গাড়ি চলার অপেক্ষায় পদ্মা সেতু

নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৩৯ শতাংশ

  তাওহীদুল ইসলাম

৩১ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলো যখন পদ্মা সেতু প্রকল্পের অর্থায়ন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন অনেকেরই শঙ্কা ছিল এর বাস্তবায়ন নিয়ে। এরপর নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণকাজের ঘোষণা এলে বলা হয়, এভাবে সেতু নির্মাণ অসম্ভব। কিন্তু সব অবিশ্বাস ও শঙ্কায় তুড়ি মেরে এগিয়ে চলছে সেতুর নির্মাণকাজ। পদ্মার পানিতে এখন কিছুদূর পর পর উঁকি দিচ্ছে পাইল। এর ওপর স্থাপন করা হচ্ছে পিলার। মাওয়া-জাজিরাÑ যে প্রান্তেই চোখ রাখুন না কেন, দেখা যাবে সেতুর বাস্তবায়নচিত্র। চলছে নির্মাণযজ্ঞ। এখন অপেক্ষা শুধু গাড়ি চলার।

সরকারের অগ্রাধিকারভুক্ত অন্য প্রকল্পের তুলনায় পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজের অগ্রগতি বেশি। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর শুরু হয় সেতুটির নির্মাণকাজ। এক বছর শেষে এখন এ প্রকল্পের অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৩৯ শতাংশে। যে গতিতে কাজ এগিয়ে চলছে, এতে স্পষ্টÑ ২০১৮ সালের মধ্যেই শেষ হবে সেতুর নির্মাণকাজ। (১৩ পৃষ্ঠার পর)

এর আগে ২০০১ সালের ৪ জুলাই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। মাঝখানে পেরিয়ে গেছে ১৪ বছর। দীর্ঘদিন প্রতীার প্রহর গুনেছেন দণিাঞ্চলের বাসিন্দারা। এখন বাস্তবের পথে দ্রুত ধরা দিচ্ছে ওই সেতু।

এ বিষয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক সফিকুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। এর সার্বিক অগ্রগতি ৩৯ শতাংশ। কেবল মূল সেতুর নির্মাণকাজ নয়, সব কাজই চলছে দ্রুততার সঙ্গে।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, একদিকে চলছে চীনা কোম্পানি সিনোহাইড্রোর নদীশাসন কাজ, সারি সারি ড্রেজিং এবং আরেকপাশে চলছে চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানির পাইলিং মানে, মূল সেতুর নির্মাণকাজ। সেতুর সংযোগ সড়কের কাজ প্রায় শেষ পর্যাযে। তাই মূল সেতুর কাজই বেশি হচ্ছে। চীন থেকে আনা স্প্যানগুলোর অ্যাসেম্বলির কাজ চলছে এখন। সেতুটি নির্মিত হলে স্প্যানগুলো ট্রেন ও সড়কযানের ভারসক্ষম কিনা, তা খতিয়ে দেখেন প্রকৌশলীরা। আরও চলছে স্প্যান স্থাপনের প্রস্তুতিগত কাজ। এরপরই নদীতে নামার জন্য প্রস্তুত হবে স্প্যান। মাওয়াপ্রান্তে ৬ ও ৭ নম্বর পিলারের ওপর কয়েকদিন পরই বসবে প্রথম স্প্যান।

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, শিগগির সেতুর পিলারে বসবে স্প্যান। ৪২টি পিলারের ওপর মাওয়া থেকে জাজিরা পর্যন্ত ১৫০ মিটার দীর্ঘ ৪১টি স্প্যান দিয়ে গড়ে উঠবে পদ্মা বহুমুখী সেতু। বসানো হবে মোট ২৪০টি পাইল। ৩ মিটার ব্যাসের ৪০০ ফুট দীর্ঘ একেকটি পাইল। সেতুর ৪০টি পিলার থাকবে নদীর ভেতরের অংশে। আর দুটি থাকবে দুইপ্রান্তে সংযোগ সেতুতে। প্রতি পিলারে থাকবে ৬টি করে পাইল। প্রতিটি পিলারের জায়গায় নদীর বুকে জেগে আছে তিনটি করে বিশাল আকারের পাইপ। এগুলো মূলত পাইল। প্রতি পিলারে চারটি পাইল করা হয়েছে। একটি পানির নিচে। তা দেখা যায় না। পানির ওপর ভাসছে ৩টি পাইপ। তা মাটির ১১৭ মিটার গভীরে পোতা। পাইপের ভেতর রয়েছে কংক্রিটের ঢালাই। আগামী এক মাসে চূড়ান্ত আকার পাবে পিলারগুলো। আর সেতু এলাকায় নদীর দুই তীরে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। ওই বাঁধই টিকিয়ে রাখবে সেতুটি।

জানা গেছে, গত বছর বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোলিক হ্যামারে নদীর তলদেশে গভীর থেকে গভীরে প্রোথিত হতে থাকে পদ্মা সেতুর মূল পাইল। টার্গেট ধরেই কাজ এগিয়ে চলছে। প্রকল্পের মূল সেতু নির্মাণে পরিকল্পনা ছিল ৩৯.১৭ শতাংশের। অগ্রগতির হার ৯৪.৮৯ শতাংশ। আর নদীশাসনকাজের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৫.৩৫ শতাংশের। বাস্তবে কাজ হয়েছে ২৫.৯৪ শতাংশ। অগ্রগতির হার ৭৩.৩৮ শতাংশ। ৫টি অংশে প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলছে। এর মধ্যে নদীশাসনকাজের অগ্রগতি তুলনামূলক কম। এ অংশের ঠিকাদার চীনের সিনোহাইড্রো লিমিটেড।

এদিকে সিনোহাইড্রোর সঙ্গে সেতু কর্তৃপক্ষের চুক্তি অনুযায়ী চীন সরকারের ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্র্যাটিস্টিক্সের অধীন চীনা ইকনোমিক মনিটরিং অ্যান্ড অ্যানালাইসিস সেন্টার (সিইএমএসি) থেকে জারিকৃত ‘এভারেজ ওয়েজ ইনডেক্স ফর ফরেন লেবার’ দাখিল করেছে সিনোহাইড্রো। তবে ঠিকাদারের দাখিলকৃত ফরেন লেবার ইনডেক্স অস্পষ্ট। তাই সেতু কর্তৃপক্ষ ও কনস্ট্রাকশন অব কনসালট্যান্টের (সিএসসি-২) কাছে ওই ডকুমেন্ট গ্রহণযোগ্য হয়নি। আর ডকুমেন্টে উল্লিখিত ফরেন লেবার ইনডেক্স সঠিকভাবে যাচাই করা না হলে সরকারকে বিপুল আর্থিক দায়ের সম্মুখীন হতে হবে। ফলে সিনোহাইড্রোর উল্লেখ করা ফরেন লেবার ইনডেক্সের বেইস ইনডেক্স ও কারেন্ট ইনডেক্স চীনের সিইএমএসি থেকে সংগ্রহের জন্য চীনে পাঠানো হচ্ছে দুই কর্মকর্তাকে। এতে প্রকল্পে কাজের মান আরও স্বচ্ছ হবে মনে করছে সেতু বিভাগ।

প্রসঙ্গত, পদ্মা সেতুটি হবে দুই তলার। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতুর ওপর গাড়ি চলবে এবং নিচ দিয়ে ট্রেন। পিলারগুলো হবে কংক্রিটের এবং মূল সেতুটি স্টিল স্ট্রাকচারের। সম্প্রতি পদ্মা সেতুতে রেললাইনের স্ট্রিংগার আনা হয়েছে লুক্সেমবার্গ থেকে। এগুলোয় কংক্রিটের সø্যাব দিয়ে ওপরে বসানো হবে রেললাইন। সেতু নির্মাণে প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এই সেতু ঘিরে হংকংয়ের আদলে গড়া হবে নগর।

 

 

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে