সবার উপরে মা

  শান্তা মারিয়া

১৩ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আকাশ থেকে রথে চেপে নেমে এলেন এক নারী। তিনি জন্ম দিলেন মানবসন্তানের এবং তার হাতে তুলে দিলেন নানারকম শস্যবীজ। সৃষ্টি হলো মানবপ্রজাতি ও কৃষি। দক্ষিণ আমেরিকার মায়া-পুরাণে এভাবেই বর্ণনা করা হয়েছে মানুষের সৃষ্টিকাহিনি। বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতাগুলোর পুরাণ কাহিনিতে রয়েছে মাতৃদেবীর বন্দনা। আসিরীয়, ব্যাবিলনীয় সভ্যতার প্রথম যুগে নির্মিত যে দেবপ্রতিমাগুলো পাওয়া যায়, তা মাতৃদেবীর। গ্রেকোরোমান পুরাণে সিবিলি, গেইয়া, রিয়া, দিমিতির, মিশরীয় পুরাণে আইসিস, ব্যাবলনীয় পুরাণে ইশতার ছিলেন মাতৃদেবী। প্রাচীন বাংলায় মা ষষ্ঠীর পূজা প্রচলিত ছিল। দুর্গা, কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতী, বিশালাক্ষ্মী, মনসা, শীতলার পূজা বাংলায় মাতৃতান্ত্রিক সমাজের ইঙ্গিতবাহী। প্রস্তরযুগে সমাজ যখন মাতৃতান্ত্রিক ছিল, তখন মাতৃত্ব বা সন্তান জন্মদানের বিষয়টি ছিল নারীর জন্য ক্ষমতাসূচক। সেই আদিম মানবগোষ্ঠী জানত, সমাজের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি নারী করছে। সন্তানের জন্মদানের মাধ্যমে এই গ্রহে মানবপ্রজাতিকে টিকিয়ে রেখেছে নারী। তাই গর্ভবতী নারী প্রতিমার পূজা প্রচলিত ছিল সব আদিম সমাজে। এই পূজার মাধ্যমে সমাজে মায়ের ক্ষমতা ও মায়ের আসনকে সর্বশীর্ষে স্থাপন করা হয়।

ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে রোমানদের আগমনের আগে স্থানীয়ভাবে মাতৃদেবীরা ছিলেন প্রধান। খ্রিস্টধর্ম প্রসারের পর মাতা মেরির মধ্যে লীন হয়ে যান আদিম মাতৃদেবীরা।

মাকে সম্মান করলেও মাতৃত্বকালীন ছুটি ও বিশেষ সুযোগ-সুবিধা প্রদানের বিষয়টি অনেক দেশেই উপেক্ষিত। অবশ্য স্ক্যান্ডিনেভিয়ানসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, চীন, জাপান এবং অন্যান্য অনেক দেশে দীর্ঘ মাতৃত্বকালীন ছুটি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে মাকে সম্মান জানানোর নিয়ম রয়েছে।

মায়ের আসন বিশ্বের সব সমাজেই উচ্চ মর্যাদার। কিন্তু মায়ের প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান প্রকাশ করলেও মায়ের অধিকার ও ক্ষমতায়নের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে অবহেলিত রয়ে গেছে। আমাদের সমাজে মা বলতেই বোঝানো হয় নিজের সব চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দেওয়া এমন এক নারী, যিনি নিজের জীবনকে নিঃশেষে ব্যয় করেন শুধু সন্তানের কল্যাণে। কিন্তু এই চিন্তাধারার মাধ্যমে মায়ের পার্থিব চাহিদাগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়।

স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার রয়েছে। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে যদি পিতার মৃত্যু ঘটে তখন অনেক সন্তানই বৃদ্ধ মাকে তার প্রাপ্য সম্পদ বুঝিয়ে দিতে গড়িমসি করে। বৃদ্ধ বয়সে বিধবা মা হয়ে পড়েন সন্তানের গলগ্রহ। প্রবীণ মায়ের দেখাশোনা, তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে অনেক সন্তান অবহেলা করে বা যথাযথ গুরুত্ব দেয় না। মায়ের বিনোদনের বিষয়টিও উপেক্ষিত থাকে অনেক পরিবারে। মায়ের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা, তার পোশাক ও খাদ্যের দিকে, চিকিৎসা ও যতেœর দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে সময় পায় না অনেক সন্তান। প্রবাসী সন্তানের মা অনেক সময়ই চরম নিঃসঙ্গতায় শেষ জীবন কাটান।

বৃদ্ধাশ্রমে অসহায় মাকে ঠেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। মা স্বর্গের দেবী নন। তিনি রক্ত-মাংসের মানুষ। তারও চাই যতœ, চাই সব ধরনের অধিকার। মা দিবসে শুধু মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং মায়ের অধিকারগুলো অর্জনের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। মায়ের অধিকার একদিনের জন্য নয়, সারা বছরের জন্যই। তবে এই সারা বছরই মায়ের দিকে মনোযোগ দেওয়া, তাকে শ্রদ্ধা, সম্মান ও অধিকার প্রদানের বিষয়ে অঙ্গীকার করার দিন হলো মা দিবস। এই দিবসে বিশ্বের সব মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে