে।

বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সহসভাপতি অধ্যাপক শরিয়তউল্লাহ আমাদের সময়কে বলেন, দলের দুই ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন ও সেলিমা রহমান এ আসনে মনোনয়ন চাইবেন। তবে জয়নুল আবেদীনকে ছাড়া এ আসনটি উদ্ধার করা বিএনপির পক্ষে অসম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, দেড় যুগ ধরে তিনি নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। এ আসনের সাবেক তিনবারের এমপি মোশারফ হোসেন মঙ্গুও আমার সঙ্গে রয়েছেন। আমি ছাড়াও আরও দু-একজন দলের মনোনয়ন চাইবেন। দল নির্বাচনে গেলে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত দেবেন স্বয়ং চেয়ারপারসন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক প্রতিমন্ত্রী সেলিমা রহমান জানান, তিনি দলের কাছে মনোনয়ন চাইবেন। দলে একাধিক প্রার্থী থাকতেই পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে দলের মনোনয়ন বোর্ড।

সাবেক এমপি গোলাম কিবরিয়া টিপু জানান, বাবুগঞ্জ ও মুলাদীতে জাতীয় পার্টি এখন তৃণমূল পর্যায়ে সুসংহত। তিনি প্রতি সপ্তাহে নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে গণসংযোগ করেন। গত নির্বাচনে তিনি মহাজোটের সমর্থন পেলেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে হেরে যান ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ মোহাম্মদ টিপু সুলতানের কাছে। ওই নির্বাচন নিয়ে একজন মন্ত্রী প্রভাব খাটিয়ে তার দলের প্রার্থীকে বিজয়ী করেছেনÑ এমন অভিযোগ এনে নির্বাচনের দিন দুপুর ১২টায় ভোট বয়কট করেন। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে ইট মারলে পাটকেলটি খেতে হবে। শক্তভাবে যে কোনো কূটকৌশল মোকাবেলা করা হবে।

এদিকে এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইছেন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও সাবেক সচিব সিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ ও যুবলীগের কেন্দ্রীয় সহসম্পাদক মিজানুর রহমান।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে