দেশে-বিদেশে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল রিজার্ভ চুরি

  হারুন-অর-রশিদ

৩১ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০ | আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৫:১৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

চলতি বছরে দেশে বিদেশে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চুরির ঘটনা দেশে বিদেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। বছরের অনেক সময়ই রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি বিশ্ব মিডিয়ায় সংবাদ শিরোনাম হিসেবে এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাইবার চুরির ঘটনা ঘটলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি এটিই প্রথম। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে বিশ্বের আর্থিক খাত এই ঘটনাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। এই ঘটনার পর এর দায় এক পক্ষ অন্য পক্ষের ওপর চাপাতে ব্যস্ত ছিল। ফলে এই ঘটনার পেছনে কারা দায়ী সেটি এখনো শনাক্ত করা হয়নি। শনাক্ত করার কোনো চেষ্টাও নেই। যাদের শনাক্ত করার কথা তারাও দায় সাড়া তদন্ত করছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। রেকর্ড রিজার্ভের কারণে বাংলাদেশে না যেটুকু আলোচনায় এসেছে, তার চেয়ে বেশি এসেছে চুরির কারণে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে চোররা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০০ কোটি ডলার চুরির চেষ্টা করে। বিনা বাধায় ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করতে সক্ষমও হয়। চুরির একটি মাধ্যম থেকে ২ কোটি ডলার উদ্ধার করা গেলেও মূল চোর এখনো অধরা রয়ে গেছে। বাকি অর্থের মধ্যে দেড় কোটি ডলার ফিলিপাইন থেকে ফেরৎ পাওয়া গেছে। বাকি ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার এখনো অধরাই রয়ে গেছে।

রিজার্ভের লেনদেন হয় সুরক্ষিত সুইফস সিস্টেমে। অর্থ স্থানান্তরের প্রতিটি ধাপই

ইউনিক কোড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ডিজিটাল চোরের দীর্ঘদিন ধরে ছদ্মবেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট সিস্টেমের সব ধরনের ইউনিক কোড নিজেদের আয়ত্তে নেয়। সুযোগ বুঝে ওই ইউনিক কোড ব্যবহার করে ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে পাঠানোর জন্য মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম অব নিউইয়র্ককে নির্দেশ দেয়। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরযোগ্য ১০০ কোটি ডলার রক্ষিত ছিল। একসঙ্গে এত ডলার স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়ায় বিষয়টি সন্দেহজনক মনে করে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিশোধ নির্দেশগুলো আটকে দেয়। কিন্তু ৩৫টি নির্দেশের মধ্যে ৪টি নির্দেশ আগেই কার্যকর করে তারা। যে কারণে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে চলে যায়। প্রাপক প্রতিষ্ঠানের নামের বানান ভুলের কারণে শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২ কোটি ডলারের পরিশোধ নির্দেশ কার্যকর না করে তা আটকে দেয়। কিন্তু ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হয়ে স্থানীয় রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) একটি শাখার কয়েকটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে গ্রাহকের হাতে চলে যায়।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি ঘটে নজিরবিহীন ওই ঘটনাটি। গণমাধ্যম, এমনকি সরকারের কাছেও গোপন রাখেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান। ফিলিপাইনের একটি গণমাধ্যমে বিষয়টি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় গত ২৯ ফেব্রুয়ারি।। এরপর মার্চের প্রথম সপ্তাহে দেশের গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ হলে সরকারসহ সবমহল জানতে পারে। নজিরবিহীন এ ঘটনায় বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব তোলপাড় হয়ে যায়। দেশি-বিদেশি সব গণমাধ্যমে এই বিষয়ে খবর প্রকাশিত হতে থাকে। এই তথ্য গোপন করার দায়ে গত ১৫ মার্চ পদ ছাড়তে বাধ্য হন ড. আতিউর রহমান। অন্যদিকে দুই ডেপুটি গভর্নর আবুল কাসেম ও নাজনীন সুলতানাকে অপসারণ করে সরকার। নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান ফজলে কবির। বড় চুরির পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও ঘটে বড় পরিবর্তন।

এই ঘটনাটি বিশ্বের ১১টি সংস্থা তদন্ত করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকার গঠিত তদন্ত কমিটি, র‌্যাব ও সিআইডি। ফিলিপাইনের বিচার বিভাগ, কংগ্রেস কমিটি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও এন্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) বিষয়টির তদন্ত করে। আমেরিকার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এবং শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও পুলিশ বিভাগ।

চুরির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) জুপিটার শাখার ব্যবস্থাপকসহ কয়েক কর্মকর্তাকে বহিস্কার করা হয়। ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন কয়েক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। সিনেট শুনানিতে অংশ নিয়ে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ক্যাসিনো মালিক জাঙ্কেট ব্যবসায়ী জিম ইয়ং কিম প্রায় দেড় কোটি ডলার ফেরত দেয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ দেড় কোটি ডলার ফেরতও পেয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাইবার চুরির ১০ মাস পার হয়েছে। চুরির বিষয়ে সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে ছয় মাস আগে। তবে বারবার তারিখ নির্ধারণ করেও শেষ পর্যন্ত তা প্রকাশ করেনি সরকার। এ ঘটনার জন্য প্রকৃত দোষী কে এটি যেমন জানা যাচ্ছে না, তেমনি তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া যাচ্ছে না। আর অন্যদিকে ঘটনায় কী ঘটছে সে বিষয়ে সাধারণ মানুষ এখনো অন্ধকারে। ঘটনার দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো কেউই নিশ্চিত নয় কবে নাগাদ চুরি হয়ে যাওয়া অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে সেটি নিয়ে কেউ কিছু বলতে পারছে না।

তবে সম্প্রতি বিদেশি একটি গণমাধ্যমে খবর এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিতে বাংলাদেশ ব্যাংকেরই পাঁচ কর্মকর্তার কর্মে অবহেলা ও অসর্তকতাকে দায়ী করেছে তদন্ত কমিটি। তবে ওই প্রতিবেদনে দায়ী কর্মকর্তাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

ঘটনার তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। তাদের তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। সম্প্রতি তারা বলছে, ঘটনার সঙ্গে ২৩ বিদেশিকে তারা শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েক কর্মকর্তা জড়িত।

সামান্য অংশ উদ্ধার হলেও বাকি অর্থ উদ্ধারে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অর্থ উদ্ধারে গত নভেম্বর আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে ৬ সদস্যের প্রতিনিধিদল ফিলিপাইন সফর করেছেন। এতেও তেমন কোনো সাফল্য পাওয়া যায়নি। এখন উল্টো চুরিতে সহযোগিতার দায়ে অভিযুক্ত ফিলিপাইনের আরসিবিসি দাবি করেছে, তারা এই চুরির সঙ্গে জড়িত নয়। ওই অর্থও তারা ফেরৎ দেবে না। এদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা জানান।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে