১ কোটি ২৩ লাখ তরুণের হাতে অনেক কিছু

  আসাদুর রহমান

২৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০২:০১ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ তরুণ ভোটার। যারা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও নতুন ভোটার ছিল প্রায় ১ কোটি ৩৭ লাখ। এ বছর ৩০ বছরের নিচে ভোটারের সংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি। গড় হিসেবে এ তরুণ ভোটারদের সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ। এসব তরুণ দেশের উন্নয়ন ও নিজেদের অধিকারের বিষয়ে বেশ সচেতন। সম্প্রতি কোটা সংস্কারের আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও তরুণদের সমর্থন ছিল। এর আগে গণজাগরণ মঞ্চের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে অনড় ছিল তরুণরাই। এ ছাড়া সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা ৩৫ করার দাবিতেও মাঝে সোচ্চার ছিলেন তরুণ সমাজ। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীদের জয়-পরাজয়েও তরুণ ভোটাররা বড় ফ্যাক্টর হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে মোট ভোটারসংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮১। এর মধ্যে পুরুষ ৫ কোটি ২৫ লাখ ১২ হাজার ১০৫ এবং নারী ৫ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ২৭৬ জন। ২০১৮ সালে ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ৪৬ লাখ ৫৫ হাজার ৫৪৫ জন। ভোটারের এ সংখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবার প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে ভোট দেবেন ১ কোটি ২১ লাখ ৭৭ হাজার ২১৪ জন।
নির্বাচনসংশ্লিষ্টদের মতে, তরুণ ভোটাররা আগামী সংসদ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে মুখ্য ভূমিকা রাখবেন। কারণ মোট ভোটারের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ তরুণ। যাদের অধিকাংশই শিক্ষিত ও আধুনিক বিশ্ব সম্পর্কে ধারণা রাখেন। দেশের উন্নয়ন বিবেচনায় তারা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। তাই এবার তরুণদের ভোট যে দল এবং প্রার্থী বেশি পাবে,

তাদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকবে।
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ইশতেহারে বলা হয়Ñদেশ ও জনগণের সামগ্রিক কল্যাণ ও উন্নতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’ এই সেøাগানকে ধারণ করে ইনশাল্লাহ নিরলসভাবে কাজ করবে। ৩৩ দফা সেই ইশতেহারে বেকার যুবশক্তিকে  দেশে উৎপাদনশীল কর্মকা-ে এবং বিদেশে কর্মসংস্থানে সক্ষম করতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, ঋণ-সহায়তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়। এ ছাড়া তরুণদের জন্য তেমন কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না।
অন্যদিকে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইশতেহার ছিলÑদিনবদলের সনদ। সেই ইশতেহারে বলা হয়েছিলÑদেশের প্রতিভাবান তরুণ ও আগ্রহী উদ্যোক্তাদের সর্বতোভাবে সহায়তা দিয়ে সফটওয়্যার শিল্প ও আইটি সার্ভিসের বিকাশ সাধন করা হবে। এতে রপ্তানি বাড়বে এবং ব্যাপক কর্মসংসস্থানের ব্যবস্থা হবে। ২০২১ সালের লক্ষ্য হলো ডিজিটাল বাংলাদেশ। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকার করা হয়। সে সময় তরুণরা আওয়ামী লীগের অঙ্গীকারে আস্থা রেখে নৌকায় ভোট দিয়েছিল। যার প্রমাণ মেলে ২০১৩ সালে। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে শাহবাগে অবস্থান নেয় লাখো তরুণ। তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কোটি বাঙালি।
এদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের চলতি মেয়াদের শেষভাগে এসেও তরুণরা নিজেদের দাবি আদায়ে একত্রিত হয়। গত অক্টোবরে সরকারি চাকরিতে প্রবেশে কোটা সংস্কারের দাবিতে মাঠে নামে প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী। যারা সবাই একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে। সরকার তাদের দাবি মেনে নিয়ে কোটা পদ্ধতি বিলুপ্ত করে।
এর পর চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষভাগে সড়কে শৃঙ্খলার দাবিতে মাঠে নামে স্কুলের শিক্ষার্থীরা। এসব শিক্ষার্থী ভোটার না হলেও তাদের আন্দোলনে প্রায় সবাই সমর্থন জানায়। সরকারবিরোধীদের পক্ষ থেকে এ আন্দোলনে ইন্ধন ও গুজব ছড়ানো হয়। তবে সেই আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ ও দাবি পূরণে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয় সরকার।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আমল মজুমদার বলেন, ২০০৮ সালে বর্তমান সরকারকে কিন্তু তরুণরা ভোট দিয়েই নির্বাচিত করেছিল। দিন বদলের ইশতেহারে বিশ্বাস রেখে সে সময় তরুণ ও নিরপেক্ষ ভোটাররা বর্তমান সরকারকে ভোট দিয়েছিল বলেই তারা জয়ী হয়েছে। বর্তমান তরুণরা অনেক সচেতন। তারা নিজেদের কর্মসংস্থান ও সমান অধিকারের বিষয়ে বেশি সচেতন।
ইসির তথ্য অনুসারে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের সময় ভোটার ছিল ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ১৬৭ জন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে নবম সংসদ নির্বাচনের সময় দেশে মোট ভোটার ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার। নবম সংসদ নির্বাচনের পর থেকে এখন পর্যন্ত গত ১০ বছরে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২৫ লাখের মতো ভোটার অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন তালিকায়। এ সময় ভোটার বেড়েছে ২ কোটি ৩০ লাখ ৫৫ হাজার ৩৭৮ জন। যাদের মধ্যে ১ কোটি ২১ লাখ ৭৭ হাজার ২১৪ ভোটার প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।
ভোটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নবম সংসদ নির্বাচনে জয়ী দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছিল মোট ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৩৪ হাজার ৬২৯ ভোট। আর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছিল ২ কোটি ২৭ লাখ ৫৭ হাজার ১০০ ভোট। সেবার নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা একবাক্যে স্বীকার করেছিলেন, তরুণ ভোটার আওয়ামী লীগের এই জয়ে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। যার ধারা বজায় ছিল দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তরুণ ভোটারদের ভোটাধিকারচর্চা বাড়াতে হবে। তাদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। তরুণ ভোটাররা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে জয়-পরাজয়ে ভূমিকা রাখতে পারবেন। তবে তাদের কাছে টানতে রাজনৈতিক দলগুলোকে যথাযথ ইশতেহার দিতে হবে।
একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঘোষিত ইশিতেহারে তরুণদের কাছে টানতে দিয়েছে প্রতিশ্রুতি। আওয়ামী লীগের ইশতেহারের শুরুতেই তারা ঘোষণা করেছে তারুণ্যের শক্তিÑবাংলাদেশের সমৃদ্ধি : তরুণ যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিকে রূপান্তরিত করা এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। এ ছাড়া সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে দলটি।
অন্যদিকে বিএনপি সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত তরুণদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ইয়ুথ পার্লামেন্ট গঠন করার ঘোষণা দিয়েছে।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে