• অারও

বেতবুনিয়া ও গাজীপুরবাসীর আনন্দের সীমা নেই

  জিয়াউর রহমান জুয়েল, রাঙামাটি ও আবুল হাসান, গাজীপুর

১৩ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া- ৫৬ হাজার বর্গমাইল এখন মহাকাশ জয়ের আনন্দে উদ্বেলিত। তবে রাঙামাটির বেতবুনিয়া এবং গাজীপুরের তেলিপাড়াবাসীর আনন্দ অন্য সবার আনন্দকে ছাড়িয়ে গেছে। এ দুই এলাকার মানুষ অনেক বেশি উচ্ছ্বসিত। কারণ বাংলাদেশের প্রথম বাণিজ্যিক উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১-এর মহাকাশ জয়ে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা থাকছে তেলিপাড়া ও বেতবুনিয়ায় স্থাপিত দুটো গ্রাউন্ড স্টেশনের। স্টেশন দুটি নির্মাণ করেছে স্পেকট্রা ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড।

সদ্য উৎক্ষেপণ হওয়া বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ইতোমধ্যেই গাজীপুরের গ্রাউন্ড স্টেশনে প্রাথমিক সিগন্যাল পাঠিয়েছে। গাজীপুর গ্রাউন্ডের স্যাটেলাইট অপারেশন প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম গতকাল আমাদের সময়কে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে বলেন, উৎক্ষেপণের ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট পর গাজীপুর গ্রাউন্ড স্টেশন প্রাথমিক সিগন্যাল পেয়েছে। কক্ষপথে ৩৬ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছতে আরও ৭ থেকে ৯ দিন সময় লেগে যাবে।

তিনি জানান, স্যাটেলাইটটি স্বাভাবিক গতিতেই গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। গ্রাউন্ড স্টেশনটি সার্বিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। তিনি যোগ করেন, দুই বছরে গাজীপুরের তেলিপাড়ার গ্রাউন্ড স্টেশনটি প্রস্তুত করা হয়েছে। এখান থেকে স্যাটেলাইটটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এজন্য ৩২ সদস্যের একটি দলকে ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় নির্মিত দ্বিতীয় গ্রাউন্ড স্টেশনটির প্রকল্প সমন্বয়ক প্রকৌশলী মিজানুল ইসলাম গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, দেশে গ্রাউন্ড স্টেশন থাকায় বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, স্যাটেলাইট সম্পর্কে নতুন নতুন গবেষণার পথ সুগম হবে। এর মাধ্যমে ক্যাবলের দিন শেষ হয়ে আসছে। ক্যাবলের পরিবর্তে ছোট ছোট ডিভাইস বসিয়ে কাজ চলবে। প্রিপেইড সিস্টেমে গ্রাহক তার কাক্সিক্ষত সেবা পাবেন। টেলিভিশন বিনোদনের ক্ষেত্রে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রবাহ তৈরি হবে। মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী অন্য ৫৭টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বও তৈরি হবে।

বেতবুনিয়া প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক সিপন চন্দ্র হালদার বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১-এর বদৌলতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর গতিময় ইন্টারনেট সেবা পাওয়া যাবে। ফলে তরুণ প্রজন্মের জন্য ইন্টারনেট কেন্দ্রিক কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ঘটনায় আনন্দে ভাসছে গাজীপুর। গ্রাউন্ড স্টেশনটি জয়দেবপুর থানার তেলিপাড়া এলাকায় অবস্থিত। রাত জেগে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ দেখে গতকাল সকালে অনেকেই ছুটে আসেন এখানকার গ্রাউন্ড স্টেশনটিতে। কেউ কেউ সেলফি তোলেন গ্রাউন্ড স্টেশনের মূল ফটকের সামনে। স্পর্শকাতর স্থাপনা হওয়ায় প্রবেশে কড়াকড়ি বলে ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি অনেক দর্শনার্থী। আগত একাধিক লোক জানান, ইতিহাসের অনবদ্য এ ঘটনায় তারা উচ্ছ্বসিত। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার সক্ষমতার পরিচয় দিতে পেরেছে। এখন তারা প্রত্যাশা করছেন, শিগগিরই তারা উন্নতমানের সেবা পাবেন।

তেলিপাড়ার বাসিন্দা কবীর হোসেন বলেন, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তিতে আরও এগিয়ে গেল। এখনকার যুগই হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ তরুণদের মহাকাশ গবেষণাকে উৎসাহিত করবে। অদূরভবিষ্যতে এই গ্রাউন্ড স্টেশনেই বাংলাদেশের তরুণরা স্যাটেলাইট তৈরি করবে, এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

আনন্দে ভাসছে বেতবুনিয়াবাসীও। গতকাল অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে কাউখালী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অংচাপ্রু মারমা বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা এবং ২০২১ সালের মধ্যে রূপকল্প বাস্তবায়নের অংশীদার হতে পেরে বেতবুনিয়াবাসী তথা পার্বত্যবাসী সকলেই আনন্দিত, উচ্ছ্বসিত।

বেতবুনিয়ার তরুণ সালাহ উদ্দিন মোহাম্মদ আরিফ বলেন, গ্রাউন্ড স্টেশন হওয়ায় বেতবুনিয়া এখন ইতিহাসের অংশ। তাই আমরা গর্বিত; উচ্ছ্বসিত। ইন্টারনেটে আশানুরূপ গতি না থাকায় এতদিন আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে ছিল। এবার এ খাতে আমরাই হব বিশে^র নিয়ন্ত্রক। দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে তিনি বলেন, অনলাইন বিজনেস, ইউটিউবার ও আউট সোর্সিংয়ে বিশে^র রোল মডেল হবে বাংলাদেশ।

স্মৃতি অমলিন

বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূকেন্দ্রে যৌবনের শুরুতেই চাকরি নেওয়া আবদুল মান্নান ও মো. জসিম উদ্দিন এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখা এ দুজনই আছেন এখনো। বন্ধবন্ধুর উপস্থিতির সে দিনটি এখনো যেন চোখের সামনেই ভাসছে তাদের। আবদুল মান্নানের কাছে দিনটি এখনো ‘সেরা’। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, চারপাশের ছোট ছোট পাহাড়গুলোও সেদিন ছিল লোকে লোকারণ্য। বাগানে বসেই বঙ্গবন্ধু চা-পান করলেন। অদূরে শুয়ে থাকা একটি কুকুরকে দেখে বললেন, ‘তুইও আমার মতো ভুখা?’ হাতের বিস্কুট ছুড়ে দিয়ে বললেন, ‘নে খা।’

নিজের মতো করেই বললেন জসিম, সকাল ১১টা। প্রথম গেটে হাতি অভ্যর্থনা জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ফুলের মালা পরিয়ে দিল। বেজায় খুশি হলেন তিনি। বহর নিয়েই আসলেন উদ্বোধনস্থলে। প্রচুরসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিল বন্ধবন্ধুর উদ্বোধনী মঞ্চ ঘিরে। সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষে উদ্বোধনের পর মোনাজাত হলো। এর পর অফিসের ভেতরের পুরোটা ঘুরে দেখলেন বঙ্গবন্ধু।

চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহাসড়কের কাউখালীতে বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূকেন্দ্র নামখচিত তোরণে কৌতূহলীদের দৃষ্টি আটকে গেলেও এর কর্মকা- অনেকের কাছেই অজানা। পুরো বাংলাদেশে বৈদেশিক কল গ্রহণ ও পাঠানোর একমাত্র মাধ্যম কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূকেন্দ্র। সরকার তথা রাষ্ট্র, বিদেশি কূটনীতিক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে বহির্বিশ্বের সকল যোগাযোগ এর মাধ্যমেই হতো। স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গঠনে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এর অবদান ছিল অপরিসীম।

পাহাড়বেষ্টিত ১০০ একর সমতল জমিতে স্থাপন করা হয়েছে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও গত শতাব্দীর আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যয়বহুল এই স্থাপনা। প্রধান ফটকের কয়েকশ গজ পর দ্বিতীয় ফটক পেরিয়ে যেতে হয় এর মূল কেন্দ্রে। পুরোটাই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। পাশেই বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী মঞ্চ আর বিশালাকার অ্যান্টেনা (ডিশ)। দেশের প্রথম এই উপগ্রহ ভূকেন্দ্রটি ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উদ্বোধন করেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূকেন্দ্রটি বঙ্গবন্ধু উদ্বোধন করেছিলেনÑ এ তথ্য তাদের যতটা গর্বিত করে, ততটাই ব্যথিত করে এ ঘটনার মাত্র ৬১ দিনের মাথায় বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ঘটনাও।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে