দল গোছাতেই ব্যস্ত ছিল বিএনপি

  মামুন স্ট্যালিন

৩১ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দল পুনর্গঠন করে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করার যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তাতে সফল হয়নি বিএনপি। সারা বছর নির্জীব থাকলেও বছর শেষে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে ১৩ দফা প্রস্তাব এবং রাষ্ট্রপতির সংলাপে অংশগ্রহণ ও সেই প্রস্তাবাবলি পেশ করে আলোচনায় এসেছিল। তবে বছর শেষের কয়েক দিন আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ে এমন ধাক্কাই খেল যে, সবই ম্লান হয়ে গেছে।

এ বছর রাজপথে আন্দোলনহীন ছিল বিএনপি। দল গোছাতে বেশি মনোযোগ দিলেও নানা কারণে তাতে সফলতা পায়নি। কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি গঠন করতেই সময় লেগেছে ৫ মাস। কমিটি গঠনে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ছিল। জেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন শেষ হয়নি দুই বছরেও। যে কয়টি কমিটি হয়েছে তাতে (১৩ পৃষ্ঠার পর)

অদক্ষদের প্রাধান্য ও ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন হয়েছে বলে অনেকের দাবি। বছর শেষ হলেও এখনো কমিটি পুনর্গঠন শেষ করতে পারেনি। দলের উপকমিটি ঘোষণা করা হয়নি। কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে এক নেতার এক পদ কার্যকর করতে গিয়ে যেসব পদ খালি হচ্ছে, তাও পূরণ হয়নি। অবশ্য এত কিছুর পরও কেন্দ্রীয় এবং জেলা পর্যায়ের কিছু কমিটি গঠনকে সফলতা হিসেবে দেখছে দলটি। নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে বিএনপির গঠন করা হয়েছে বলে মনে করছেন তারা। বলছেন, এতে দলে সাংগঠনিক গতি ফিরে এসেছে। এর বাইরে স্বেচ্ছাসেবক দল ও মহিলা দলের নতুন কমিটি গঠন করা হয়। যুবদলসহ আরও কয়েকটি অঙ্গসংগঠনের কমিটি গঠনের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে।

রাজপথে আন্দোলন না থাকায় আগের চেয়ে বছরটিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছিল কম। দেশে ছিল না তেমন সহিংসতা। সভা-সমাবেশ বা কিছু ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়ালেও তা সংঘর্ষে রূপ নেয়নি। ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবসকে কেন্দ্র করে কিছুটা উত্তাপ ছড়ায়। ওই দিন রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি চায় বিএনপি। কিন্তু পুলিশ অনুমতি দেয়নি। পরে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অনুমতি চাইলে তাও দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে কিছুটা উত্তাপ সৃষ্টি হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঢাকাসহ সারা দেশে বিােভ মিছিল করার মধ্য দিয়েই এর প্রতিবাদ জানায় দলটি। রাজপথে উত্তাপ না থাকলেও বছরজুড়েই আলোচনায় ছিল আদালতপাড়া। খালেদা জিয়াসহ সিনিয়র নেতারা সারা বছরেই আদালতপাড়ায় ব্যস্ত সময় পার করেন। জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হয়। এ দুটি মামলার বিচারকাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে।

নাসিক নির্বাচন : ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে জয় ‘হাতছাড়া’ হওয়ায় বছর শেষে এটিকে এ বছরের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। নাসিক নির্বাচন কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ল করা যায়। স্থানীয় নির্বাচন হলেও তা জাতীয় রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়ায়। নাসিকে জয় দিয়ে বছর শেষ করার প্রত্যাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত পরাজয় হয়। যদিও নির্বাচন শেষে বিএনপি বলেছে, ‘নির্বাচন ফেয়ার হলেও ফল আনফেয়ার ছিল।’

বছরের শেষ ভাগে নাসিক নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল বিএনপি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজে পুরো নির্বাচন মনিটরিং করেন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায়কে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। নাসিকে ধানের শীষের পে জোয়ার সৃষ্টিতে প্রতিটি ওয়ার্ডে কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে একটি করে কমিটি করা হয়। প্রায় ২০০ কেন্দ্রীয় নেতা পুরো নাসিক এলাকা চষে বেড়ান। নির্বাচনে ধানের শীষের বিপুল বিজয় হচ্ছে, এমনটাই প্রত্যাশা ছিল তাদের। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতারা নাসিক ছেড়ে আসার পরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। স্থানীয় তিন নেতা তৈমূর আলম খন্দকার, আবুল কালাম ও গিয়াসউদ্দিন শেষ পর্যন্ত ধানের শীষের পে ততটা সক্রিয় ছিলেন না বলে অভিযোগ ওঠে। দলীয় প্রার্থীর চেয়ে তারা ছেলে ও ভাইয়ের জয় নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। মতাসীন দলের মেয়রপ্রার্থীর সঙ্গে এ তিন নেতা গোপনে আঁতাত করেছিলেন, এমন গুঞ্জনও ছিল নাসিক এলাকায়। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হলেও ধানের শীষের প্রার্থীর পরাজয় ঘটে।

জাতীয় কাউন্সিল ও নতুন কমিটি : দুই দফা সরকারবিরোধী আন্দোলনে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে বিএনপি। সময়মতো কাউন্সিল না হওয়ায় নেতাকর্মীদের মনোবলও কমে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিরতি দিয়ে দল পুনর্গঠনের দিকে নজর দেয় বিএনপি। বছরের শুরুতেই কাউন্সিলের তোড়জোড় শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত বিদায়ী বছরের ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় দলটির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল। অত্যন্ত সফলভাবে শেষ হয় জাতীয় কাউন্সিল। এবারের কাউন্সিলে দলের গঠনতন্ত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়। বাড়ানো হয় জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা। ‘এক নেতার এক পদ’ এমন গুরুত্বপূর্ণ বিধান গঠনতন্ত্রে সংযোজন করা হয়। কাউন্সিলের দিন নতুন কমিটি না দেওয়ায় নানা সমালোচনার মুখে পড়ে দলটির হাইকমান্ড। কাউন্সিলের ১১ দিন পর ৩০ মার্চ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মহাসচিব, রুহুল কবির রিজভী আহমেদকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও মিজানুর রহমান সিনহাকে কোষাধ্য করে তিনজনের নাম ঘোষণা করা হয়। ৯ এপ্রিল ঘোষণা করা হয় যুগ্ম মহাসচিব ও সাংগঠনিক সম্পাদকের নাম। আর সর্বশেষ ৬ আগস্ট ৫০২ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটি ও ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটির দুটি পদ ফাঁকা রেখে বাকিদের নাম ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া ৭৩ সদস্যের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কমিটির নাম ঘোষণা করা হয়নি।

এত বড় কমিটি ঘোষণার পর নানা সমালোচনা শুরু হয়। যোগ্য ও ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। স্থায়ী কমিটিতে সিনিয়র নেতা আবদুল্লাহ আল নোমানের নাম না থাকায় অনেকেই হতাশ হন। কাক্সিক্ষত পদ না পেয়ে নোমানসহ অনেক নেতাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।

তৃণমূল পুনর্গঠন : কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি গত বছরে তৃণমূল পুনর্গঠনে নজর দেয় বিএনপি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন ঠেকানোর আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর দলটি সাংগঠনিক সংকটে পড়ে। ওই সংকট কাটাতে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে পুনর্গঠন কাজে হাত দেয়। ওই বছরের ৯ আগস্ট কেন্দ্র থেকে চিঠি পাঠিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানকে তৃণমূল পুনর্গঠনে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে জেলা কমিটি করা সম্ভব হয়নি। এ পর্যন্ত তিন দফা তৃণমূল পুনর্গঠনের জন্য টাইম ফ্রেম বেঁধে দেওয়া হয়। ডিসেম্বরের মধ্যে সব কমিটি করা হবে বলে জানানো হয়। কিন্ত এখন পর্যন্ত শতভাগ সফল হয়নি দলটি। কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে অর্ধেকের পুনর্গঠন শেষ করেছে দলটি।

ইসি পুনর্গঠনে প্রস্তাব : ২০১৬ সালে বিএনপির রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল নির্বাচন কমিশন গঠনে খালেদা জিয়ার দেওয়া প্রস্তাব এবং সেই প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে নিয়ে রাষ্ট্রপতি দলটির সঙ্গে সংলাপ করেন। এতে আশাবাদী হয়ে ওঠেন বিএনপি নেতারা। ১৮ নভেম্বর রাজধানীর একটি হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই প্রস্তাব উপস্থাপন করেন খালেদা জিয়া। নতুন নির্বাচন কমিশন কীভাবে গঠিত হবে, সেই কমিশনের অধীনে কীভাবে আগামী নির্বাচন হবেÑ সে বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি। নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন একই সঙ্গে সব দলের ঐক্যের ভিত্তিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের খুঁজে বের করতে পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন, ইসি শক্তিশালীকরণে আরপিওর কয়েকটি ধারা সংশোধনসহ বেশ কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেন ওই রূপরেখায়।

বিএনপির প্রস্তাবকে ইতিবাচক উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি জানান, ইসি পুনর্গঠনে এ প্রস্তাব সহায়ক হবে। রাষ্ট্রপতির এমন মনোভাবে আশান্বিত হয়ে উঠেছেন বিএনপি নেতারা। তাদের প্রত্যাশা সব দলের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করবেন।

রাজপথে নয়, আদালতপাড়ায় ব্যস্ত ছিলেন নেতারা : হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি না থাকায় রাজপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দমন-পীড়ন থেকে অনেকটাই নিরাপদে ছিলেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। তবে বিগত বছরগুলোয় দায়ের করা নানা মামলায় গত বছর আনুষ্ঠানিক বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন দলটির নেতারা। বিগত বছরগুলোয় উপর্যুপরি মামলার মাধ্যমে আইনি জালে আটকানো হয়েছিল বিএনপি নেতাকর্মীদের। ২০১৪ সালে সেসব মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটি থেকে তৃণমূল নেতাদের অনেকেই এখন একাধিক মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচারের মুখোমুখি।

এরই মধ্যে তারেক রহমানের একটি মামলায় রায় হয়েছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল মামলার বিচারকার্য দ্রুতগতিতে চলছে। কয়েক দিন পর পরই খালেদা জিয়াকে আদালতে উপস্থিত হতে হচ্ছে। এ দুটি মামলা নিয়ে দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা নানা শঙ্কায় রয়েছেন। তারা মনে করছেন, সরকার এ মামলায় খালেদা জিয়াকে সাজা দিতে পারে। মামলার করণীয় নিয়ে সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে সার্বণিক যোগাযোগ করছেন খালেদা জিয়া। শুধু দলের দুই শীর্ষ নেতাই নন, মহাসচিবসহ সিনিয়র প্রায় সব নেতাকেই নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে।

 

 

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে