বছরজুড়ে আলোচনায় জঙ্গি

  শাহজাহান আকন্দ শুভ

৩১ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০ | আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৫:৩২ | প্রিন্ট সংস্করণ

উগ্রপন্থি ও জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থানের বছর ছিল বিদায়ী বছর ২০১৬ সাল। বছরজুড়েই থেমে থেমে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। যে কারণে সারা বছরই আলোচনায় ছিল সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ। গত বছর ২০১৫ সালে নব্য ধারার জেএমবি সদস্যরা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রেকর্ডসংখ্যক জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটায়। তারা বোমা হামলা চালায় মসজিদ, মন্দির, শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্থাপনা, নৌবাহিনীর ঘাঁটি, মেলাসহ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায়। জঙ্গি হামলায় প্রাণ যায় দেশি-বিদেশি নাগরিকের। ২০১৫ সালের মতো বিদায়ী বছর ২০১৬-তেও নব্য ধারার জেএমবির জঙ্গি হামলা অব্যাহত থাকে। তবে গত বছর নব্য ধারার জেএমবি আলোচনায় আসেনি। চলতি বছরের পহেলা জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর প্রথম আলোচনায় আসে নব্য ধারার জেএমবি এবং এই সংগঠনের শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরী। যে হামলার পর দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হয়। চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বাংলাদেশে থাকা বিদেশিরা। হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলা বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদের ক্ষেত্রে নতুন বার্তাও দিয়ে যায়। এ ঘটনার পর র‌্যাব-পুলিশের টানা অভিযান চলমান থাকায় আর কোনো বড় হামলা চালাতে পারেনি জঙ্গিরা। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এবং জেএমবির মধ্যে জঙ্গি হামলায় এগিয়ে ছিল জেএমবি সদস্যরা।

দেশে-বিদেশি আলোচিত এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে হলি আর্টিজানে। পহেলা জুলাই দিনগত রাতের ওই জঙ্গি হামলায় ১৭ বিদেশিসহ ২০ জন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এ হামলার পর দেশজুড়ে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা শুরু হয়। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি বিদেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশে বসবাসরত তাদের নাগরিকদের জন্য একের পর এক ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে। সেই রাতে নব্য ধারার প্রশিক্ষিত ৫ জঙ্গি হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় প্রবেশের আধা ঘণ্টার মধ্যে ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনকে হত্যা করে। প্রথমে গুলি ও পরে প্রত্যেকের গলা কেটে জবাই করে মৃত্যু নিশ্চিত করে জঙ্গিরা। তারা নিহতদের রক্তাক্ত ছবিও তোলে। সেই ছবি ভাইরাল হয়ে যায়। আইএসের পক্ষে এই হামলার দায়ও স্বীকার করা হয়। পরের দিন সকালে সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ড’ অভিযানের মাধ্যমে নিবরাস ইসলাম, রোহান ইমতিয়াজসহ পাঁচ জঙ্গি ও এক সন্দেহভাজন নিহত হয়। এ হামলার পরই প্রথম তথ্য বেরিয়ে আসে শুধু মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরাই জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত, তা কিন্তু নয়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষিত শিক্ষার্থীরাও জঙ্গিবাদে জড়িত। এর পর সরকার সিদ্ধান্ত নেয় ১০ দিন কোনো শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকলে তা যেন সরকারকে জানানো হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরির কাজও শুরু করে। পরে তালিকা ধরে শুরু হয় নিখোঁজদের খোঁজার কাজ। এ ছাড়া জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে একটা গণজাগরণ ও জনসচেতনতা তৈরি হয়।

হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার রেশ না কাটতেই ৭ জুলাই কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদ জামাতের অদূরে জঙ্গি হামলা চালায় তামিম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন নব্য জেএমবির সদস্যরা। ওই হামলা চালানোর আগেই সরকারের কাছে বার্তা যায় শোলাকিয়া ঈদ জামাতে জঙ্গি হামলা হতে পারে। এই আগাম তথ্য পেয়েই র‌্যাব-পুলিশ ওই ঈদ জামাত ঘিরে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে। ফলে ঈদ জামাতের ধারে-কাছে ঘেঁষতে পারেনি জঙ্গিরা। তবে তারা শেষ পর্যন্ত হামলা চালাতে সক্ষম হয়। এই হামলা ঠেকাতে গিয়ে দুই পুলিশ সদস্য নিহত হয়। এ ছাড়া মারা যায় এক নারী এবং পাঞ্জাবি-টুপি পরা এক জঙ্গি। যে নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচ জঙ্গিও কয়েক মাস আগে পরিবার-পরিজন ছেড়ে জঙ্গি আস্তানায় ওঠে। এই দুই হামলার পরই পুলিশ-র‌্যাব টানা জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযান শুরু করে।

পুলিশ সূত্র বলেছে, বছরজুড়ে জঙ্গি হামলায় অন্তত ৩০ জন জঙ্গি র‌্যাব-পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধসহ বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়। আর তাদের হাতে বিদেশিসহ ২৮ জন মারা যান। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনায়।

বছরের প্রথম জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে ঝিনাইদহ জেলায় ৭ জানুয়ারি। সেখানে জঙ্গিদের হামলায় হোমিওপ্যাথি ডাক্তার ছমিরউদ্দিন নিহত হন। দ্বিতীয় হামলার ঘটনা ঘটে গাইবান্ধা জেলায় ৮ ফেব্রুয়ারি। সেখানে হিন্দু ব্যবসায়ী তরুণ দত্তকে হত্যা করে জঙ্গিরা।

২১ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড়ে মঠপ্রধান যজ্ঞেশ্বর রায়কে গলা কেটে হত্যা করে।
২৩ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিমকে হত্যা করে জেএমবি সদস্যরা।
২৫ এপ্রিল কলাবাগানে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যরা সমকাম প্রচারক জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু মাহবুব তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করে।
গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর ২৬ জুলাই পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগ কল্যাণপুরের একটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায়। সেখানে পুলিশের গুলিতে ৯ প্রশিক্ষিত জঙ্গি নিহত হয়। একজন জীবিত অবস্থায় ধরা পড়ে।
২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের সঙ্গে গোলাগুলিতে নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীসহ তিন জঙ্গি নিহত হয়।
২ সেপ্টেম্বর রূপনগরে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জাহিদুল ইসলাম। যে নব্য জেএমবির সামরিক শাখার নেতা ছিল।
১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরের জঙ্গি আস্তানায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিন নারী জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে। এই আস্তানায় আত্মহত্যা করে জঙ্গি নেতা তানভীর কাদেরী।
৮ অক্টোবর গাজীপুরের পাতারটেকে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের সদস্যদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৭ জঙ্গি নিহত হয়। একই এলাকায় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যায় আরও দুই জঙ্গি। টাঙ্গাইলে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যায় আরও দুই জঙ্গি। অন্যদিকে সাভারে র‌্যাবের অভিযানকালে পালাতে গিয়ে মারা যায় নব্য জেএমবি নেতা সারোয়ার জাহান।

গত ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর পূর্ব আশকোনার জঙ্গি আস্তানায় সর্বশেষ অভিযান চালায় পুলিশ। এই অভিযানে শাকিরা নামে এক নারী জঙ্গি আত্মঘাতী হামলায় নিহত হয়। এ ছাড়া আত্মঘাতী হামলায় মারা যায় আফিফ কাদেরী নামে এক কিশোর। আর ওই আস্তানা থেকে শিশুসহ দুই নারী জঙ্গিকে জীবিত উদ্ধার করে। এদের মধ্যে মেজর জাহিদের স্ত্রী শীলাও রয়েছে।

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে